দক্ষিণাঞ্চলে বন্যার অবনতি

৪৮ বার পঠিত

দীর্ঘ হচ্ছে বন্যা পরিস্থিতি। হিমালয় পাহাড়শ্রেণি ও এর পাদদেশীয় ভূমিতে ব্যাপক বৃষ্টিপাত বাংলাদেশে শুরু হওয়া বন্যাকে আরো স্থায়িত্ব দেবে বলেই মনে করছেন বন্যা বিশেষজ্ঞরা। উজানের এই বৃষ্টিপাতজনিত পাহাড়ি ঢলে এরই মধ্যে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।
পশ্চিমাঞ্চলের পদ্মা, উত্তরাঞ্চলের মহানন্দা, আত্রাই, পুনর্ভবা, তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র আর পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা, সারি, পিয়াইন ও যাদুকাটাসহ সীমান্ত নদীগুলোতে এখন পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোত। প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

 

পাহাড়ি ঢলের পানি পলি জমা নদীগুলোতে উপচে তো পড়ছেই, তার ওপর প্রবল দক্ষিণা বাতাসে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মেঘনা, বলেশ্বর, লোহালিয়া, সাঙ্গুর মুখে।
সব মিলিয়ে পানি নামতে দেরি হওয়ায় প্লাবিত হওয়া এলাকাগুলো পরিণত হচ্ছে দুর্গত এলাকায়। এরই মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সুনামগঞ্জে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। এসব এলাকার অনেক স্থানেই বাড়িঘর আর স্কুল-কলেজ তো বটেই, মহাসড়ক আর রেললাইনও তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। ভেঙে গেছে অনেক কাঁচা বাড়িঘর। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট।
এদিকে মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, শরিয়তপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলে গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
মানিকগঞ্জ: ঘিওর উপজেলাসহ মানিকগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পদ্মা-যমুনার পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির ফলে জেলার ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন ইউনিয়ন। ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার ১৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় কর্তৃপক্ষ ৩ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। এছাড়া ঢাকা আরিচা মহাসড়কে শিবালয় উপজেলার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের
উথুলী মোড়ে বন্যার পানি প্রবেশ করায় অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন।

দৌলতপুরের সঙ্গে বাচামারা ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগের একমাত্র রাস্তাটিও পানিতে তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। এদিকে যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে রোববার ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫৭ সে. মি. ওপর দিয়ে অর্থাৎ ৯ দশমিক ৯৭ স্তরে প্রবাহিত হয়েছে।
গত কয়েক দিনে থেমে থেমে বৃষ্টি এবং যমুনা, ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদীতে বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে মানিকগঞ্জের ঘিওর সদর, বানিয়াজুরী, বালিয়াখোড়া, সিংজুরী, বড়টিয়া ও দৌলতপুর উপজেলার বাচামারা, বাঘুটিয়া, চরকাটারী, জিয়নপুর, খলশী, চকমিরপুর, ধামশ্বর, কলিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া বোনা আমন ১ হাজার হেক্টর, রোপা আমন ৪ হেক্টর, বীজ তলা ১ হেক্টর তলিয়ে গেছে। বন্যায় প্লাবিত এলাকায় মানুষের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি লাকড়ি, গো-খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

