আইরিন সুলতানা’র “জীবিতের বা মৃতের সহিত সম্পর্কহীন” – লুৎফুর রহমান পাশা

১২৯ বার পঠিত

গনিকার সাথে রতিক্রিয়ার সময় হার্টএটাকে মারা গেছে এক খদ্দের। লাশের দাবীদার নেই। ধর্ম জানা নেই ফলে সত্কার করা যাচ্ছেনা। কিন্তু একজন দর্শনের ছাত্র দাবী করলেন ডিএনএ টেষ্টের মাধ্যমে তার ধর্মীয় পরিচয় পাওয়ার সম্ভব। এমনই একটি মামলা চলছে কোর্টে। বিচারকের আসনে বসে ডিএনএ টেষ্টের পক্ষেই রায় দিয়েছেন বিচারক জয়নাল বৈরাগী। ফলাফল কি হতে পারে?

ডিএনএ টেষ্টে ধর্মীয় পরিচয় পাওয়া যাবে কিনা অথবা মৃত লাশের ধর্মীয় পরিচয় পাওয়া যাবে কিনা এটি একটি অমীমাসিংত প্রশ্ন। ধর্ম মানুষের জন্য নাকি মানুষ ধর্মের জন্য এর সুরাহা যেদিন ঘটবে অথবা ধর্ম মানুষের পরিচয় দিতে পারে নাকি মানুষ ধর্মের পরিচয় দিতে পারে, এমন প্রশ্নে উত্তর যেদিন মিলবে সেদিন হয়তো এর মীমাংসা হতে পারে।

তবে আমরা লেখকের পরিচয় দিতে পারি। আমার বন্ধু ভাষাচিত্র প্রকাশনীর প্রকাশক খন্দকার সোহেল বলেছে পাঠকরা এখন লেখকেরলেখার পাশাপাশি লেখককেও পাঠ করে। আমি অনেক পাঠকের সাথে কথা বলেও দেখেছি তারা একই সংগে লেখার পাশাপাশি লেখককেও পছন্দের তালিকায় রাখতে চান। লেখকের ব্যক্তিগত কোন আচরন যদি পছন্দ থেকে সরে যায় তাহলে তার লেখাও মুল্যমান হারাতে শুরু করে। এমন উদাহরন আমাদের লেখক সমাজে ভুড়ি ভুড়ি। সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে উচু মানের পাঠক, সমালোচকদের মাঝেও এই ধারা তাদের অবস্থানের সাথে সমানুপাতিক।

বাংলাদেশে বাংলা ব্লগের সুবর্ণ সময়ে যে কয়েকজন ব্লগার লেখক পরিচিতি পেয়েছে আইরিন সুলতানা তাদের একজন। যদিও অনেকে মনে করেন ব্লগের লেখক আর মুলধারার লেখকের মধ্যে তফাত আছে তবুও ব্লগারদের মধ্যে থেকেও ভাল মানের লেখক আছে এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। আবার প্রশ্ন থেকে যায় মুল ধারার সকল লেখকই ভাল? অথবা তারা সাহিত্যের বিশেষ কিছু নিয়ে লিখেন যা ব্লগ থেকে আসা লেখকরা পারছেন না।

সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে “কোনটা সরেস সাহিত্য আর কোনটা নিরেস সাহিত্য সে সম্পর্কে হলফ করে কিছু বলা যায়না”। “প্রথমত ভোট দিয়ে সাহিত্য বিচার হয়না”।“সরেস সাহিত্যিক এবং নিরেস সাহিত্যিকে পার্থক্য করা অসম্ভব”। সুতরাং আমি মনে করি পাঠক প্রিয়তা যেখানে যোগ্যতার মাপকাঠি সেখানে মুলধারা নিয়ে বিতর্ক বিবেচনার দাবী রাখে।

এসব কথা বলছি আইরিন সুলতানা’র ছোট গল্পের বই “জীবিতের বা মৃতের সহিত সম্পর্কহীন” পাঠের সুত্র ধরে। এক রঙ্গা এক ঘুড়ি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটি প্রকাশিত হয়েছে ফেব্রুয়ারী-২০১৭ সালে। সুদৃশ্য বাধাই কৃত মলাটের প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। প্রচ্ছদ শিল্পী নিয়ে দ্বন্ধ তৈরী হবে। কেননা ফ্লাপে প্রচ্ছদ শিল্পীর নামের জায়গা নবী হোসেন শোভা পাচ্ছে। বইটি উল্টে পাল্টে নামের জায়গায়ও একটা খটকা লাগবে। “জীবিতের বা মৃতের সহিত সম্পর্কহীন” নাকি “জীবিত বা মৃতের সহিত সম্পর্কহীন”। দুই ধরনের নামই বইয়ের মলাট এবং অভ্যন্তরে দেখতে পাওয়া যাবে। তবে আমার কাছে জীবিত বা মৃতের সহিত সম্পর্কহীন নামটি বেশী যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে।

ছোট গল্প কেমন হয় বা কেমন হওয়া উচিত এই নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে আইরিন সুলতানা কেমন গল্প লিখেছে অথবা গল্প গুলোকে কিভাবে লিখেছে এই নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। আমার কাছে মনে হয়েছে আইরিন সুলতানা প্রথমেই একটা বৃত্ত ঠিক করে নিয়েছেন তারপর সেই বৃত্তের ভিতরে বসে গল্প গুলো কে বর্ণনা করতে চেয়েছেন। ছোট গল্পের শেষে তৃষ্ণা থাকতে হবে এটা আরোপিত হয়ে গেলে গল্পের সেই টান থাকেনা। আরোপিত গল্পের কোন প্লট দিয়ে ছোট গল্পের মেজাজ ধরে রাখা সম্ভব হয়না।

