,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

এক খণ্ড রোদ ।। রোমেনা আফরোজ

লাইক এবং শেয়ার করুন

আজ পহেলা বৈশাখ। এমন আনন্দঘন উৎসবের দিনেও মনটা কেন জানি বিষণ্ণ হয়ে আছে! অনেক সময় এমন হয়। বাইরের চোখ দিয়ে তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করলেও বিষণ্ণতার যথাযথ কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো সুক্ষ্ম কোন কারণ যেটা চোখে পড়ার মতো নয়। তবে স্নায়ু ঠিকই সেই সুক্ষ্ম কারণকে ব্যবচ্ছেদ করে বিষণ্ণতাকে আঁকড়ে ধরে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়। বিদ্যুৎ চমকায়। বৃষ্টিও পড়ে। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ততা আসে না। একটা অদৃশ্য অস্বাভাবিকতা পর্যুদস্ত করে তুলে ভেতরবাড়ি।
রূপা ভেবে দেখে, কাল সারাদিন এমন কিছুই ঘটেনি যার জন্য বিষণ্ণতা তাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরবে। তবে কি মম’র কালকের ঘটনাটি তাকে ক্ষত-বিক্ষত করছে? কিন্তু মম’র সব কথাকেই তো সে স্বাভাবিকভাবে নেয়।কালও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রথমে একটু খারাপ হয়েছিলো। পরে ভুলেও গিয়েছে।
মম ভীষণ মিশুক চঞ্চল একটি মেয়ে। অনেকটা হরিণের মতো দিকভ্রান্ত্র যেন। রূপাকে ভীষণ ভালোবাসে, শ্রদ্ধাও করে। কাজল এ নিয়ে বহুবার অভিযোগ তুলেছে মেয়েটা তার নয়। রূপার।
মম রূপার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী কাজলের একমাত্র মেয়ে। কলেজে পড়ে। ছোটবেলা থেকেই দেখেছে ওর মধ্যে সবসময় একটা সাজ সাজ রব। আচরণটা যে অযৌক্তিক তা নয়। তবে এই আচরণের সঙ্গে জানার আগ্রহ যদি কিছুটা হলেও যুক্ত হতো তবে চমৎকার মেলবন্ধন তৈরি হতো। কিন্তু ওরা সবসময় কেমন যেন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সবার মধ্যে থেকেও বিচ্ছিন্ন। এক একটা দ্বীপ যেন। মোবাইলের অদৃশ্য তার দিয়ে একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে। যেটা খুব দৃঢ় নয় আবার ভঙ্গুরও নয়।
কাল রাতে কাজলের বাসায় ছোট একটা পুনর্মিলনীর আয়োজন করা হয়েছিলো। সেই উপলক্ষে সন্ধ্যার পর পর ওদের বাসায় যায় রূপা। তখন মম বাইরে কোথাও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সে জানতে চাইলো, কোথাও যাবি মম?
– হুম। একটু শপিং এ যাবো।
– কিসের শপিং?
– বারে কাল পহেলা বৈশাখ না! তার জন্য কিছু শপিং বাকি আছে। আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে কথাগুলো বলছিলো মম। ওকে মিষ্টি লাগছে। কিন্তু রূপার এই কৃত্রিমতা ভালো লাগে না। মেক–আপের ভেতরের মম যেন আরও বেশি সুন্দর সজীব কমনীয়।
– মম। তুই কি পহেলা বৈশাখের ইতিহাস জানিস? এর প্রচলন কবে হলো? তখন কেমন করে একে উদযাপন করা হতো? এইসব আর কী..
মম খুব অবাক হয়ে বলে, খালামণি আমি তো তোমাকে মায়ের থেকে ভিন্নরকম ভেবেছিলাম। এখন দেখছি তোমরা একইরকম। আচ্ছা, বলতো এতোসব ইতিহাস পাতিহাঁস জেনে কী হবে? আমি কী তোমার বা মায়ের মতো টিচিং করবো? ওহ নো! হাউ বোরিং ইউ অল…
কথাগুলো শুনে রূপার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছিল। এতো বিতৃষ্ণা অবজ্ঞা নিয়ে বড় হচ্ছে মেয়েটা। এই প্রজন্মের আচরণ যেন কেমন। নিজের ঐতিহ্য নিয়ে মনে হয় ওরা কৌতূহলী নয়, সেটা তার ভালো লাগে না। যে অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য এতো উদ্দীপনা সেই অনুষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত ইতিহাস সম্পর্কে জানেই না। এরকম উদাসীনতা দেখে রূপা অবাক হয়।
