,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

সুতো ।। আবু সায়েম দোসর

লাইক এবং শেয়ার করুন

উইনশিল্ডে আলতো করে আঘাত করছে বৃষ্টির ফোঁটা। তারপরই গড়িয়ে যাচ্ছে নিচে। কোনটা গড়িয়ে পড়বার আগেই যান্ত্রিক ওয়াইপার দৃষ্টি পরিষ্কার করে সব মুছে দিচ্ছে। তবে সাইডগ্লাসগুলোতে ফোঁটাগুলো রয়ে যাচ্ছে, আশেপাশের লাল নীল আলোতে ফোঁটাগুলো তাকিয়ে থাকবার মতন দৃশ্য সৃষ্টি করছে।
বৃষ্টি হচ্ছিল এতক্ষণ,এখন কমে এসেছে। হাইওয়েতে গাড়ির গতি একই আছে। রাস্তাটায় আলোছায়ার খেলা চলছে। দ্রুতগামী গাড়ির টেইললাইট, ল্যাম্পপোস্ট আর আশেপাশের নিয়নসাইনগুলো ভিজে চুপচুপে। অ্যাসফল্টের রাস্তাটাও ভেজা। গাড়ির ভেতরে আলো জ্বলছেনা। তবে ড্যাশবোর্ড আর রাস্তার আলো এসে পড়ছে ওর মুখে। এতগুলো সুন্দর দৃশ্যের মধ্যে পাশের সিটে বসে অরিন্দম কোনটার দিকে তাকিয়ে থাকবে ভেবে পায়না।
গাড়ি চালাবার সময় সেঁজুতি একদম বোর্ডে তাকিয়ে থাকা ক্লাসরূমের ফার্স্ট গার্ল-মনোযোগী ছাত্রীটির মতন চোখ রাখে রাস্তায়। সাবধানী দৃষ্টি। এক হাত স্টিয়ারিং এ, আরেক হাত ভাঁজ করে কোলের উপর রাখা। এসময় নিজে থেকে বেশি একটা কথা বলেনা সে,তবে এমনিতে মৃদু হেসে টুকটাক কথা চালিয়ে যায়। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরেই দুজনে চুপ। স্পিকারে একটা গান বাজছে। গানটা মনোযোগ দিয়ে শুনছে দুজনেই।
“তার চেয়ে চল এই বেলা মেঘ খুঁজে,
দুজন মিলে ঝাপ দিই চোখ বুজে”।
সেঁজুতি গাড়ির গতি কমিয়ে হাইওয়ে থেকে নেমে সাইড রোডে চলে এলো।
‘কফি?’
‘এটারই দরকার এখন…’
‘আরেকটু সামনে পার্ক করি তাহলে’
ইন্ডিকেটর দিয়ে রাস্তার পাশে একটা ক্যাফের ড্রাইভওয়েতে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল সেঁজুতি। বড় করে নিয়ন আলোতে ক্যাফেটার নাম লেখা। অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। ড্রাইভওয়েটা বেশ বড়। কয়েকটি গাড়ি রাখা আছে। বাইরে একটা মৃদু ফ্লাডলাইট জ্বলছে, আলোটা হেমন্তের পূর্ণিমার আলোর চেয়ে একটু বেশী তীব্র। কিছুটা অপার্থিব। বের হয়ে আড়ষ্ট হাত পা ঝাড়ল দুজনেই। অনেকক্ষণ ড্রাইভ করতে হয়েছে। শহর থেকে কিছুটা দূরেই এলাকাটা। চারদিকে অন্ধকার এবং ফাঁকা। কয়েকশ উইন্ডমিল ঘুরছে আস্তে আস্তে। দেখতে দানবীয় লাগছে সেগুলোকে। প্রত্যেকটা পাখায় লাল আলো উঠছে, নামছে, ঘুরছে। বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা। দূরে একটা ফার্মহাউসের আলো দেখা যাচ্ছে। ঠান্ডা বাতাসটা মন ভালো করা। গাড়ি লক করে তারা ক্যাফেতে ঢুকল। দু-একজন মানুষ খাচ্ছে, কথা বলছে মৃদুস্বরে। কাউন্টারে অর্ডার দিতে গেলো তারা। মোটাসোটা মহিলা হেসে অভিবাদন করল, জিগ্যেস করল,
‘গুড ইভনিং, হেলো, হোয়াট ডু ইউ লাইক টু হ্যাভ?’
