,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে
Art by JMaldonado

প্রকৃতির খামখেয়ালি ।। সাইফুল বাতেন টিটো

লাইক এবং শেয়ার করুন

২০০৩ সালের আগস্টের দিকে আমি ঢাকায় একটি নামকরা চেইন রেস্টুরেন্টে সেলস্ ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করি। জয়েন করার তিন দিনের মাথায় চমৎকার পাঁচ বক্স ভিজিটিং কার্ড দিয়ে গেলো এইচআরের লোক। “সৌরভ খন্দকার” ম্যানেজার, সেলস এন্ড কাস্টমার কেয়ার।” রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি এদের কেক পেষ্ট্রি বিজনেসও বেশ নামকরা। বেতনটা বেশ ভালো হওয়ায় সবকিছু আমার জন্য বেশ ভালই ছিলো বলতে হবে। সাথে অধিনস্তদের সম্মানটাও। চাকরি খরাপ না। কিন্তু পরিশ্রমটা অমানুষিক। দিন নাই রাত নাই। মালিক বিদেশী। সে ক্ষেত্রে যে সুবিধাটা পাচ্ছি তা হল যত বেশি পরিশ্রম তত বেশি টাকা। ব্যপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। আমি যে শাখায় ছিলাম তার অবস্থান ফার্মগেট। সেখানে যদি রাত বারোটার আগে পঞ্চাশ টাকা সেল হয় তবে আমরা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১০% পাব। খারাপ না। আর আমরাও অতিরিক্ত পাওয়ার জন্য পরিশ্রম করতাম। মালিকের বাড়ি ইংল্যান্ড অথাৎ প্রভুর দেশ। কথায় বলে ইংল্যান্ড এর শাসনের সূর্য অস্ত যায়না। কথাটার ভাবার্থ হল ইংল্যান্ড ক্রমান্বয়ে বিষ্ণুব রেখার এপাশ ওপাশ, পৃথিবীর এপিঠ ওপিঠ উল্টে পাল্টে বীরদর্পে শাসন ও শোষন করে বেরিয়েছে এক সময়। যাই হোক, মোটামোটি সবারই জানা যে ইংল্যান্ডের শ্রমিক আর উপরস্থ কর্তাদের মধ্যে কখনও বন্ধুত্ব হয়না। কর্ম ক্ষেত্রে তারা বেশ ফারাক রেখে কাজ করে। আমার কোম্পানীর মালিক যেহেতু সাদা চামড়ার, সেহেতু ঐ ব্যবস্থাটা আমার কোম্পানীতেও বেশ চালু ছিল। কিন্তু আমি পরেছি বিপাকে। কারণ আমি একজন জুনিয়র অফিসার। তার উপর আবার বয়স কম। সেলস্ ম্যান, ক্যাশিয়ার, একাউন্টস অফিসার, এরা সবাই আমার থেকে বয়সে ঢের বড়। যার জন্য তাদের সাথে বন্ধুত্ব তো পরের কথা অফিসিয়াল কথা ছাড়া ভাল করে কথাও হতো না। আর স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য কর্মচারীদের সাথে তো একদম-ই না। এটাই ছিল আমার বিপাকে পড়ার কারণ। কিন্তু আমি সাম্যবাদী ভাবধারার মানুষ; সবার সাথে আরাম করে জমিয়ে কথা না বলতে পারলে মনের মধ্যে খচ খচ করে। ওরাও ছিলো বদের হাড্ডি। আমার সাথে কথা বলতে চাইতোনা। প্রশ্ন করলে উত্তর দিতো নয়তো না। কিন্তু আমি চাইছিলাম সবার মধ্যে একটা সু-সম্পর্ক তৈরি করতে। কতটা পেরেছিলাম জানিনা। তবে ওরা নিজেদের মধ্যে বেশ কথাটথা বলত, হাসিমজা করত। সবাই ছিল বেশ উচ্ছল আর প্রাণবন্ত। কিন্তু একজন কখনও কারো সাথে কথা বলত না। আমি প্রথম দিন তো ভেবেছি লোকটা বোবা নাকি? বোবারাতো কানে শোনেনা। আমরা অনেকে ভাবি বোবাদের গলায় সমস্যা, এজন্য কথা বলেনা। কিন্তু তার প্রকৃত সমস্যা কানে। সে কানে শোনোনা যার জন্য মানুষ কি বলে বা কিভাবে বলে সে বোঝেনা। ফলে সে কথা বলতে পারে না। আমি ভাবলাম লোকটা বোবা নাকি? পরে দেখি যে না সে দিব্যি কানো শোনে। কিন্তু কথা বলেনা। পরে ভাবলাম এর কণ্ঠটা হয়তো এমন বিশ্রী যে সে কথা বলতে চায়না। এরকম হয় অনেক সময়। আমাদের কলেজে এক ছেলে ছিল নাম প্রশান্ত। কি মিষ্টি চেহারা। মায়া কাড়া চোখ কিন্তু কথা বলতো না। কারণ ওর কণ্ঠটা ছিল বেশ খন খনে। টিভিতে অনেক সময় কার্টুনের বুড়ো চরিত্র গুলোর যে রকম কণ্ঠ থাকে ওর কণ্ঠটা ছিল অনেকটা সেরকম। যাই হোক একদিন আমি ঐ সেলসম্যানের নেম প্লেটের নাম ধরে ডাকলাম,
– বুলবুল এদিকে আসেন তো একটু। বুলবুল ছুটে এলো।
-আপনি ভাল আছেন?