এদিকে যমুনা, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গায় পানি বৃদ্ধির সঙ্গে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত কয়েক দিনে বর্ষার পানি বৃদ্ধি ও নদীর করাল গ্রাসে ৮ শতাধিক বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট ও পাচুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ, আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙনের শিকার এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ ঘরবাড়ি জিনিসপত্র নৌকাযোগে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত লোক জন যমুনা নদীর চরে নিজের ভিটে মাটি হারিয়ে অন্যের জমির ওপর বাড়িঘর জিনিসপত্র নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। গত এক মাসে যমুনার ভাঙনে ঘিওরের কুশুন্ডা, জাবরা, পেঁচারকান্দা, কুস্তা, নারচী, মাইলাঘী এবং দৌলতপুর উপজেলার বাচামারা ইউনিয়নের চুয়াডাঙ্গা, বাচামারা ঘোষপাড়া, কল্যাণপুর, বাচামারা উওর খ-, সুবুদ্দিয়া, চরকাটারী ইউনিয়নের কাঁঠালতলি, লালপুর, চরকাটারি ডাক্তার পাড়া, বাগপাড়া, ম-লপাড়া, কামারপাড়া, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের মুন্সিকান্দি, রাহাতপুর, কাশিদারামপুর, ব্রাহ্মনদী, পুড়ানপাড়া, পারুরিয়া, জিয়নপুর ইউনিয়নের বরটিয়া, লাউতারা, বৈন্যা, আমতলী, আবুডাঙ্গা, খলসী ইউনিয়নের রোহা, পাররোহা, চকমিরপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর, কালিকাবাড়ি এ ৪০টি গ্রামের ৮ শতাধিক পরিবারের বসতভিটা আবাদি জমি জমা বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। সেই সঙ্গে বাচামারা-দৌলতপুর সড়কের বৈন্যা নামক স্থানে প্রায় ৫ শত ফুট পাকা সড়ক নদীতে বিলীন হওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এসব গ্রামে গত কয়েক দিন ধরে পানি বৃদ্ধির ফলে বাড়ি-ঘর কোমর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাড়ির উঠানে মাচা পেতে ও কলাগাছের ভেলায় বাড়ির উঠানে অনেক গৃহবধূকে রান্না করতে দেখা গেছে। অনেকেই পার্শ্ববর্তী নাগরপুর উপজেলার ফৈজপুর, মাইজাইলসহ চরে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া যারা টাকা-পয়সার দিকে সচ্ছল তারা নৌকা যোগে আশ্রয়ের খোঁজে শহরের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে।
দৌলতপুর উপজেলা চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক তোজা জানান- চুয়াডাঙ্গা, বাচামারা ঘোষপাড়া, কল্যাণপুর, বাচামারা উওর খ-, সুবুদ্দিয়া গ্রামের ৮ শতাধিক বাড়ি-ঘরে কোমড় পানিতে তলিয়ে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্রে কয়েক শত নারী-পুরুষ গরু-ছাগল নৌকা যোগে উদ্ধার করে আশ্রয় দেয়া হয়েছে এছাড়া বন্যার পানিতে প্লাবিত পরিবারের বাড়িঘরের নামের তালিকা দেয়া হয়েছে। তিনি সরকারি-বেসরকারি সংস্থাদের বন্যার্তদের পাশে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিউর রহমান জানান, বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় চরকাটারী, জিয়নপুর এই ২ ইউনিয়নে বন্যার্তদের সাহায্যার্থে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়েছি।
মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আলিমুজ্জামান মিয়া জানান, বোরো-আমন ধান এক হাজার হেক্টর, রোপার বীজতলার তিন হেক্টর ও পাঁচ হেক্টর শাকসবজির জমি ডুবে গেছে। এক সপ্তাহের বেশি এসব ফসল পানিতে ডুবে থাকলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফরিদপুর: উজান থেকে নেমে আসা পানি ও শনিবার দিবাগত রাতের ভারী বর্ষণে জেলায় পদ্মা নদীর তীরবর্তী সদর, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি জীবনযাপন করছে। এসব এলাকার ২৪টি প্রাথমিক স্কুল বন্যার কারণে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমার ১০১ সেন্টিমিটিার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার সদর উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী নর্থচ্যানেল, ডিক্রির চর ও অলিয়াবাদ ইউনিয়ন, সদরপুর উপজেলার দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া, আকোটেরচর, চরনাসিরপুর ইউনিয়নে এবং চরভদ্রাসনের সদর, চরহরিরামপুর, চরঝাউকান্দা ও গাজিরটেক ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি ও ভারী বর্ষণে এসব এলাকার কাঁচাপাকা অনেক রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে বানভাসি মানুষ। সদর উপজেলার চেয়ারম্যান খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর বানভাসি মানুষদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, বন্যার্ত এলাকায় কাউকে না খেয়ে কষ্ট পেতে হবে না। এদিকে, মধুমতি নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার কয়েকটি স্থানেও প্লাবিত হয়েছে নতুন করে।
চরভদ্রাসনে ভারী বর্ষণ ও নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে পদ্মা তীর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, চরাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে পানি উঠে যাওয়ার পাশাপশি শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াতে ঝুঁকি থাকায় বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান বন্ধ রয়েছে। সেই সাথে চরঝাউকান্দা ইউনিয়নের হুকুম আলী চোকদার সরকারি প্রাতমিক বিদ্যালয়টি পদ্মা নদীর ভাঙনে যেকোনো সময় বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে জানান তিনি। চরহরিরামপুর ইউনিয়নটি প্রায় ভাসমান অবস্থায় রয়েছে বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান আমীর হোসেন খান। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে তিন হাজারেরও বেশি পরিবার কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের কাছে পেঁৗছেনি সরকারি কোনো সাহায্য। বন্যার্তদের জরুরিভিত্তিতে ত্রাণ পেঁৗছে দেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