‘টু কফি প্লিজ’
পাশ থেকে সেঁজুতি বলে উঠল, ‘ভুলে গেছো তুমি?’
কাউন্টারে ফিরে হেসে অরিন্দম বলল, ‘মাই ব্যাড, ওয়ান প্লিজ। উইথ ব্রাউনি টু পিসেস’
আবার সেঁজুতির দিকে ফিরে বলল, ‘কতদিন পর’
‘বেশিদিন মনে হয়না’, হেসে বলল সেঁজুতি
‘দুনিয়াটা গোল, বুঝেছো? কিভাবে কিভাবে আবার দেখা হয়েই গেল’
‘এত বোঝাবুঝির দরকার নাই’
কোণার একটা ফাঁকা টেবিলে গিয়ে বসলো তারা, মুখোমুখি। মৃদু ব্লুজ মিউজিক বাজছে। অরিন্দম শার্টের হাতা গুটিয়ে নিলো অল্প। সেঁজুতি বাঁধা চুল খুলে দিলো। অনেকদিনপর মুখোমুখি হলো তারা অবশেষে।
‘তারপর? কেমন আছো? কেমন চলছে সংসার? ইত্যাদি?’ কৌতুহলী দৃষ্টিতে শুরু করল অরিন্দম।
‘কবিতা রাখো। আগে বলো হঠাৎ…?’
‘ঘুরতে। কাজকর্ম নেই। বেকার আমি।’
‘বউকে রেখে এসছো কেন?’
‘ও আছে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে। দুই পিস,এই দেখো’
এই বলে অরিন্দম মোবাইল ফোনে একটা ছবি এগিয়ে দিলো। সেঁজুতি মাথা ঝুঁকিয়ে দেখলো খানিকক্ষণ। তারপর ফিরিয়ে দিলো। হেসে বলল,
‘বাহ সুন্দর,একা এসে ভালো করোনি’
‘যাক মিথ্যার স্কিলটা আগের মতই আছে’
‘আবার! কাজটা ঠিক হলোনা’, চিরায়তভাবে অগ্নিদৃষ্টিতে ভস্ম করবার প্রচেষ্টা সেঁজুতির চোখে।’
কফি চলে আসে। টুকটাক কথা বলতে বলতে কফি খায় তারা দুজন। ঠিক আগের মত করে। সেঁজুতি চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখেছিল। অরিন্দম তাই নিয়ে খেলা করছিল। এক মুহূর্তে এসে তার নিজের রোদচশমাটা বের করে পাশাপাশি রাখে। দুটো চশমা। একটা সেঁজুতির,নকশা আঁকা ফ্রেম! আরেকটা অরিন্দমের এভিয়েটর্স গ্লাস। টুক করে পাশাপাশি রেখে একটা ছবি তুলে নেয় দুটোর।
কফি শেষ করে তারা বাইরে আসে। বাইরে বাতাসটা বেড়েছে। তবে বৃষ্টি আর হবে বলে মনে হচ্ছেনা। দূরে অল্প বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ভেজা বাতাস। অরিন্দম পকেট থেকে প্যাকেট বের করে সিগারেট মুখে নেয়। সাথে সাথে সেঁজুতি হাত দিয়ে সেটি ঠোঁট থেকে সরিয়ে ফেলে।
‘কি কথা ছিল?’
‘ভুলে গেছি, আমার মনে থাকেনা কিছু’, নির্বিকার ভঙ্গিতে অরিন্দম উত্তর দেয়।
সেঁজুতি আবার সিগারেটটা অরিন্দমের ঠোঁটে গুঁজে দেয়। কোন উত্তর দেয়না। ক্যাফের পাশে, ড্রাইভওয়ের শেষ মাথা থেকেই ফাঁকা জায়গা শুরু। হয়ত কোন ফার্ম ফিল্ড, ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। নিচু দেয়াল দেয়া ড্রাইভওয়ের শেষ যেখানে, তারা সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়। সেঁজুতি এখনও চুপ। সে দেয়ালে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে দৃষ্টি রাখে। অরিন্দমও সেদিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে।
‘তোমার নাম্বারটা হারিয়ে ফেলেছিলাম’
‘পরে?’
