,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ৪০ টি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছি : হাবিব কমান্ডার

লাইক এবং শেয়ার করুন

সৈয়দ বশির আহম্মেদ, কাউখালী প্রতিনিধি # পিরোজপুরের কাউখালী  উপজেলার কেউন্দিয়া গ্রামের মো. হাবিবুর রহমান  মাধ্যমিক শেষ করার পূর্বেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ১৭ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন।  ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের কালরাতের পরে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু দেশ মাতৃকার প্রতি গভীর টান অনুভব করেন সৈনিক হাবিবুর । দেশের জন্য এই টান তাকে অস্থির করে তোলে। তিনি সেনা সদস্য পদের চাকুরি তুচ্ছ করেই অন্যান্য দেশ প্রেমিকদের মত তিনিও সেনাবাহিনীর চাকুরি ছেড়ে চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। পাকিস্তান সেনা সদস্যের চাকুরি বড় না দেশ ও দেশের মানুষ বড়। সেই চেতনা বুকে নিয়েই বাড়িতে ফেরেন। সময়টা উত্তাল আর প্রাণ পণ লড়াইয়ের। দেশের জন্য যুদ্ধ তাকে উদ্বেলিত করে তোলে । নিজের এলাকায় তিনি বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মুক্তিকামী মানুষ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার দল গড়ে তোলেন। যা পরবর্তিতে প্রায় ১১’শ সদস্যে রূপান্তরিত হয়। এরপর বিশাল এই মুক্তি বাহিনী নিয়ে চলে যান সুন্দরবনে। পরবর্তীতে তিনি তার নিজ জেলা পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে ৪০ টিরও বেশি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। দক্ষিণাঞ্চলে পাকিস্তানী সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকার-আল বদরদের কাছে হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব কমান্ডার হয়ে ওঠেন মুর্তিমান এক আতঙ্কের নাম।

বর্তমানে ৮৫ বছর বয়সে বার্ধ্যকের কারনে ন্যূজ হয়ে পড়লেও এখনো তার মনের জোর অটুট রয়েছে। তিনি ৯ ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে নিজ গ্রাম কেউন্দিয়া গ্রামে বসবাস করছেন। দেশ স্বাধীনের পরে তিনি একাধিকবার জনপ্রতিনিধি (ইউপি সদস্য) নির্বাচিত হয়েছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন কাউখালী  উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডকাউন্সিলের। বর্তমানে তিনি কাউখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পূর্ণবাসন ও সমাজ কল্যাণ (শহীদ ও যুদ্ধাহত পরিবার) সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। তার ছেলেদের মধ্যে এক ছেলে মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় চাকরী পেলেও বাকি ৮জন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরী করছেন। এছাড়া মেয়েদেরকে বিয়ে দিয়ে কোন অতৃপ্তি ছাড়াই বেশ সুখে আছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, সুন্দরবন থেকে ৯নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর (অবঃ) জিয়া উদ্দিনের নির্দেশে সর্বপ্রথম ৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে খুলনায় একটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। সেখানে আমরা খুলনা বেতার কেন্দ্র দখলের জন্য আক্রমন করি। কিন্তু আমাদের আক্রমনের খবর পেয়ে যশোর থেকে বিপুল পরিমান পাকসেনা চলে আসায় আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। এই যুদ্ধে আমাদের ৪০ জনের মতো সহ যোদ্ধা শহীদ হন। এই একটি যুদ্ধ ছাড়া অন্য সকল যুদ্ধেই পাকসেনাদের ঘায়েল করতে সক্ষম হই। প্রথম যুদ্ধে সহযোদ্ধাদের হারিয়ে মৃত্যুভয়কে জয় করে মুক্তিদল নিয়ে চলে আসি নিজ উপজেলা কাউখালীতে।

সেখান থেকেই পাশ্ববর্তী বানারিপাড়া থানা আক্রমন করে প্রচুর অস্ত্র সংগ্রহ করি। আগষ্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে দলবল নিয়ে এই থানা আক্রমন করি। সকাল ১০টার দিকে থানার আউট পোষ্টে আক্রমন করলে পুলিশের বাঁধার মুখে পরি। তাদের আক্রমনে আমাদের  দুইজন বীর সহযোদ্ধ শহীদ হন। চোখের সামনে দুজন সদস্যের মৃত্যুদেখে আমরা আরো মরিয়া হয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরি। একপর্যায়ে আমাদের সদস্যরা থানা ঘিরে ফেলে এবং পুলিশ ও সেখানে অবস্থানরত রাজাকারদের আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করি। আত্মসমর্পনকরা প্রায় ৪২ জন পুলিশ সদস্য পরবর্তিতে আমাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে।

তার উল্লেখযোগ্য সম্মুখ যুদ্ধের একটি সংগঠিত হয় ২২ সেপ্টেম্বর কাউখালী উপজেলার কেউন্দিয়া গ্রামে। ওই দিন কেউন্দিয়া গ্রামের আউয়াল উকিল তার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের রাতের খাবারের দাওয়াত দেয়। কথা ছিলো আমাদের রাত ১২টার মধ্যে বিদায় দিবেন। কিন্তু তার গড়িমসিতে বিষয়টি গুপ্তচরের মাধ্যমে ঐ বাড়িতে আমাদের অবস্থানের খবর পাকসেনাদের কাছে পৌছে যায়। খবর পেয়ে পাকসেনারা পরিকল্পনা করে গ্রামটিতে রাতের আধারে আক্রমন করার। পাকসেনাদের আগমনের খবর জানতে পেরে আমরাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নেই। ইতিমধ্যে খবর আসে গ্রামের চতুরপার্শ্বে পাক ও রাজাকার বাহিনী ঘেরাও করে ফেলেছে। তখন আমরা শুণ্যে গুলিছুড়ে সংকেত দেই। এই সংকেত পেয়ে আশেপাশে থাকা অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের সাথে যোগদেয়। এর পরই পাকসেনাদের সাথে শুরুহয় সম্মুখ যুদ্ধ।

ভয়াবহ এই যুদ্ধে ৯ জন পাকসেনাসহ ১৭ জন নিহত হয়। এ সময় আমান গোল, সেরে গোল এবং মানিক গোল নামের তিন পাক সেনাকে মুক্তিসেনার জীবিত আটক করি। এছাড়া পাকসেনাদের কাছ থেকে তিনটি এলএমজি, ছয়টি এসএমজি, দুটি মর্টার ও বেশকিছু গোলাবারুদ উদ্ধার করি। তবে ওই যুদ্ধে আমাদের মধ্যে অন্যতম সহযোদ্ধা মাজেদ নিহত হয়। যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান বলেন, জীবনের ঝুকি নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছি। এর ফল ভোগ করছে বর্তমান প্রজন্ম। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এটাই আমার পরম শান্তি। চাওয়া পাওয়ার আর কিছু নেই।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