,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

‘এতদিন হাত পেতে নিয়েছি, আজ নিজ হাতে দিলাম’

লাইক এবং শেয়ার করুন

রণজিৎ সরকার : রমনা পার্কের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমি। মন খারাপ করে। আমার মন খারাপ হলে গাছের পাতার দিকে তাকিয়ে থাকি। রোদ আর বৃষ্টির সময় পাতাগুলোর অনুভূতি কেমন হয়। পাগল হয়ে তা জানার চেষ্টা করছি অনেক দিন ধরে। পাতাকে প্রশ্ন করেছি, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর পায়নি আজও। উত্তরের অপেক্ষায় আছি। কিছু দূরে যাওয়ার পর দেখি একটা মহিলা। তার সামনে অনেক শিশু। শিশুদের দেখে মনে হলো ওরা পথশিশু। আমার মনে প্রশ্ন জাগল। মহিলাটা এতগুলো শিশু নিয়ে কি করছেন। আমি একটু এগিয়ে গেলাম। দেখি শিশুদের নতুন পোশাক দিচ্ছেন তিনি। শিশুরা আনন্দে পোশাক নিচ্ছে। বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছি না। সামনে তো ঈদ। মহিলাটা ঈদ উপলক্ষ্যে শিশুদের পোশাক দিচ্ছেন মনে হলো। কিন্তু তার পরনে যে ছেঁড়া শাড়ি। নিজে ছেঁড়া শাড়ি পরে অন্যদের নতুন পোশাক দিচ্ছেন। বিশ্বাস করতে পারছি না আমি। চোখ বন্ধ করলাম। একটু পর চোখ মেলে আবার তাকালাম তার দিকে। ভাবছি কি করব, মনে হলো মহিলাটার সাথে কথা বলা দরকার আমার। নিশ্চয় কোন এক রহস্য আছে। ঈদ উপলক্ষ্যে তো এর আগে দেখিছি বিভিন্ন সংগঠন, ফাউন্ডেশন, কোন গ্রুপ বা এনজিওদের পক্ষ থেকে গরিব-দুখী ও পথশিশুদের নতুন পোশাক দেয়। কিন্তু এই মহিলাটা কোথায় থেকে এল। কি জন্য তিনি ঈদ পোশাক দিচ্ছেন। তার পরনে তো ছেঁড়া শাড়ি। আমি চিন্তা করতে পারছি না। হিসাব মেলাতে পারছি না কোনভাবেই। মহিলাটার সাথে কথা বলে পোশাক বিতারণের রহস্য বের করতে হবে। মহিলার প্রতি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ আমার মায়ের কথা মনে হলো। মা ছোটবেলায় আমাকে বলেছিলেন, একদিন ভোরে রুম থেকে বের হয়েছেন, বাড়ির আঙিনায় দেখেন সাদা শাড়ি পরা এক বুড়ি। তিনি বাড়ির আঙিনা ঝাড়ু দিচ্ছেন। মা দেখে তো অবাক। মা ভয়ে পেয়ে দৌড়ে রুমে এলেন। বাবাকে ডেকে আঙিনায় নিয়ে এলেন। এসে দেখেন বুড়ি আর নেই। কিন্তু আঙিনা পরিষ্কার। তখন বাবা মাকে বলেছিলেন, তোমার উপকার করে বুড়ি চলে গেছেন। মা বলেছিলেন, উপকার মানে। উত্তরে বাবা বলেছিলেন, বাড়ির আঙিনা আজ তোমার ঝাড়– দিতে হবে না। বুড়ি ঝাড়– দিয়েছেন।