গল্পের ভাষা বেশ নিয়ে কোন কথা হবেনা। নাগরিক ব্যস্ততায় ভাষার কারসাজি ভাববার মত পর্যাপ্ত সময় আমাদের নেই। তদুপরি লেখক ভেবেছেন। সহজ সরল সাবলিল প্রাঞ্জল ভাষায় পাঠকের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করেছেন। বইটি সংকলিত ১৬ টি গল্পের গল্প আলাদা, উপস্থাপনার ধরন আলাদা কিন্তু গল্প গুলো একই। আমাদের চারিপাশে ঘটমান নাগরিক যাপিত জীবনের গল্প। একই প্রেক্ষাপটে চলমান কিছু মানুষের প্রতিদিনকার কিছু ঘটনা গল্প আকারে তুলে এনেছেন আইরিন সুলতান।

প্রতিটি গল্প আলাদা করে বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছিনা। তবে যে গুলো বিশেষ করে ভাল লেগেছে কিংবা পাঠককে ভাবাতে সাহায্য করবে সেই গুলো নিয়ে কলম চালানো যেতে পারে। আইরিন সুলতানা আমারদের চারিপাশ থেকে গল্পের উপাদান সংগ্রহ করেছেন। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোকে লিপিবদ্ধ করে রাখতে চেয়েছেন। তারই একটি গল্প বজলুল পাই যে সন্ধ্যায় খুন হলেন। আলোর ঝলকানী আমরা দেখি। সেই গুলোকে স্মৃতিতে ধরে রাখতে চাই। যাকে নিয়ে আলোকজ্বল সন্ধ্যা তার খোঁজ কতখানি রাখি। আমরা কি তবে অঘটনকে যতটা রংচং দিয়ে উপস্থাপনা করতে সময় ব্যয় করি ঠিক ততটা সময়কি অঘটন প্রতিরোধে ব্যয় করি প্রশ্ন থেকে যায়।

গনক জামালের ভাগ্য পাথর, এক বয়াম জুতো গল্পের চরিত্র গুলো আমাদের প্রতিবেশী। এরা আমাদের চারিপাশে ঘুরে বেড়ায়। আমরা প্রতিদিন মানুষ দেখি। নানান রকমের মানুষ নানান রকমের চেহারা নানান রকমের চিন্তা ভাবনা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমরা তাদের দেখতে পাইনা। তাদের চেষ্টা তাদের বেঁচে থাকার চেস্টাগুলো আমাদের অলক্ষ্যে থেকেই আবার অলক্ষ্যেই হারিয়ে যায়।

ভাল লাগবে গল্পটি জীবিত বা মৃত টকশোর সহিত সম্পর্কহীন।টকশোর বাজারে রমরমা টক শো জীবির একদিনে তিনটা টক শো সিরিয়াল পড়ে যায়। ব্যপারটা বেশ উপভোগ্য বটে। যিনি টক শোতে যাচ্ছেন নিজেকে সাধারণের চাইতে আলাদা ভাবেন। এই ভাবনা দৃঢ় ভাবে পাঠকের মনে ভাবাতে পেরেছেন লেখক। এছাড়া ভালো লাগবে “অন্তরের হাউজ”। দুজন মানুষের স্বপ্ন দেখার গল্প। সময়ের ব্যবধানে স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবার গল্প। সে তার মেয়েকে টিভি পর্দায় দেখতে চায়। একসময় সেই ইচ্ছা পুরন হয় তার নিজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ছোট নিস্পাপ শিশুটিকে টিভি পর্দায় দেখা যায় তার মৃত্যু নিয়ে রিপোর্টকারী রিপোর্টারের ক্যমেরায়।

সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের গল্প চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে। একটা পুর্ণিমার রাত। একই আকাশের নিচে একই সময়ে অনেক গুলো ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন জায়গায়। উপর থেকে সে গুলোকে দেখে এক সাথে লিপিবদ্ধ করেছেন এই গল্পে। একজন লেখকের নৈতিক অবক্ষয়ের গল্প প্রকাশিতব্য পান্ডুলিপি।

একজন লেখকের সকল গল্প সবার কাছে ভাল লাগবে এমন কোন কথা নেই। আবার একজনের খারাপ লাগা গল্প গুলো কারো কাছে অনেক ভালো লেগে যেতে পারে। সেই বিবেচনায় ভাল লাগার নির্দিষ্ট কোন তালিকা নেই। তবুও ইজ্জত আলীর কবর, অসম্পুর্ণতা গল্প এক পশলা নীল, চাকা এই গল্প গুলি বিশেষ ভাবে ভাল লাগবে। কিছু গল্প গল্পের কারণে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেনি যে গুলো লেখক বয়ান দিয়ে পার করে দিতে চেয়েছেন। আবার কোনটা হয়তো গল্প হতে পারতো যে গুলোকে পুর্বপরিকল্পনানুযায়ী আরোপ করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছেন।

সব মিলিয়ে সুখ পাঠ্য হতে পারে আইরিন সুলতানার জীবিত বা মৃতের সহিত সম্পর্কহীন। এছাড়া যারা ব্লগের লেখকদের মুলধারা কিনা বিতর্ক তুলতে চান তাদের জন্য একবার পড়ে দেখার অনুরোধ করা যেতে পারে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com