– জ্বি স্যার ভাল আছি।
-আপনার দেশের বাড়ী কোথায়?
-ঈশ্বরদী স্যার।
-এখানে কতদিন ধরে কাজ করেন?
-সাড়ে ৫ বছর স্যার।
-বাহ! অনেক দিনতো। বাড়িতে যান না?
-না স্যার।
-কেন? বাড়িতে কে কে আছে?
-কেউ নাই স্যার।
-বাবা মা নাই?
-না।
-ওহ সরি। বিয়ে করেন নি?
বুলবুল কোন কথা বলল না। ভাবলাম এখানেও হয়তো তার কোন দুঃখের স্মৃতি আছে তাই আর ঘটাঘাটি করলাম না।
-ঠিক আছে পরে কথা হবে যান।
-জ্বি স্যার। স্লামালিকুম।

আমি এবার বুঝতে পারলাম লোকটার বাবা মা বা স্ত্রী নিয়ে হয়তো কোন দুঃখের ব্যাপার ঘটেছে যা লোকটাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। আহারে বেচেরা। হয়তো এমনও হতে পারে বাবা মা স্ত্রী সন্তান সাথে ছোট ভাইকে নিয়ে বাসে করে ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহী যাচ্ছিল, রোড এক্সিডেন্টে বুলবুল বাদে সবাই মারা গিয়েছে। প্রায়ই এরকম খবর চোখে পরে আমার। কিন্তু এর চেয়েও যে বড় কোন চমক আমার জন্য অপেক্ষা করছিল তা বুলবুলের সাথে একরাত না কাটালে হয়তো কোন দিন জানতে পারতাম না।

সেদিন ছিলো কাল ২৪শে ডিসেম্বর দিবাগত রাত। পরের দিন খ্রিষ্টানদের বড় দিন। যথেষ্ট সেল হচ্ছে। শুধু কেক। প্রত্যেক ব্রাঞ্চ থেকে কিছু সময় পর পর ফোন আসছে আরো কেক পাঠাও আরো কেক পাঠাও…. বাব্বা কত কেক খায়? সারা দিনে শুধু এই ব্রাঞ্চ থেকেই কেক বিক্রি করেছি লাখ দেড়ের টাকার। খাবারও সময় পাইনি। এখন রাত পৌনে দশটা। আশ্চয্যের বিষয় এই যে, রাত যত-ই বাড়ছে ততই বাড়ছে কেক বিক্রির পরিমান। কেক প্রেস্ট্রি শেফ ফাঁকে দাঁত বের করে বলে গিয়েছে…
-স্যার বোনাস বাড়াইয়া দিবেন কিন্তু। শোয়া একটার সময় এজিএম মোফাখ্খর স্যার আমাকে ফোন করে বললেন দোকান বন্ধ করার জন্য। আমি বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু হিসাব ক্লোজ করতে আড়াইটার মত বেজে গেল। বুলবুল ক্যাশ কাউন্টারে বসে বলে বুলবুকেও আমার সাথে থাকতে হবে।  আড়াইটার সময় ও প্রায় সবাই চলে গেলে কারণ সবার বাসাই আশেপাশে আমি আর বুলবুল যেতে পারলাম না। আমার বাসা উত্তরা আর বুলবুলের মতিঝিল। শেষ পর্যন্ত আমাদের দুইজনার-ই থাকতে হল। দোতলায় একটা রুম আছে যেখানে দুটি খাটের একটাতে বুলবুল আর একটাতে আমি শুয়ে পড়লাম। আমি শুয়ে এপাশ ওপাশ করছি ঘুম আসছে না। এক সময় টের পেলাম বুলবুলও তাই করছে।
-কি ব্যাপার বুলবুল ঘুম আসছে না?