শরীয়তপুর: উজানের বন্যার পানি নেমে আসায় শরীয়তপুর জেলার প্রধান প্রধান নদনদীর পানি বৃদ্ধির ফলে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জাজিরা, নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে জনদুর্ভোগ চরমভাবে বেড়ে গেছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উজানে বন্যার পানি নেমে আসায় এবং টানা বর্ষণের ফলে শরীয়তপুর জেলার প্রধান প্রধান নদনদী পদ্মা, মেঘনা, কীর্তিনাশা ও আড়িয়াল নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরেশ্বর পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি ৩০ সে. মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে জাজিরা উপজেলার নাওডোবা, কু-েরচর, পালেরচর, বড়কান্দি, বিলাসপুর নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর, চরআত্রা নওয়াপাড়া ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাচিকাটা ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রামে নিচু স্থানের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ১ লাখ মানুষ।
এসব এলাকায় অধিকাংশ স্কুল বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাড়িঘরের লোকজন ঘরের ভেতরে মাচায় অথবা চৌকির ওপর বসবাস করছেন। বাঁশের সাঁকো দিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে চলাফেরা করছেন। আলগা চুলায় রান্না করে কোনো রকম খাওয়া-দাওয়া করে বেঁচে আছেন। বাথরুম ডুবে যাওয়ার কারণে পায়খানা-প্রস্রাব করার খুবই সমস্যা হচ্ছে। নলকূপগুলো ডুবে যাওয়ার কারণে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কলার ভেলা বা নৌকা ছাড়া তাদের চলাফেরার কোনো উপায় নেই।
গবাদি পশু নিয়ে আরো বেশি বিপাকে পড়েছেন এখানকার মানুষ। গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। শত শত একর জমির বীজতলা ও আউশ-আমন ধান তলিয়ে গেছে। বন্যার পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেলে এর ভয়াবহতা আরো বৃদ্ধি পাবে। এসব এলাকায় বন্যার পাশাপাশি নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ে বাড়িঘর সরিয়ে নিচ্ছেন এলাকার লোকজন।
এদিকে এ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ সাহায্য-সহযোগিতা তো দূরের কথা- কেউ ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতেও আসেননি। তবে বেসরকারি সংস্থা এসডিএস ইতোমধ্যে তাদের সব কর্মীদের ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
পালেচর রাঢ়ি কান্দি গ্রামের সামাদ শেখ বলেন, ‘৭ থেকে ৮ দিন ধরে বন্যার পানিতে বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়ায় খুবই কষ্ট হচ্ছে।’
রাঢ়ি কান্দির মিনারা বেগম ও ধলু সরদার বলেন, ‘বন্যার পানিতে পানির কল ও পায়খানা ডুবে গেছে। এতে আমাদের খুবই অসুবিধা হচ্ছে। অনেক দূর থেকে কলের পানি ভেলায় করে এনে খাই। ঘরের ভেতরে মাচায় বা চৌকিতে আলগা চুলায় পাক করে কোনোরকম খেয়ে বেঁচে আছি। আমাদের কেউ কোনো খোঁজখবর নেয়নি।’
স্কুলছাত্রী ডালিয়া বলে, ‘স্কুল বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। স্কুলে যাওয়ার রাস্তাও তলিয়ে গেছে। আমরা এখন স্কুলে যেতে পারছি না। তাই স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে।’
জাজিরা বিলাসপুর ইউনিয়নের কাজিয়ারচর গ্রামের মেছের মাস্টার জানান, ‘বন্যার পানি বেড়ে যাওয়ায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। আমাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র ঘরবাড়ি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ভাই-ব্রাদার কে কোথায় যাবে, থাকবে বুঝে উঠতে পারছি না।’
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল হোসাইন খান জানান, বন্যার খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে তালিকা তৈরির জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জামালপুর: যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গেল ৪৮ ঘণ্টায় যমুনার পানি ১৩ সেন্টিমিটার কমে এখনো বিপদসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি এখন টাঙ্গাইল জেলার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখনো পানিবন্দি জামালপুরের সাত উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নের তিন লক্ষাধিক মানুষ। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ট্রেন চলাচল এবং সরিষাবাড়ীতে ট্রেন ও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। রোববার দুপুরে ইসলামপুর উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে।
টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যমুনা নদীর পানি বাড়তে থাকার পর এখন কিছুটা কমতে শুরু করেছে। গেল ৪৮ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ১৩ সেন্টিমিটার কমে বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে এখনো প্রবাহিত হওয়ায় জামালপুর সদর, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও বকশীগঞ্জ উপজেলার তিন শতাধিক গ্রামের তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বসতঘরে বন্যার পানি ঢুকে যাওয়ায় বিভিন্ন বাঁধ এবং উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে বন্যা দুর্গতরা। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বন্যা দুর্গত ৫শ’ পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেই সাথে দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট চলছে। নতুন করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় জেলার ৭৮৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ১৭ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ফসল। এদিকে বন্যার পানিতে রেল লাইন তলিয়ে যাওয়ায় শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ এবং শনিবার রাত থেকে জামালপুর-সরিষাবাড়ী-বঙ্গবন্ধু পূর্বপাড় পর্যন্ত লাইনে রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে সরিষাবাড়ীর ভাটারা ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া এলাকায় বন্যার পানিতে সড়ক ভেঙে যাওয়ায় জামালপুর-সরিষাবাড়ী সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা দুর্গত এলাকায় এখন পর্যন্ত ৭৯২ মে.টন চাল, ৪ হাজার ৭শ’ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও দুর্গত এলাকায় রুটি ও খিচুিড় বিতরণ করা হচ্ছে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত এলাকায় যে পরিমাণ ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এদিকে রোববার দুপুরে ইসলামপুর উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন নয়াপাড়া গ্রামের মারফত আলী স্ত্রী মনোয়ারা বেগম এবং চিনারচর আকন্দপাড়া গ্রামের উজ্জ্বলের স্ত্রী মরিয়ম বেগম।
এ ব্যাপারে জামালপুরের জেলা প্রশাসক মো. শাহাবুদ্দিন খান জানিয়েছেন, বন্যা দুর্গতদের জন্য শুকনো খাবার বিতরণে ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে দুর্গতদের জন্য বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে।
সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি কিছুটা কমলেও জেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনো জেলার ৫টি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নে শতাধিক গ্রাম বন্যা কবলিত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ৪ সেন্টিমিটার কমে রোববার দুপুরে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনার পানি কমলেও অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর পানি বাড়ছে। করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর, ধলাই, চাকলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এখনো নদী এলাকার গ্রামগুলো বন্যায় ডুবে রয়েছে।
সিরাজগঞ্জের ৫ উপজেলার চরাঞ্চলের ৩৩টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের মানুষ কয়েকদিন ধরে বন্যাকবলিত হওয়ার কারণে এই অঞ্চলের মানুষ এখন কষ্টে জীবনযাপন করছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ না পেয়ে বন্যাকবলিত গরিব মানুষ অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। এদিকে শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে যমুনার পানি প্রবেশ করায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত শাহজাদপুর, বেলকুচি ও এনায়েতপুরের হাজার হাজার তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁতী ও শ্রমিকদের মানবেতর দিন যাপন করতে হচ্ছে।
শাহজাদপুর উপজেলার রূপবাটি গ্রামের তাঁত শ্রমিক বাবু ইসলাম, গত কয়েকদিন ধরে এলাকায় পানি উঠছে। বিশেষ করে তাঁত কারখানাগুলো ডুবে যাওয়ার কারণে মালিক কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। কাজ না থাকার কারণে এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে।
শেরপুর: শেরপুরের বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনিতি হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে সদর উপজেলার ৫ ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম। ইতিমধ্যে ৩১ জুলাই রোববার সকাল থেকেই জেলার সদর উপজেলার শেরপুর-জামালপুর সড়কের পোড়ার দোকান নামক স্থানের কজওয়ে তলিয়ে যাওয়ায় ওই সড়কে জামালপুর-টাঙ্গাইলসহ উত্তর বঙ্গের সঙ্গে সব প্রকার যান চলাচল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরের ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর সেতুর পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদ সীমানার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে ব্রহ্মপুত্রসহ জেলার অন্যান্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতিমধ্যে সদর উপজেলার চর পক্ষীমারি, লছমনপুর, বলাইচর, বেতমারি ও কামারের চর ইউনিয়নের ২৫ গ্রাম তলিয়ে গেছে। সেইসাথে তলিয়ে গেছে ওইসব এলাকার কাঁচা রাস্তাঘাট, ফসল ও বিভিন্ন সবজির ক্ষেত। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে রাতের মধ্যেই আরো নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বন্যা কবলিত ওইসব এলাকার সাধারণ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলায় এবারের বন্যায় ৫ ইউনিয়নের ১২৫ হেক্টর জমির ফসল এর মধ্যে ১৫ একর বীজ তলা, ৪০ হেক্টর আমন বীজতলা, ৬০ হেক্টর সবজিসহ মোট ১২৫ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল তলিয়ে গেছে। তবে দুই দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি হবে না বলে জানালেন সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা পিকন কুমার সাহা।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com