বর্ষবরণ উৎসবের জন্য রাবিতে চলছে জোর প্রস্তুতি

১৯৫ বার পঠিত

জি.এ.মিল্ট, রাবি প্রতিনিধি : সব জীর্ণ-দীর্ণ বিভেদ ভুলে ভালোবাসা, মায়া স্নেহ আর মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার দিন পহেলা বৈশাখ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একই আবাহনে মিলিত হয় এই দিনে। দিনটির সঙ্গে বাঙালির বিশ্বাস-সংস্কার-রীতি-নীতি এবং অভ্যাস অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাঙালির হৃদয়ে অসম্ভব রকমের নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে এই বৈশাখের এই দিনটি।

সারা দেশের মত পহেলা বৈশাখে প্রায় ৩৩ হাজার সদস্যের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) পরিবারও মেতে ওঠে প্রাণের উচ্ছ্বাসে। বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানাতে দেবদারু ঘেরা উত্তরবঙ্গের এ শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠে চলছে জোর প্রস্তুতি।

নতুন সৃষ্টির প্রত্যয়, কূপম-কতা পরিত্যাগ করে নব উদ্যেমে চলার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতি বছরের মত এবারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিভিন্ন বিভাগে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হাতে নিয়েছে নানা আয়োজন। বাঙালী সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলতে এবং বাঙালী জাতির প্রাণের এ উৎসবে মেতে উঠতে চলছে শিক্ষার্থীদের অক্লান্ত পরিশ্রম।

বিভিন্ন বিভাগ ও সংগঠনের পৃথক বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের জন্য স্থান নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে। চলছে মঞ্চসজ্জা, ব্যানার, ফেস্টুন তৈরির কাজ। মঙ্গল শোভাযাত্রায় বাঙালীর ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচার তুলে ধরতে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন জিনিসপত্র। নানা রঙ্গে তৈরি হচ্ছে এইসব জিনিসপত্র। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য জোরে সোরে চলছে রিহার্সেল (অনুশীলন)। সব মিলিয়ে বর্ষবরণে মুখিয়ে আছে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ষবরণের মূল আয়োজন থাকছে চারুকলা ঘিরে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, গোটা রাজশাহীবাসী পহেলা বৈশাখে একবার হলেও ছুটে আসেন চারুকলা চত্ত্বরের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলায়। অংশ নেন চারুকলা আয়োজিত বর্ণিল আয়োজনের মঙ্গল শোভাযাত্রায়।

রোববার দুপুরে চারুকলা চত্ত্বরে গিয়ে দেখা যায়, হাসি-গান আর আড্ডায় বৈশাখ উদযাপনে প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। তাদের কেউ কেউ বানাচ্ছে বাঘ, হাতি, ঘোড়া, পেঁচার মুখোশ। পাশে অন্য আরেকটি দল তৈর করছে বিশাল আকৃতির ‘গিরগিটি’। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থাকবে এই ‘গিরগিটি’। যার মধ্য দিয়ে বিশেষ বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানালেন আয়োজকরা।

গিরগিটি তৈরিতে ব্যস্তদের একজন শাহিনুর রহমান। তিনি জানান, আমাদের তরুণ প্রজন্ম এখন পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছে। সারা বছর তারা বিদেশি বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। তবে বাঙালী কৃষ্টি-কালচার তারা ভুলতে পারে না। বৈশাখ এলে তারা গিরগিটির মত রং পাল্টে মিলিত হয় একই আবাহনে। এটা বাঙালি সংস্কৃতির নিজস্বতা ও শক্তমত্তা প্রকাশ করে। ‘গিরগিটি’ প্রতীকের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাঙালী সংস্কৃতিতে ফিরে আসার বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হবে।

জানতে চাইলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চোধুরী জানান, চারুকলা অনুষদ পহেলা বৈশাখ উদযাপনে সাধ্য অনুযায়ী সকল প্রস্তুতি বেশ আগে শুরু করেছে, কাজ প্রায় শেষের দিকে। তবে পর্যাপ্ত অর্থে বরাদ্দ পাওয়া গেলে উৎসব আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব হত।