-না স্যার। আমার রাত্রে ঘুম হয়না। বুলবুল সামান্য সেলসম্যান হলেও ওর কথা বলার ধরণ বেশ ভাল।
-ওমা! কি বলেন? রাত্রে ঘুম না হলে ঘুমান কখন?
-আমি স্যার দিনে ঘুমাই। এই জন্যই আমি ইভিনিং সিফটে কাজ করি।
ও তাইতো আমি এত দিন ব্যাপারটা খেয়াল করিনি বুলবুলকে কখনও মর্নিং সিফট এ ডিউটি করতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না
-আপনার কোন সমস্যা না থাকলে আসুন আমরা গল্প করে রাত পার করে দেই। দিনে ঘুমানো যাবে। কালতো ছুটি আছে। আমি লাইট জ্বালিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। বেশ ঠান্ডা পড়েছে। বুলবুল উঠে বসল।
-কি গল্প করব স্যার?
-এই যে ধরেন আপনার বাড়ীর কথা, আমার বাড়ীর কথা। আপনার বাবা মা কিভাবে মারা গেল। ইত্যাদি ইত্যাদি।
বুলবুল খানিকক্ষণ নিরব থেকে বলল
-স্যার আজ পর্যন্ত কেউ আমার কাছে কোন কিছু জানতে চায়নি। আজ আপনি যেহেতু জানতে চেয়েছেন আমি সব বলব। কিন্তু সব শোনার পর আপনি আমাকে বেশ খারাপ ভাবতে শুরু করবেন।
-না না না….. তা কেন? কারো ব্যক্তিগত লাইফ থাকতেই পারে। আর আমি তো তা ফ্রেন্ডলি জানতে চাচ্ছি, তা নিয়ে পরে খারাপ ভাবার কিছুই নেই। আমি কথা দিচ্ছি আমি আপনাকে খারাপ ভাববো না। আপনি নিশ্চিন্তে বলে যান।
-স্যার প্লিজ কাউকে বলবেন না। আপনি এখানে যোগ দিয়েছেন মাস তিনেকের মতো। প্রথম থেকেই আপনাকে অন্য রকম মনে হয়েছে। আপনাকেই বলছি।
-ঠিক আছে আপনি নিশ্চিন্তে বলুন।
বুলবুল বলা শুরু করল আমি আর একটা সিগারেট ধরালাম।
“আমার দাদারা ছিলেন দুই ভাই। তার বাবা মারা যাওয়ার আগে বড় ছেলেকে ত্যাজ্য করেছিলেন এক খ্রিষ্ট্রান বিয়ে করার অপরাধে। ফলে সব সম্পতি পায় আমার দাদা। বিশাল সম্পত্তি পাওয়ায় এক অংশের জমিদার ছিলেন আমার দাদার বাবা। যার জন্য আমার দাদা উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদারি পেয়ে যায়। কিন্তু ততদিনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। তার পরেও আমার বাবার অঢেল সম্পত্তি, জমিদারি বাড়ি পেয়েছিল। আমার বাবার একটা ছোট বোন ছিল। দাদা মারা যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল ফুফুকে যেই বিয়ে করুক অবশ্যই ঘর জামাই থাকবে। পেয়েও গেলেন। কারণ আমার ফুফু ছিলেন বেশ রূপবতি এক মহিলা। এসব আমার জন্মের আগের ঘটনা। পরে শুনেছি। ফুফুর বিয়ে হল সাধারণ পরিবারের ছেলের সাথে। ফুফু আমাদের বাড়ীতেই থাকতেন। ফুফাও থাকতেন। ফুফা টুকটাক ব্যবসা