‘ম্যানেজ করেছি আবার। আসলে সবার থেকেই দূরে ছিলাম তো। যোগাযোগ রাখা হয়নি।‘
‘আগে জানাও নি কেন আসছো?’
‘আগে জানালে হয়ত না করতে! এয়ারপোর্টে নেমেই তাই হুট করে বলেছি বলে না করতে পারোনি’
‘It’s definitely a great surprise…’ বলে সেঁজুতি অরিন্দমের দিকে তাকায়
‘হা হা…’
‘ওখানে সবাই কেমন?’
‘আছে যার যার মতন, বাবা-মা তো অনেক দিন হল চলে গেছেন’
হঠাতই একটু বিষন্নতা নেমে আসে। অরিন্দমই ভাঙে তা। ‘কাল অফিস আছে না?’
‘আছে। সমস্যা হবেনা, ভেবোনা তুমি’
‘আচ্ছা, হোটেল কান্ট্রি ইনটা কতদুর? ট্যাক্সি নিয়ে যেতে পারব?’
‘অরিন্দম’ মাথা উঠিয়ে প্রশ্ন করে সেঁজুতি।
‘হুম?’
‘হোটেলে কেন? আমার ওখানে থাকবে তুমি’
‘নাহ, বুকিং দেওয়া…’
‘ক্যান্সেল করে দাও’
‘না সেঁজুতি, আমার কাজ আছে’
‘তা আমার ওখানে থেকেও করা যাবে, কোন কথা না’
সিগারেট শেষ হয়ে যায়। সাথে কথাও। ভেজা বাতাস সেঁজুতির খোলা চুল উড়িয়ে নিচ্ছে বারবার। হাত দিয়ে সেগুলো গুঁজে দিচ্ছে বারবার। আজ উইকেন্ড শেষ বলেই লোকজন কম। রাস্তায় গাড়িও কম। তারা গাড়ির দিকে এগোয়। সেঁজুতি ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে। ওপাশে অরিন্দম দরজা খুলে ভেতরে উঠে দরজা লাগিয়ে দেয়। ভেতরে আলো জ্বলে আবার নিভে যায় দরজা আটকে দেয়ায়। অন্ধকার নেমে আসে। কিছু মুহূর্ত কোন কথা হয় না। দুজনেই সামনে তাকিয়ে থাকে। একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেঁজুতি ইগনিশনে চাপ দেয়। মৃদু শব্দ করে কেঁপে ওঠে লাল গাড়িটা। রিভার্স গিয়ারে দিয়ে পিছিয়ে এসে ঘুরিয়ে হাইওয়ে তে উঠে পড়ে তারা। ছুটে চলে সামনের আলোকসারির দিকে। চারপাশে অন্ধকার আর দানবের মত ঘুরতে থাকা লাল আলোর উইন্ডমিলগুলো পেছনে সরে যায়।
‘এতক্ষণ ধরে এলাম,তোমার কথাই কিছু জিগ্যেস করা হল না’
‘কি জানতে চাও বলো’
‘কি যেন নাম তাঁর? শুনেছিলাম ভুলে গেছি। মানে তোমার হাজবেন্ড…’
‘ছিল, নেই এখন।’
‘নেই মানে?’
‘ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে’
‘মাই গড, কেন? মানে সরি… আসলে…’
‘আরে ঠিক আছে ঠিক আছে,ফর্মালিটি না করলেও চলবে,আসলে তাড়াহুড়োর কিছুই ভালো হয়না’, এক হাতে স্টিয়ারিং আর অন্য হাতে চশমা ঠিক করতে করতে উত্তর দেয় সেঁজুতি।
গাড়ির ভেতর এসি ছাড়া। বাইরেও তেমন গরম না,বেশ ঠান্ডা। তবু অরিন্দম টের পায় ঘামছে সে হুট করেই। শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। তার তো ক্লস্ট্রোফোবিয়া নেই। তবুও কেন?