আমার মনে হলে সে বুড়ি না তো তিনি। নাকি আমরা বাঙালি। আমরা অন্যের দেখে শিখি অন্য কে অনুকরণ করি। সৃষ্টিকর্তা কি আমাদের শেখানোর জন্য মানুষ রূপে নিজে এসে শেখাচ্ছেন। আবারও বলি আমরা তো বাঙালি। হুজুকের বাঙালি। অন্যেকে ঠকিয়ে কত জিনিস কতভাবে নেওয়ার চেষ্টা করি। নিজের সুবিধার জন্য। আরও অনেক কথা মনে হলো আমার। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, যেমন করে হোক মহিলটার সঙ্গে কথা বলতেই হবে। জানতেই হবে তিনি আসলে কে। আবার ভাবলাম হঠাৎ তিনি উধাও হয়ে যাবেন, আমার চোখের সামনে থেকে। আমি সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। দেখি মহিলাটা কি করেন। পোশাক বিতারণ শেষ হলো। সাহস করে আরও একটু এগিয়ে গেলাম। নতুন পোশাক পেয়ে শিশুরা মহাখুশি। ওদের খুশি দেখে আমার খারাপ মন ভালো হয়ে গেল। প্রায় সবাই পোশাক পেয়েছে। নতুন পোশাক নিয়ে যার যার মতো দৌড়ে যাচ্ছে। মহিলাটা ওদের দৌড়ে যাওয়া দেখছেন। আমিও দেখছি। পিঁপড়ার মতো করে ধীরে ধীরে আরও একটু এগিয়ে গেলাম। মহিলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে বললাম, আপনার সাথে কথা বলতে পারি।’
মহিলাটা আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘সব শেষ হইয়া গেছে তো।’
তার কথা শুনে বুঝতে পারলাম, তিনি হয়তো ভেবেছেন আমি তার কাছে নতুন পোশাক দেওয়ার জন্য কথা বলতে এসেছি। আমি বললাম, আপনার কাছে থেকে নতুন পোশাক নিতে আসিনি। এসেছি আপনার সাথে কিছু কথা বলতে।’
‘কি কথা কইবেন।’
রাগ করবেন না তো।
‘না না রাগ করুম না। বইল্যাহ ফেলেন।’
আচ্ছা, আপনার পরনে তো ছেঁড়া শাড়ি। কিন্তু পথশিশুদের নতুন পোশাক দিচ্ছেন। বিষয়টা আমি বুঝতে পারছি না। আপনি এই পোশাকগুলো কোথায় থেকে কিভাবে সংগ্রহ করলেন?
‘আমি ভিক্ষা করি। ভিক্ষা করে ট্যাহা সংগ্রহ করি। সেই ট্যাহা থ্যাকাই কিছু ট্যাহা রাইখা রাইখা জমাইয়েছি। কতজনের থ্যাকাই তো কত কিছু নিই। কাউকে তো কিছুই দিতে পারি না। গত বছর ঈদের পর থ্যাকাই ট্যাহা সংগ্রহ করছি। হেই ট্যাহাগুলো দিয়েই এগুলো কিনেছিলাম। আজ ওদের হাতে নতুন জামা তুলে দিলাম। এত দিন হাত পেতে নিয়েছি, আজ নিজ হাতে দিলাম। কি যে ভালো লাগছে আমার।’
মহিলার কথাশুনে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। বসে পড়লাম। দুই হাঁটুর মাঝে মাথাটা রেখে চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলাম। আমাদের অনেকের অনেক টাকা আছে। কিন্তু ঈদে যারা নতুন পোশাক কিনতে পারে না, তাদের আমরা কজনকে পোশাক কিনে দিই। শুধু নেওয়ার চেষ্টা করি বিভিন্ন কৌশলে। আমার আছে। আমার আরও হোক এই চিন্তাভাবনাই কাজ করে সব সময়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুই বিঘা জমি কবিতার পঙ্তি মনে পড়ে গেল। ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরিরাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি।’ হঠাৎ চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি মহিলটা আমার পাশে নেই। আমি মন খারাপ করে তাকালাম আবার গাছের পাতার দিকে। পার্কের ভেতর খুঁজতে লাগলাম মহিলাটাকে।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