করতেন আর জমিজমা ধানচাল ইত্যাদির হিসাব রাখতেন। ফুফুর এক মেয়ে ছিল আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড়। নাম আফিয়া। আমরা একত্রে বড় হয়েছি। খেলাধুলা, দুষ্টামি, পড়াশুনা সবই ওর সাথে করতাম। আমার আরেকটা ছোট ভাই আছে। আমি আর আফিয়া একই স্কুলে পড়তাম। ও ছিল আমার চেয়ে এক ক্লাস উপরে। আমি আমার ভাইয়ের চেয়ে ওর সাথেই বেশী মেলামেশা করতাম। ওই ছিল আমার সব কিছুর সঙ্গী। গ্রামের লেখা পড়া শুরু করেছি। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার বয়স ১৫/১৬ হবে আর ওর আরো বেশী। তখন থেকেই ও বেশ সন্দুরী ছিল। প্রায় প্রতিদিনই ওকে দেখতে আসতো বিভিন্ন জায়গা থেকে। কিন্তু ও বিয়েতে রাজি হতো না। রাজি না হওয়ায় কারণ ও আমার সাথে প্রেম করত। ও আমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবে না। আর আমিও না। কিন্তু বিষয়টা কেউ জানতো না। আমাদের বাড়ী ছিল অনেক বড়। অনেক গুলো ঘর। দোতলাটা ব্যবহার-ই হতো না। ফুফুর বিয়ের পর ফুফুকে আলাদা ঘর তৈরি করে দেয়া হয়েছিল। আর আমরা থাকতাম নীচ তলায়। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমরা মাঝে মধ্যে দোতলার একটা ঘরে যেতাম। ওকে জড়িয়ে ধরতাম চুমু খেতাম। এই পর্যন্তই। আমি আগাতে চাইলেও ও বাধা দিত। আমি বলতাম সমস্যা কি? আমরা তো বিয়ে করব। তার পরও চাইতো না। আমি জোড়াজুড়ি করতাম না। কিন্তু ইচ্ছা হত। খুব ইচ্ছা হত।
এরকম চলছে। একদিন বিকেলে আমরা আবার ঐ ঘরটায় গিয়েছি। আমার আজ মাথায় খারাপ কিছু চেপেছে। আজ কিছু একটা করেই ছাড়ব। যা আছে। আমরা অনেক আগেই কোরআন শরীফে হাত দিয়ে শপথ করেছি একে অন্যকে ছাড়া বিয়ে করবো না। আমরা দুজনে একে অপরকে আদর করে চলেছি। হঠাৎ ও বাধা দিল। আমি আশ্চয্য হলাম। কিন্তু আমার জিদ চেপে গিয়েছে। আমিও যেমন নাছড় বান্দা তেমনি সেও। হঠাৎ ও বলল আমি কিন্তু এখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ব। আচমকা আমার সব উত্তেজনা পানি হয়ে গেল। আমি রাগ করে নিচে নেমে এলাম। আমার মায়ের সাথে আমার বেশ বন্ধু সম্পর্ক ছিল। আমি মাকে সব খুলে বললাম। মা কিছুই বললে না। পরদিন একটা পারিবারিক মিটিং ডাকা হল। ফুফু, ফুফা, আফিয়া বাবা মা ভাই আছে। বাবা বললেন
-বুলু আমি তোমার মায়ের কাছে সব শুনেছি। কিন্তু তুমি কি জানো আফিয়া তোমার চেয়ে দুই বছরের বড়?
-হ্যা জানি।
-তাতে তোমার কোন আপত্তি নেই?
-না।
-আফিয়া তোমার…..?