‘সেঁজুতি গ্লাসটা নামিয়ে দেই একটু? বৃষ্টি তো নেই এখন’
‘আচ্ছা,বাতাসটা ভালোই লাগবে’,বলে সেঁজুতি নিজেই এসি বন্ধ করে দিয়ে গ্লাস নামিয়ে দেয়।
ঘন্টায় একশ কিমি. এরও বেশি বেগে হাইওয়েতে ছুটে চলেছে গাড়ি। অরিন্দম শ্বাস নেয় বুক ভরে,চোখ বন্ধ করে। সেঁজুতির চুল উড়তে থাকে।
অল্প সময়ের মধ্যেই শহর এলাকায় প্রবেশ করে তারা। রোডসাইন বলে দেয় শহরটার নাম ‘মেসন সিটি’। সবুজ রঙের উপর সাদা কালিতে দিকনির্দেশনা দেওয়া উপরে। গাড়ির গতি কমে আসে। ছিমছাম শহর রাতের বেলাতে একেবারেই নিরব। দোকানপাট খোলা তবে মানুষ কম। গাড়ি রেসিডেন্সিয়াল এলাকাতে চলে আসে। গাড়ির গতি এখানে সর্বোচ্চ পঁচিশ মাইল। বাসাবাড়ি গুলো ছোট ছোট। চার পাঁচ তলা হবে। গাছগাছালিতে ভরা। ভেজা রাস্তা আর ভেজা আলোতে পরিপাটি গোছানো সুন্দর লাগছে সব। একটা চারতলা বাড়ির সামনে এসে গতি কমে গেল গাড়ির। বিশাল ড্রাইভওয়েতে ঢুকে একপাশে পার্ক করল সেঁজুতি। বের হতে হতে জিগ্যেস করল অরিন্দম,
‘তোমার বাসায় কে কে আছে?’
‘আপাতত কেউ নেই। কেন তোমার কোন কমপ্লেক্স আছে নাকি?’ ভ্রূ নাচিয়ে ঠাট্টার স্বরে জিগ্যেস করল সেঁজুতি।
‘হাহা, না। নেই।’
বাসাটাও শহরটার মতই ছিমছাম। সামনে বাইরের দিকে বারান্দা দেওয়া প্রতিটি তলায়
। সারা বাড়িতে আলো জ্বলছে একটা ঘরে শুধু। আর সিঁড়িতে। তবে দেখতে ভুতুড়ে লাগছেনা, বরং একটা ‘আনন্দ আনন্দ’ ভাব আছে। অরিন্দম ঘড়িতে সময় দেখল এগারোটা আটত্রিশ। এখনই শহর ঘুমিয়ে গেল? অবাক হল অরিন্দম। গাড়ি থেকে বের হয়ে অরিন্দম ট্রাংক থেকে তার ছোট লাগেজটা নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোয়। পেছনে সেঁজুতি।
‘চার তলায় উঠতে হবে কিন্তু, লিফটের অভ্যেস আছে নাকি?’
‘হাহাহা, নাহ, সিঁড়িই ভালো। লিফটের মতন এত ছোট জায়গায় এত অল্প সময় থেকে কি লাভ?’, এবার বিদ্রুপের হাসি ছুঁড়ে দেয় অরিন্দম। সেঁজুতিও হাসে। কিছু বলেনা।
সিঁড়িটাও সাজানো। চারটা ফ্লোরেই চারটা আলাদা পরিবারের বসবাস। তবে সিঁড়িগুলো ঘরের বাইরের অংশ বলে মনে হয়না। কার্পেট দেওয়া এবং দেয়ালে পেইন্টিং। চার তলায় গিয়ে দাঁড়ায় অরিন্দম। সরে জায়গায় করে দেয় সেঁজুতির জন্য। সেঁজুতি চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে আলো জ্বেলে দেয়। পেছনে অরিন্দম।
ভেতরে সেঁজুতি সেঁজুতি গন্ধ। বাইরের ঘর পুরোটা ভর্তি বিভিন্ন মিউজিকাল ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা, তবে অগোছালো না। সেঁজুতির মতই গোছানো। একপাশের দেয়ালে সেঁজুতির একটা ছবির পেইন্টিং। অনেক আগের, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের। কাঁধের উপর দিয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে হাসছে সে। অরিন্দমকে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিগ্যেস করল,
‘ছবিটার কথা মনে আছে তোমার? তুমি তুলে দিয়েছিলে। তারপর ওটা থেকেই পেইন্টিং করিয়েছি। আসল কপি এখনও আছে আমার কাছে।’
চট করে মনে পড়ে যায়। এতগুলো বছর আগের সব স্মৃতি চোখে ভাসে। সাডেন ফ্ল্যাশব্যাক! অরিন্দম উত্তর দেয়না। তাই সেঁজুতি আবার বলে,
‘কত বছর হলো বলোতো?’
