আজ শুক্রবার, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ১লা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ বিকাল ৫:৫৩ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করবেন মীর কাসেম

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামাত নেতা মীর কাসেম আলী আপিলে ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করবেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। শনিবার সকালে মীর কাসেম আলীর সঙ্গে দেখা করতে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে যান তার ছেলেসহ পাঁচ আইনজীবী।তারা হলেন: মীর কাসেমের ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহম্মেদ বিন কাসেম, আইনজীবী মতিউর রহমান আকন্দ, বজলুর রহমান খান, নুরুল্লাহ ও নাজীবুর রহমান।দেখা করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান। দেখা শেষে এ কথা নিশ্চিত করেছেন তারা।

গত ৬ জুন যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামাতের অর্থের যোগানদাতা মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারির পর তা পাঠানো হয় কারাগারে, যার মধ্য দিয়ে তার সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরুর পথ তৈরি হয়। প্রায় তিন মাস আগে আপিল শুনানি করে মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড বহালের রায় দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত; সেই রায়ে সোমবার দুপুরে বিচারকরা সই করেন। এর পরপরই ২৪৪ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুনাভ চক্রবর্তী জানান, রায় প্রকাশের পর বিকালে তা পাঠানো হয় এ মামলার বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হক নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারক সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় আসামির মৃত্যু পরোয়ানায় সই করলে লাল সালুতে মুড়ে সেই পরোয়ানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয় বলে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. শহীদুল আলম ঝিনুক জানান। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ঘুরে পরোয়ানা যায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে; একাত্তরের বদর নেতা মীর কাসেম সেখানেই আছেন।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক জানান, রাতে আসামি ফাঁসির সেলে লকআপে চলে যাওয়ায় তাকে আর তখন মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়নি। মঙ্গলবার সকালে তাকে তা পড়ে শোনানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে। মৃত্যু পরোয়ানা হাতে পেলে আসামিকে তা পড়ে শোনাবে কারা কর্তৃপক্ষ। ওই পরোয়ানার ভিত্তিতেই শুরু হবে সাজা কার্যকরের প্রস্তুতি। অবশ্য দণ্ড কার্যকরের আগে আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগ পাবেন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম। রিভিউ না টিকলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষাও তিনি চাইতে পারবেন।

দুই আর্জিই নাকচ হলে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে কারা কর্তৃপক্ষ দণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থা নেবে। তার আগে আসামির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন পরিবারের সদস্যরা। মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন আহমেদকে খুনের দায়ে জামাতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড বহালের রায় আসে সর্বোচ্চ আদালত থেকে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ গত ৮ মার্চ এই রায়ের সংক্ষিপ্তসার জানিয়ে দেয়। বেঞ্চের অপর চার সদস্য হলেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিতদের মধ্যে এ নিয়ে মোট সাতজনের আপিলের নিষ্পত্তি শেষে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়ে রিভিউয়ের পর্যায়ে এল। নিয়ম অনুযায়ী, আসামিপক্ষ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবে। রিভিউ নিষ্পত্তি হওয়ার আগে দণ্ড কার্যকর করা যাবে না। আসামিপক্ষ রায়ের সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার পর থেকে সেই দিন গণনা শুরু হবে জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এই ১৫ দিনের ভেতরে তাকে রিভিউ পিটিশন দায়ের করতে হবে। আজই ট্রাইব্যুনাল থেকে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে এই রায়ের কপি পাঠানো হবে এবং মীর কাসেম আলীকে এই রায় সম্পর্কে অবগত করা হবে। রিভিউ পিটিশনের রায়ের উপরই নির্ভর করবে দণ্ড প্রক্রিয়ার পরবর্তী কার্যক্রম।

এদিকে, মীর কাসেমের ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহম্মেদ বিন কাসেম বলেন, আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেলে বাবার সঙ্গে কথা বলে রিভিউ আবেদন করার প্রস্তুতি নেব। দুই/এক দিনের মধ্যে আমরা কাশিমপুর কারাগারে যাব।

চূড়ান্ত রায়

একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ জুন মতিঝিলে নয়া দিগন্ত কার্যালয় থেকে কাসেমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর ৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার যুদ্ধাপরাধের বিচার। ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দুই অভিযোগে মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড এবং আট অভিযোগে সব মিলিয়ে ৭২ বছরের কারাদণ্ড হয়। এর ষোল মাস পর আপিলের রায়ে এক অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও ছয় অভিযোগে ৫৮ বছর কারাদণ্ডের সাজা বহাল রাখে সর্বোচ্চ আদালত। মার্চে যখন ওই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়, গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের বনডেম সেলে বসে তিনি সেই রায় শোনেন বলে কারা কর্তৃপক্ষ জানায়।

যে অভিযোগে ফাঁসি:

অভিযোগ ১১: ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। তাকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হলে আরো পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশসহ তার মৃতদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

ট্রাইব্যুনালে তিন বিচারকের ঐক্যমতের ভিত্তিতে এ অভিযোগে মীর কাসেমের ফাঁসির রায় হয়। আপিলেও তা বহাল থাকে। এ মামলার বিচারে রাষ্ট্রপক্ষ ৬৩ বছর বয়সী মীর কাসেমকে আখ্যায়িত করেছে পাকিস্তানের খান সেনাদের সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হওয়া ‘বাঙালি খান’ হিসাবে, যিনি সে সময় জামায়াতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা উঠে এসেছে এই রায়ে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, একাত্তরে তার নির্দেশেই চট্টগ্রাম টেলিগ্রাফ অফিস সংলগ্ন এলাকায় হিন্দু মালিকানাধীন মহামায়া ভবন দখল করে নাম দেওয়া হয় ডালিম হোটেল। সেখানে গড়ে তোলা হয় বদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঘাঁটি এবং বন্দিশিবির। সেখানে অসংখ্য মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়, যাদের লাশ পরে ফেলে দেওয়া হতো চাক্তাই চামড়ার গুদাম সংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণে সেই ডালিম হোটেলকে বলা হয় ‘ডেথ ফ্যাক্টরি’।

ডালিম হোটেল ছাড়াও নগরীর চাক্তাই চামড়ার গুদামের দোস্ত মোহাম্মদ বিল্ডিং, দেওয়ানহাটের দেওয়ান হোটেল ও পাঁচলাইশ এলাকার সালমা মঞ্জিলে বদর বাহিনীর আলাদা ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র ছিল সে সময়। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ডালিম হোটেলে ঘটে যাওয়া সবধরনের অপরাধের ব্যাপারে সবকিছুই জানতেন মীর কাসেম। এসব অপরাধে তার ‘কর্তৃত্বপূর্ণ’ অংশগ্রহণও প্রমাণিত। ফলে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৪ (২) ধারা অনুযায়ী তিনি ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের’ দোষে দোষী।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মীর কাসেম ১৯৮৫ সাল থেকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ অর্থাৎ মজলিসে শুরার সদস্য হিসেবে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। তিনি হলেন জামাতের পঞ্চম শীর্ষ নেতা, চূড়ান্ত রায়েও যার সর্বোচ্চ সাজার সিদ্ধান্ত এসেছে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com