আফিয়া মাথা নিচু করে আস্তে করে বলল- বুলুর আপত্তি না থাকলে আমারও নেই।
ফুফা ফুফু কিছুই বুঝলেন না। না সব কিছু খুলে বললেন। শুনে ফুফা ফুফু দুজনেই বেশ খুশি হলেন। সেই দিনের মিটিং এক ফয়সালা হল সামনের বৈশাখের ১ তারিখ আমাদের বিয়ে হবে। তখন কেবল পৌষ মাস, আমরা দু’জন কেবল নতুন ক্লাসে উঠেছি আমি এইটে ও নাইনে। আমিতো মহাখুশি। কারণ বাবা যে রাজি হবে তা আমি ভাবতেই পারিনি। বেশ মন দিয়ে লেখা পড়া করছি। কিন্তু কেন জানি মনে হল আফিয়া তেমন খুশি না। কিন্তু দোতলার রুমে যাওয়া বন্ধ হলনা। আমি এবার ওকে বললাম
-এবার তো তোমার কোন আপত্তি নেই বাবা মা ফুফা ফুফু সবাই জানে বৈশাখের এক তারিখ আমাদের বিয়ে হবে।
-ঠিক আছে বিয়ের পর। বিয়ের আগে যদি তুমি আবার ঐসব কথা বলো তাহলে আমি বিষ খাব বলে রাখলাম।
আমি আর কিছু বললাম না। এই তো আর কয়েকটা দিন। আমার দিন কাটছে মহা আনন্দে। আর কয়েক মাস পর বিয়ে। আমি ক্যালেন্ডার দেখে একটা কাগজে ছক কেটে তাতে উল্টো দিক থেকে দিন লিখে রাখলাম। আর প্রতিদিন সকালে উঠে একটা করে দিন কাটাতাম। বেশ ভালই চলছিল অপেক্ষার দিন গুলো। একদিন দুপুর বেলা, ও পুকুরে গোসল করত আগে থেকে জানতাম না। আমিও গিয়েছি। ওর গোসল প্রায় শেষ। কাপড় বদলাবে। আমি লুকিয়ে চুরিয়ে ওকে দেখার চেষ্টা করছি। হঠাৎ করে খেয়াল করলাম ওর পায়ে বেশ বড় বড় লোম। ঠিক পুরুষ মানুষের মত। ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন লাগল। আমি ওকে অনেক দেখেছি। কিন্তু এই ব্যাপারটা আগে কখনও খেয়াল করিনি। তবে বিষয়টা নিয়ে আমি তেমন মাথা ঘামাইনি তখন। এর মধ্যে আফিয়া ওর চাচার বাড়িতে গেলো বেড়াতে। ওকে দেখার জন্য আমার মন খালি ছটফট করছে। ও চাচা বাড়ি প্রায় পনের দিনের মত ছিল। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি ও ফিরেছে। বিকেলে আমি ওর কাছে গেলাম। কাছাকাছি গিয়ে আমি অবাক। গিয়ে দেখি ওর নাকের নিচে সুক্ষ গোফের রেখা, দেখতে বিশ্রি লাগে। আমাকে দেখে বলল
-কেমন আছ?
বেশ চমকে গেলাম। ওর কষ্ঠ বয়সন্ধি কালের ছেলেদের মত শুনাচ্ছে। আমি বললাম
-ভাল আছি তোমার কি ঠান্ডা লেগেছে? গলা ভেঙ্গেছে?
-নাহ! ঠান্ডা লাগবে কেন?
-তাহলে তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?
-কেমন?
-কেমন পুরুষ পুরষ।
আফিয়া কোন কথা বলল না। ওকে নিয়ে দোতলার রুমে যেতে চাইলাম। ও রাজি হল না।
আমার মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। আফিয়া কেমন যেন দিন দিন বেশ পরিবর্তন হচ্ছে। কয়েকদিন আমার সাথে কথাই বলল না। ওর মধ্যে নারী সুলভ ভাবটা উধাও হয়ে যাচ্ছে। একদিন দেখলাম ওর সেই গোফের দাগটা আর নেই। আমি বেশ খুশি হলাম। কিন্তু কাছে গিয়ে বেশ বুঝতে পারলাম ও সেভ করেছে। আমি দৌড়ে আমার রুমে এসে বালিস ধরে মেয়েদের বেশ ধরে কাঁদলাম। এসব কি হচ্ছে কেন হচ্ছে বুঝতে পারছিলাম না। তবে খারাপ কিছু একটা যে হচ্ছে তা বুঝতে পারছিলাম। এরপর আস্তে আস্তে ও আমার কাছ থেকে পালিয়ে থাকতে লাগল। আর আমি ছক থেকে দিন কাটতে লাগলাম। বিয়ের দিন এগিয়ে আসছে। কিন্তু ততদিনে সব শেষ! আফিয়া নিয়মিত সেভ করা শুরু করেছে। কণ্ঠ হয়েছে অবিকল পুরুষের মত। আর হাটাচলা সব হিজড়াদের মত। একদিন আমি ওকে জোর করে দোতলার রুমে নিয়ে গেলাম।
-কি হয়েছে তোমার?