‘কি যেন! দশ বারো বছর হবে হয়ত।’
এক মুহূর্ত ভেবে উত্তর দেয় সেঁজুতি, ‘ষোল বছর চার মাস… বারো দিন। মনীষার জন্মদিনে তোলা’
অবাক হয়ে সেঁজুতির দিকে তাকায় অরিন্দম। মুখে বলে, ‘এখনও আগের মতই আছো। বরাবরই দিন তারিখ তোমার মনে থাকে সব।’
প্রসঙ্গ পালটে সেঁজুতি বলে, ‘তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। তেরো হাজার কিলোমিটার উড়ে এসেছো তুমি। ওয়াশরূম এদিকে। ফিল ফ্রি…’
অরিন্দমের একটু অস্বস্তি হয়। সেটা জেটল্যাগের জন্য নাকি সেঁজুতির সাথে এতদিন পর দেখা এবং তার বাসায় আসার জন্য তা বুঝতে পারেনা সে।
সেঁজুতি অরিন্দমকে তাঁর থাকার জায়গা দেখিয়ে দিয়ে নিজে ভেতরে চলে যায়। অরিন্দম সকল ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতেই গোসল করে নেয়। ঠান্ডা পানির ধারার নিচে দাঁড়িয়ে তার মাথায় ভীড় করে রাজ্যের চিন্তা, স্মৃতি। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসে সে। একটা সাদা ফতুয়া গায়ে দেয়। আবহাওয়া গরমও না, ঠান্ডাও না। তবে আরামদায়ক। বাইরে বৃষ্টি হয়েছে তাই। অরিন্দম বাইরের রূমে আসে। এসে দেখে সেঁজুতিও বাইরের কাপড় পাল্টে খাবার তৈরি করছে। অরিন্দমকে দেখে হেসে বলে,
‘হে হ্যান্ডসাম, ইউ আর লুকিং ফ্রেশ’
‘থ্যাংকস। তোমাকেও।‘
‘কি খাবে এখন বলো’
‘আরে কষ্ট করার দরকার নেই। মেহমানের মতন ট্রিট করোনা প্লিজ। একটা কিছু হলেই হলো! তোমাকে সকালে অফিস করতে হবে। এখন শুধু শুধু কিছু করার দরকার নেই সেঁজুতি।’
‘আরে বাবা, ঠিক আছে। তুমি বোসো ওখানে। আমার সময় লাগবেনা।’
‘মে আই হেল্প ইউ?’
সেঁজুতি বিদ্রুপের চাহনি দেয় আবার অরিন্দমের দিকে। মুখে বলে, ‘নাহ, আপাতত লাগছেনা। তুমি বসো’
অরিন্দম কাউচে গিয়ে বসে। ড্রইং রুমটার দিকে আবার ভালো করে তাকায়। একপাশে বইয়ের র‍্যাক। সেখানে সব প্রিয় বই উঁকি দিচ্ছে। দেয়ালে আরও কিছু ছবি এবং পেইন্টিং দেখা যাচ্ছে। একটা ছবিতে চোখ আটকে যায় অরিন্দমের। বুকটা কেঁপে ওঠে কিছুটা। একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে সেঁজুতি। কোন একটা বিচে তোলা। পেছনে গাঢ় নীল আকাশ আর সমুদ্র। দুজনই হাসি হাসি মুখ করে একে অপরকে জড়িয়ে আছে। সেঁজুতির ডাকে বাস্তবে ফেরে অরিন্দম। সে তাকে ডাইনিং টেবিলে ডাকছে। উঠে টেবিলে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে অরিন্দম। মুখোমুখি অন্য পাশে বসে সেঁজুতি। অল্প সময়েই বেশ অনেক পদ রান্না করে ফেলেছে সে। এতবছর পর, তের হাজার কিলোমিটার দূরে এসে সেঁজুতির বাসায় বসে তার হাতে রান্না করা মাছের ঝোল, তিন প্রকারের ভর্তা আর মাংস দিয়ে রাত একটায় বসে ভাত খাবে এটা ভাবতেও পারেনি কখনও। সে নিজ হাতে বেড়ে দিলো অরিন্দমকে। তারপর নিজের পাতেও নিলো। খাওয়ার সময় কথা বলল না তারা কেউ। তবে দু একবার দৃষ্টি বিনিময় হল তাদের মধ্যে। অবশ্য হুট করেই হঠাৎ নিরবতা ভেঙে অরিন্দম প্রশ্ন করে,
‘সেঁজুতি’
‘তুমিই তো?’