তিনি বলেন, এবার পহেলা বৈশাখ উদযাপনে মাত্র তিন লক্ষ টাকা বাজেট করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান স্পন্সর হয়ে এক লক্ষ টাকা দিচ্ছে। বাকিটা চারুকলা অনুষদকে বহন করতে হচ্ছে। অথচ মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ বিশাল আকৃতির গিরগিটি তৈরি করতে লক্ষ টাকার মত ব্যয় হচ্ছে। এত অল্প পরিমাণ অর্থ দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পহেলা বৈশাখের আয়োজন বেশ কষ্টসাধ্য বলে জানান তিনি।

চারুকলা অনুষদের অধিকর্তা ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চারকলা অনুষদ এবারও তিন দিনব্যাপী বৈশাখী উৎসবের আয়োজন করেছে। প্রথম দিন সকাল ৮টায় সঙ্গীত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হবে। পরে সকাল ৯টায় মঙ্গল শোভাযাত্রা। দুপুর আড়াইটায় থাকবে অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় সমবেত সঙ্গীত, লোক সঙ্গীত ও বাউল সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃতি, হরবোলা, অভিনয় ও বাঙালী ফ্যাশন শো।

আর দ্বিতীয় দিনে বেলা ৩ টায় সুন্দরম আবৃতি গোষ্ঠীর ও চারুকলার শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় নৃত্য, আবৃতি ও অভিনয়। বিকেল ৫টায় সমান্তরাল ও অন্যান্য গোষ্ঠীর পরিবেশনায় ব্যান্ড সঙ্গীত অনষ্ঠান। তৃতীয় দিন বিকেল সাড়ে ৩টায় চারুকলার শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা এবং ‘আধাঁরের মুসাফির’ যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে অন্য বিভিন্ন বিভাগও পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নানা আয়োজন হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে বাংলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত বাংলা সমিতি, নাট্যকলা, সঙ্গীত, ফোকলোর, মার্কেটিং, হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা, ফিন্যান্স, আইন বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগ পহেলা বৈশাখ উদযাপনে জোরেসোরে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নাট্যকলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান রাজু বলেন, নাট্যকলা বিভাগ প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এ বছরও আমাদের বেশ কিছু আয়োজন রয়েছে। অনুষ্ঠান সফল করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কাজ করছেন। ক্যাম্পাসে পহেলা বৈশাখের উৎসব আরও আনন্দময় করে তুলতে নাট্যকলা বিভাগের আয়োজন সফল হবে বলে আশা করছি।

মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজ মুন্না বলেন, আমাদের বিভাগে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে নানা আয়োজন করা হয়। তবে এবার একটু ভিন্ন ধারার আয়োজন করা হচ্ছে। বিভাগের প্রতিটি ব্যাচের ছেলেরা একই রঙের পাঞ্জাবী, আর মেয়েরা একই রঙের শাড়ি পরে বৈশাখ উদযাপন করবে। আশা করছি- বাঙালির প্রাণের উৎসবে মার্কেটিং বিভাগ এবার জমকালো আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরবে।

বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার বলেন, এবারই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করব। ভাবতেই অন্যরকম এক অনুভূতি হচ্ছে। বড় ভাইয়া আপুদের কাছে পহেলা বৈশাখে ক্যাম্পাসে ও বিভাগে খুব মজা হয় বলে জেনেছি, দিনটির জন্য মুখিয়ে আছি।

এদিকে পহেলা বৈশাখের আগের দিন সন্ধ্যায় চৈত্র সংক্রান্তি অনুষ্ঠানের আয়োজনও করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগসহ বেশ কয়েকটি বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ ঈসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের সন্ধ্যায় চৈত্রের শেষ দিনে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনুষ্ঠান শুরু হবে বলে বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে যাতে কোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সেজন্য গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওইদিন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে বলে প্রশাসন সূত্র জানা গেছে। পহেলা বৈশাখের দিনে বেশ কিছু নির্দেশনাও দিয়ে দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পহেলা বৈশাখে ক্যাম্পাসে যানবহন প্রবেশে থাকবে কড়াকড়ি। এছাড়া বিকেল ৫টার মধ্যে সকলকে অনুষ্ঠান শেষ করে ক্যাম্পাস ছাড়তে হবে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জি.এ.মিল্টন, রাবি প্রতিনিধি #

গাউছুল আজম মিল্টন শহীদ হবিবুর রহমান হল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী - ৬২০৫ ০১৭৬৩-২৩৭৭৭৬

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com