অথচ ১৫৫৬ সালের পূর্বে আমাদের নিজস্ব দিনপঞ্জিকা ছিলো না। তখন হিজরী বা ইংরেজি দিনপঞ্জিকা দিয়ে আমাদের দিন গণনা হতো। পৃথিবীর খুব কম জাতিরই নিজস্ব নববর্ষ থাকে। এমন সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতি ঐতিহ্য থাকে। সেই মুঘল আমল থেকে পুণ্যাহ উৎসব উদযাপিত হতো। এটি মূলত রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত একটি উৎসব। ১৯৫০ সালের দিকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সাথে সাথে এই উৎসবের বিলুপ্তি ঘটে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে পুণ্যাহ উৎসব নববর্ষের রূপ ধারণ করে।
– সাতসকালে এতো মগ্ন হয়ে কী ভাবছো?
আসাদের কথাতে রূপার মগ্নতার বিচ্ছেদ ঘটে। সে উদাস হয়ে প্রশ্ন করে, আচ্ছা এখনকার কিছু কিছু ছেলেমেয়ে এতোটা ইনডিফ্যারেন্ট কেন? ওদের মধ্যে কি কোন প্রশ্ন জাগ্রত হয় না?
– কি হয়েছে বলতো? রূপার পাশে চেয়ার টেনে প্রশ্ন করে আসাদ। কিন্তু রূপার কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। সে নববর্ষের পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি দিয়ে মেঘলা আকাশকে খুঁটিয়ে দেখছিলো।
-কাল কাজলের বাসায় কিসের অনুষ্ঠান ছিলো?
-চৈত্র সংক্রান্তির। তোমাকেও যেতে বলেছিলো।
-আমি তো জানতাম গ্রামে এই উৎসব পালিত হয়। কিন্তু শহরের ব্যাপারটা জানা ছিলো না। অবশ্য আমার পরিচিতদের মধ্যে কেউ এই উৎসব পালন করে বলেও শুনিনি।
-তুমি তো জানো গত সপ্তাহে কাজলের শাশুড়ি গ্রাম থেকে এসেছেন। তার মন রক্ষার্থেই এই উৎসবের আয়োজন। তবে বিশেষ কেউ ছিলো না। সবাই পহেলা বৈশাখ নিয়েই ব্যস্ত। কিছুদিন পরে দেখবে হালখাতার মতো চৈত্র-সংক্রান্তিও স্থান নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। অথচ একসময় কত উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালিত হতো এই উৎসব। রূপা একটি দীর্ঘশ্বাস মুক্ত করে হালকা হতেই খেয়াল করলো আসাদ বৈশাখী উপলক্ষে কেনা নতুন পাঞ্জাবি পরেছে।
-তুমি কী আমার সাথে বের হবে? আমি শঙ্করের ওখানে যাব। ও খুব করে বলেছে তোমাকেও নিয়ে যেতে। যাবে?
-তোমরা তো রমনায় যাবে তাই না? আমার অতোসব ভীড়ভাট্ট্রা পছন্দ নয়। তুমি যাও। আর দেখো মঙ্গল শোভাযাত্রায় কতটা মঙ্গল হয়।
আসাদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রূপাকে পরিমাপ করে বুঝতে চায়, কথাগুলো ক্ষোভের নাকি উপহাসের। কিন্তু উদাসীন ভঙ্গিতে কিছু লেখা নেই আজ।
আসাদ চলে গেলে রূপা উঠে দাঁড়ায়, বারান্দার গ্রিল ধরে। বারান্দার এই অংশ থেকে রাজপথের অনেকটা দেখা যায়। সে দেখে বিভিন্ন বয়সের ছেলে মেয়েরা পহেলা বৈশাখের পোশাক পরে মেলার দিকে যাচ্ছে। ফাহিম দেশে থাকলে হয়তো সেও মেলায় যেতো। নাকি যেতো না? যে ঘরকুনো স্বভাব ছেলেটার! সারাক্ষণ আছে মোবাইল নিয়ে। তারও কি মম’র মতো ইতিহাস নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই? একটা ঘুণে ধরা দ্বিধা দ্বন্দ্ব অবশ করে দেয় রূপার শরীর মনকে। নিজের মধ্যকার ব্যক্তিগত ছায়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে ওরা কি হাঁপিয়ে ওঠে না? তবুও রূপা হতাশ নয়। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করে, আজ থেকেই যেন একটা পরিবর্তন সূচিত হয় মম বা ফাহিমের মনে। তারাও যেন চাকচিক্যময় এই অতিরঞ্জিত জীবনের বাইরে এসে অনুভব করতে শিখে সত্যিকারের ঐতিহ্যকে।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