‘আমিই। বিশ্বাস হচ্ছেনা?’
‘কষ্ট হচ্ছে।’
‘What a pleasant surprise!’
আবার নিরবতা। বাকিটা সময় নিরবেই খাওয়া শেষ করে তারা। খাওয়া শেষে কাউচে গিয়ে বসে আবার অরিন্দম। সেঁজুতিও আসে। অরিন্দম ইশারায় ওই ছবিটার দিকে দেখায়। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেয়,
‘আমার মেয়ে। মেঘ। সাধারণত আমার কাছেই থাকে। ভ্যাকেশন চলছে। কিছুদিনের জন্য ওর বাবার ওখানে গেছে।’
‘কি সুন্দর। পবিত্র । মা মেয়ে দুজনকেই সুন্দর লাগছে খুব।’
সেঁজুতি কিছু না বলে মাথা নিচু করে রাখে। অরিন্দম লক্ষ্য করে সেঁজুতির চুলগুলো এখনও ভীষণ লম্বা। বরাবরই তার লম্বা চুল প্রিয় ছিল। সে আবার ছবির দিকে তাকায়। কত সুন্দর করে হাসছে মেঘ।
‘ঘুমিয়ে পড়ো। অনেক ক্লান্ত তুমি।’
‘আহ। আই এম মেকিং ইউ স্টে আপ লেট। যাও ঘুমিয়ে পড়ো। আমিও যাই।’
অরিন্দম নিজের ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। সেঁজুতিও তার ঘরে ফিরে যায়। তাদের দুজনের মনের ভেতরেই কেমন ঝড়! তবু কেউ তেমন কিছু বলছেনা। অরিন্দম চোখ বুজতেই ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্তিতে।
অরিন্দম মেলায়। ভীষণ ভীড়। তার ছোট মেয়েটি তার হাত ধরে আছে। চারদিকে অনেক শব্দ। অরিন্দম ভীড় ঠেলে সরে যেতে চাইছে, পারছেনা। মেয়েটি তার দিকে তাকালো। মেঘ। ভীড়ের মধ্যে সে বাবার হাত ছেড়ে দিলো। অরিন্দম শত চেষ্টা করেও মেয়ের হাত ধরতে পারছেনা। মেয়ে ভীড়ে হারিয়ে গেলো। অস্পষ্ট ভাবে কানে ভেসে এলো একটা ডাক, ‘বাবা’।
চোখ খুলেই উঠে বসল অরিন্দম। স্বপ্নটা একদম বাস্তব। একদম। ঘেমে গেছে সে, বুক কাঁপছে ভীষণ। কখন ঘুমিয়েছে সে জানেনা। অন্ধকার সয়ে আসতে একটু সময় লাগল। এর মধ্যেই পাশের টেবিলে পানি দিয়ে গেছে সেঁজুতি। সে এক গ্লাস পানি এক চুমুকে শেষ করল। ঘড়িতে দেখল তিনটা সাতাশ। বেশিক্ষণ ঘুমোয়নি সে। আবার শুয়ে চোখ বন্ধ করলো অরিন্দম। বুক কাঁপছে এখনও। ঘোরলাগা ভাব। ডাকটা কি স্পষ্ট। স্পর্শটাও। ভেতরটা খালি হয়ে গেল হঠাত করেই। শত চেষ্টা করেও শুয়ে থাকতে পারল না। বোঝা গেল হয়ত ঘুম আসবেনা। ছোট স্বপ্ন! অথচ কি ভীষণ বাস্তব।
অরিন্দম উঠে পড়ল। তার রূম থেকে বাইরে চলে আসলো। দেখল সেঁজুতির দরজা ভেজানো, ভেতরে আলো জ্বলছে। অরিন্দম বুঝতে পারেনা ডাকবে কিনা। সংকোচ হয়। দরজায় টোকা দেবে? ঘুমিয়েছে বোধয়। উঠে পড়ে যদি? কি ভাববে সেঁজুতি? তাছাড়া এটা তার শোবার ঘর। ব্যাপারটা কি ঠিক হচ্ছে? সংকোচ হলেও দরজা কিছুটা খুলে ভেতরে উঁকি দেয় অরিন্দম। ভেতরে মৃদু আলো জ্বলছে। আর ডেস্কে টেবিল ল্যাম্প। ডেস্কের