সাখাওয়াতের ফাঁসি, ৭ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

এই সংবাদ ৪১ বার পঠিত

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত যশোরের সাবেক এমপি জাতীয় পার্টির নেতা সাখাওয়াত হোসেনসহ ৮ রাজাকারের বিরুদ্ধে মামলার ৭৬৮ পৃষ্ঠার রায়ের সার-সংক্ষেপ ঘোষণা করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এতে বলা হয়, ৫টি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। রায়ে জাতীয় পার্টি নেতা মাওলানা সাথাওয়াত হোসেনের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে, দুই অভিযোগে অন্য ৭ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়।

সাখাওয়াত ছাড়া বাকি ৭ আসামি হলেন : মো. বিল্লাল হোসেন বিশ্বাস, মো. ইব্রাহিম হোসাইন, শেখ মো. মজিবুর রহমান, এম এ আজিজ সরদার, আব্দুল আজিজ সরদার, কাজী ওহিদুল ইসলাম ও মো. আব্দুল খালেক। তাদের মধ্যে এদের মধ্যে সাখাওয়াত ও বিল্লাল আদালতে উপস্থিত রয়েছেন। বাকি ছয়জনকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচার কাজ চলে।

এ মামলায় অভিযুক্ত আরেক আসামি মো. লুৎফর মোড়ল কারাবন্দি থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে মারা যান। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অপহরণ, আটক, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫ অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বুধবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে বিচারপতি আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনালে রায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যানের প্রারম্ভিক বক্তব্যের পর বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম ৭৬৮ পৃষ্ঠার রায়ের সার-সংক্ষেপ পড়া শুরু করেন। অপর বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীও এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষে বিচারপতি আনোয়ারুল হক সাজা ঘোষণা করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে ভিত্তিতে এই রায় এসেছে বলে প্রারম্ভিক বক্তব্যে জানিয়েছেন তিনি। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর এটি ২৬তম রায়। শাহবাগ থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, বুধবার সকালে দুই আসামিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ট্রাইব্যুনালে পৌঁছানোর পর তাদের নেয়া হয় বিচারকক্ষের কাঠগড়ায়। এ রায় ঘিরে বরাবরের মতোই ট্রাইব্যুনাল এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সবগুলো প্রবেশ পথে করা হয়েছে তল্লাশির ব্যবস্থা।

যুদ্ধাপরাধের ৫ অভিযোগে গত বছর ২৩ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে গত ১৪ জুলাই আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে। চলতি বছর ৩১ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর মোট ১৭ জন সাক্ষ্য দেন। এদিকে, আসামিপক্ষে কোনো সাফাই সাক্ষী ছিলেন না। রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, সঙ্গে ছিলেন রেজিয়া সুলতানা চমন। তারা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আরজি জানান।

এদিকে, সাখাওয়াতের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আব্দুস সাত্তার পালোয়ান। পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান। তারা অভিযোগ থেকে আসামিদের অব্যাহতির আবেদন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে যশোরে একাধিক মামলা হলে সেগুলো ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাখাওয়াতসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে প্রসিকিউশনের তদন্ত দল।

প্রসিকিউশনের আবেদনে ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে ২৯ নভেম্বর রাজধানীর উত্তরখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত বছর ১৮ জুন তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। এরপর ২৬ জুন অভিযোগ আমলে নেয়ার বিষয়ে শুনানি হয়। ১২ জনের মধ্যে ৩ জনের বিরুদ্ধে ‘অভিযোগের উপাদান’ না পাওয়ায় তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেয় ট্রাইব্যুনাল।

২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আদালত ৯ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়। এরপর ২৪ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের ওপর পক্ষে-বিপক্ষে শুনানি শেষে ২৩ ডিসেম্বর বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। বর্তমানে জাতীয় পার্টিতে থাকা সাখাওয়াত এক সময় ছিলেন জামাত নেতা। ১৯৯১ সালে জামাতে ইসলামীর পক্ষে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে যশোর-৬ আসন থেকে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন। তবে মেয়াদপূর্তির আগেই জামায়াত ছেড়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।

মাওলানা সাখাওয়াত নামে বেশি পরিচিত এই রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সময়ে এলডিপি ও পিডিপিতেও ঘুরে এসেছেন। গত সংসদ নির্বাচনে যশোর-৬ আসন থেকে তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেয়েছিলেন।

৫টি অভিযোগ :

অভিযোগ ১: যশোরের কেশবপুর উপজেলার বোগা গ্রামে এক নারীকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন এবং ধর্ষণ।

অভিযোগ ২: একই উপজেলার চিংড়া গ্রামের চাঁদতুল্য গাজী ও তার ছেলে আতিয়ারকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যা।

অভিযোগ ৩: কেশবপুরের চিংড়া গ্রামের মো. নুরুদ্দিন মোড়লকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন।

অভিযোগ ৪: কেশবপুরের হিজলডাঙার আ. মালেক সরদারকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও খুন।

অভিযোগ ৫: কেশবপুরের মহাদেবপুর গ্রামের মিরন শেখকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন এবং ওই গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com