আমি শক্ত করে ওর হাত চেপে ধরে জানতে চাইলাম।
উত্তরে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল আফিয়া। আমি ওকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম।
-বলো কি হয়েছে তোমার? তুমি এমন হয়েছো কেন? আমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন?
-আমি হিজড়া হইয়া গেছি। তুমি আমাকে বিয়া করতে পারবা না বুলু…..
-কে বলেছে তোমাকে এই সব কথা?
-ডাক্তার। আমার হরমানাল চেইঞ্জ হয়েছে। আমি আর স্বাভাবিক জীবনে কখনও ফিরে যেতে পারব না বুলু….
আফিয়া বুক ভাসিয়ে কাঁদছে আর বলছে এসব। আমি বললাম
-কোন শালা বলেছে ফিরতে পারবে না? তোমার একটা অসুখ হয়েছে। সেরে যাবে। চল কাল ডাক্তারের কাছে যাব।
-সারাবেলা, বুলু সারবেনা। এই কয়দিন আমি চাচার বাড়িতে যাই নাই। আব্বা আর মা আমাকে নিয়ে ঢাকার বড় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল, তারা অনেক বড় ডাক্তার দেখিয়েছে। তারা বলেছে আমি আর সারবো না। সারা জীবন এই ভাবেই থাকব। না মহিলা না পুরুষ, এবার আমি আফিয়া চেয়ে বেশী কান্নায় ভেঙ্গে পরলাম। আমি বললাম
-তুমি হিজড়া হলেও আমি তোমাকে বিয়ে করব। কারণ আমি তোমাকে ভালবাসি।
-না। তুমি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর। আমি কোন দিন মা হতে পারবনা। তুমি বাবা হতে পারবে না। তা ছাড়া আমার কাছে তুমি স্ত্রীর স্বাদ পাবে না।
-বাদ দাও তুমি স্ত্রীর স্বাদ। দরকার নাই। আমি তোমাকে বিয়ে করব। আমি তোমাকে ভালবাসি।
আমি রাতে মাকে সব বললাম। মা বলল–
-আমি সব জানি। তোর বাবাও জানে।
-আমি আফিয়াকেই বিয়ে করব।
-পাগল। তোর বাবা বলেছে আফিয়ার নাম মুখে আনলে তোকে গুলি করে মারবে।
-তাই মারো ওকে ছাড়া তো আমি বাঁচতে পারব না।
-বাদ দে তো ফালতু কথা। ওকে তুই কিভাবে বিয়ে করবি? পুরুষ মানুষ বিয়ে করে মহিলাকে। ওকি মহিলা?
-ও তো পুরষ ও না।
-ও হিজড়া। আর হিজড়াকে তো কেউ বিয়ে করে না।
-কেউ না করলেও আমি করব।
আফিয়ার ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষেধ। তাকে একটা রুমে আটকে রাখা হয়েছে সেখানে তাকে খাবার-দাবার দেয়া হয়। আমার অবস্থা হয়ে গেল পাগলের মত। মনে হল আমি আফিয়াকে ছাড়া বাঁচব না। ও হিজড়া হয়ে যাওয়ার পর ওর প্রতি আমার ভালবাসা একটুও কমেনি এবং বহুগুনে বেড়েছে। আমার মধ্যে পাগলামী শুরু হয়ে গেল। আমি মদ গাঁজা খাওয়া শুরু করলাম। একদিন সকাল বেলা দেখলাম এক দল হিজড়া এসেছে আফিয়াকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাবা তার বাবার রেখে যাওয়া বন্দুকে বের করে তাড়িয়ে দিল। আমার পাগলামী দিন দিন বড়েই চলল। আমাকেও ঘরে আটকে রাখা হল। এক সময় আফিয়ারা আমাদের বাড়ী ছেড়ে চলে গেল। আমাকেও ছেড়ে দেয়া হল। আমি বের হয়েই আফিয়াকে খুঁজতে বের হলাম। এক সময় পেয়েও গেলাম। ফুফু কাজী ডেকে আমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। বিয়ে পড়তে এসে কাজী পড়ল বিপাকে সে বিয়ে পড়াবে না। আফিয়া দেখতে হুবহু মেয়েদের মতো হলেও ওর পরিবর্তনের খবর চাউর হয়েছে সবখানেই। গ্রামাঞ্চলে এসব খবর যে কত দ্রুত