উপর হাতের পর মাথা রেখে চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে সেঁজুতি। দেখে কষ্ট হলো অরিন্দমের। তার জন্য সেঁজুতি নিজের কাজ ফেলে দিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছে, এতক্ষণ সময় দিয়েছে, রান্না করেছে, গল্প করেছে, রাত জেগেছে। ভোরেই আবার উঠতে হবে। হয়ত কাল অফিসের কোন কাজ বাকি ছিল, সেগুলো করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েছে টেবিলে।
আস্তে আস্তে কাছে যায় অরিন্দম। কি মায়াবী মুখ এখনও সেঁজুতির। সে এখন মধ্যবয়সী এক নারী, তবে চেহারা এখনও তরুণী সেঁজুতির মতই কোমল। মেঘের চেহারাও মায়ের মতই হয়েছে একেবারে। টেবিল ল্যাম্পের আলোতে চুলের ছায়া পড়ছে একদিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে অরিন্দম। অনেকদিন এত কাছ থেকে এত গভীর ভাবে তাকিয়ে দেখেনি তাকে। সেঁজুতি চশমা পড়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। অরিন্দম আস্তে করে চশমাটা খুলে পাশে রেখে দেয়। সেঁজুতির গালে আলতো করে স্পর্শ লাগে সে সময়। সেঁজুতি টের পায় না। টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছে দেখে কিছুটা কষ্ট হয় অরিন্দমের। বাচ্চা মেয়ের মতন কোলে করে নিয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার মতন দুঃসাহসিক চিন্তাও মাথায় আসে ক্ষণিকের জন্য। আবার নিজে থেকেই হেসে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে অরিন্দম।
সেঁজুতিকে দেখে অনেক ক্লান্ত মনে হচ্ছে। সারাদিনের পরিশ্রমের ক্লান্তি তো আছেই। সে কি নিজেকে নিয়েও ক্লান্ত? একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যায় অরিন্দমের। একবার তার আসতে দেরি হয়েছিল। সেঁজুতি আগে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন ভীষণ রোদ। রিকশা থেকে নেমে অরিন্দম রাস্তার অপর পাশে তাকায়। সেঁজুতি দাঁড়িয়ে ছিলো সেখানে একটা গাছের ছায়ায়। ঘামছে সে, আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছলো একবার। তাকে দেখে হাসলো। তখন তার চোখে কেমন যেন একটা ক্লান্তি ছিল। তবে হাসিটা ভরসার। অনেকদিন আগের কোন এক দুপুরের দৃশ্যটা আজ আবার মনে পড়ল।
এক দৃষ্টিতে ঘুমন্ত সেঁজুতির দিকে চেয়ে থাকে সে। অথচ জানতেও পারে না, যে সে ঘুমিয়ে পড়ার পর একই ভাবে ঘুমন্ত তার দিকে মুগ্ধ হয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল সেঁজুতি।

  • জুন, ২০১৭
    কাহিনী কাল্পনিক এবং ছবি সংগৃহীত

লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