ছড়ায় ভাবতেও পারবেন না। কাজী বিয়ে পড়াবে না কারণ আফিয়া হিজড়া। শেষে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে বিয়ে পড়ানো হলো আসরের দিকে। সন্ধার সময় বাবা পুলিশ নিয়ে এসে আমাকে ধরে নিলেন। আফিয়াকে হাজতে ঢোকানো হল। আগুন দেয়া হল ফুফুর বাড়িতে। বাবা ফুফুকে বেশ মেরেছ। মেরে ফুফুর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। আমাকে আবার ঘরে আটকানো হল। আমি সারাদিন আফিয়া আফিয়া বলে চিৎকার করছি আর কাঁদছি। কিন্তু তাতে কার কি আসে যায়। আমার শোকেই হয়তো মা মারা গেলেন। যেদিন মায়ের দাফন হলো সেদিন আবার আমাকে ছাড়া হল। আমি আবার ছুটে গেলাম আফিয়াদের বাড়িতে। গিয়ে শুনি আফিয়ারা সেখানে থাকে না। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না। আমার ছোট ভাই শিমুল এসে একদিন খবর দিল ঈশ্বরদী বাজারে সে নাকি আফিয়াকে দেখেছে হিজড়াদের দলের সাথে। আমি ছুটে গেলাম ঈশ্বরদী বাজারে। আমি অলি গলি আফিয়াকে খুঁজে বেড়াতে লাগলাম। কোথাও পেলাম না। এক সময় ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশে শুয়ে পরলাম। গভীর রাতে একটা হাতের স্পর্শে আমার ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি আফিয়া। আমি ওর হাতটা ধরতেই সে প্রচন্ড গতিতে দৌড়ে পালাল। আফিয়া অনেক মোটা হয়েছে। লম্বাও হয়েছে। আমি ওর পিছু পিছু দৌড়াতে শুরু করলাম কিন্তু ক্লান্ত ক্ষুধার্থ আমি ওর সাথে দৌড়ে পেরে উঠলাম না। সারা রাত বাজারে এ মাথা থেকে ও মাথা ওকে খুঁজে ফিরলাম। আমাকে ধরে এনে আবার আটকে রাখল বাবা। একদিন ভোর বেলা আমার ছোট ভাই এসে খবর দিল আফিয়া মারা গিয়েছে। কে বা কারা আফিয়াকে খুন করে বাজারে ফেলে রেখেছে। আমি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলাম। আমাকে ভর্তি করা হল পাবনা মেন্টাল হসপিটালে। ৮ বছর পর আমি সুস্থ্য হলাম। সুস্থ্য হয়েই মায়ের গয়না নিয়ে পালিয়ে এলাম ঢাকায়। অনেক কষ্ট করেছি। শেষে এই চাকরি জুটিয়েছি। ভাল বেতন পাই। তবে, বেতনের দুই তৃতীয়াংশ আমি হিজড়াদের দিয়ে দেই। শুনেছি বাবা মারা গিয়েছে। আমি দেখতে যাই নি। একটা খুনিকে দেখার কিছুই নেই। আমি শিওর আফিয়াকে আমার বাবাই খুন করেছে।”
গল্পের এই পর্যায়ে বুলবুল কান্না শুরু করল।
চারদিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমি উঠে গিয়ে বুলবুলের পিঠে হাত রাখলাম।
-চলুন বুলবুল সাহেব। আমরা একটু হেঁটে আসি। সকাল হয়ে গিয়েছে। কাঁদবেনা প্লীজ। বুলবুলের জন্ম ভালবাসার জন্য গান শোনার জন্য কাঁদার জন্য নয়। আমি আর বুলবুল ঢাকার রাস্তায় হাঁটছি বিজয় স্বরণী দিয়ে। হঠাৎ আমার বুলবুলের জন্য বেশ মায়া হল। প্রচন্ড মায়া। এটা কি মায়া, না ভালবাসা না কি করুনা বুঝতে পারলাম না।
বুলবুল কি কোন দিন জানতে পারবে তার বস একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ?
না আমি তাকে বলতে পারব?
সবাই তো আর সব কিছু মুখ ফুটে বলতে পারে।
কিছু বিষয় মানুষ নাই জানলো, তাতে জগতের কার কি ক্ষতি?


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