,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

কাউখালীর মুক্তিযোদ্ধা হাশেম মাঝির জীবন চলে সালসা বেচে

লাইক এবং শেয়ার করুন

সৈয়দ বশির আহম্মেদ, কাউখালী প্রতিনিধি:  পিরোজপুরের  কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠী ইউনিয়নের জোলাগাতী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম হাওলাদার এলাকায়  পরিচিতি হাশেম মাঝি নামে মুক্তিযুদ্ধের সময় নৌকার মাঝি ছিলেন হাশেম। সে কারনে এ জনপদের মানুষ তাকে মাঝি বলেই চেনে। কাউখালী উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় বিড়ালজুড়ী আবাসন প্রকল্পে অস্থায়ী ভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। স্ত্রী, চার কন্যা ও দুই ছেলেসহ আট সদস্যের পরিবার তাঁর।

খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য তিনি বেছে নেন গ্রাম্য কবিরাজি পেশা। গ্রাম্যহাট বাজারে  সালসা বিক্রির কাজ করেওে মাঝি নামটার আজও বদল হয়নি তার। হাটে বাজারে পথের ধারে সালসা বিক্রি করে যা রোজগার হয় তা থেকেই চলে তার সংসার। তিনি জানান,১৯৭১ সালে মেজর জিয়াউদ্দিন (অবঃ) নয় নম্বর  সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার যার নেতৃত্বে সেদিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই বীর সেনা।  ১৯৭১ সালে তিনি সুন্দরবনে বনশ্রমিকের কাজ করতেন। তৎকালীন নয় নম্বর  সেক্টর ছিল নদীবহুল এলাকা। নদীনালা ও অসংখ্য খাল বিল মাকড়শার জালের মতো বিস্তৃর্ন ছিল এই সেক্টর। সড়ক পথের ব্যবস্থা ছিল খুবই নাজুক।

এখানে যুদ্ধের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল একমাত্র নৌপথ। বর্ষাকালে নদ নদীগুলো ধারনকরত ভয়ংকর দৈত্যের মতো রূপ। ওই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নৌপথে চলাচলের জন্য ভাল পথ ঘাট চেনা দক্ষ  মাঝির প্রয়োজন পড়ে।  যিনি অস্ত্র গোলাবারুদ সহ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে নিরাপদে পৌঁছে দিবেন। সে সময় এ রকম একজন মাঝি পাওয়া খুবই দুস্কর ছিল। ঠিক তখনই  মেজর জিয়া উদ্দিন তাকে নির্বাচিত করলেন। হাশেম মাঝির সুন্দরবন ও বরিশাল সহ দক্ষিণ উপকুলের জলপথ ছিল যার নখদর্পনে। তারপর আবুল হাশেম নৌকার মাঝি পরিচয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন।

একদিন হাসনাবাদ থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও অস্ত্রের চালান নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন সুন্দরবন অভিমুখে। তখন ঘোর বর্ষাকাল প্রমত্তা নদী। ঘোর অন্ধকার রাত নদীর মাঝপথে শুরু হয় উথাল পাথাল ঢেউ সেই সাথে ঝড়ের তা-ব। বাংলার অগ্নি সন্তান হাশেম মাঝি শক্ত করে নৌকার হাল ধরেন। তুমুল বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ চমকানোর মাঝে হঠাৎ মাঝ নদীতে পাক সেনাদের গানবোট দেখতে পেয়ে চমকে উঠেন নৌকায় থাকা মুক্তিযোদ্ধারা। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল গোলাগুলি। মূহূর্তেই পাক সোনাদের মেশিন গানের গুলি এসে হাশেম মাঝির হাতে লাগে। গুলিতে আঙুল উড়ে যায়। তবু রক্ত জখমমের হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরেন নৌকার হাল।

পাক সেনাদের গুলি তখনও থামেনা। তখন মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাল্টা গুলি চালায়।  কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায় পাক বাহিনীর আক্রমন। কয়েক ঘন্টা বিপদ সংকুল অবস্থা কাটিয়ে হাসেম মাঝির নৌকা পৌছায় ক্যাম্পের নিকট। এরপর জ্ঞান হারায় হাশেম মাঝি। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবন অঞ্চলে নৌপথে মুক্তিবাহিনী ও অস্ত্র বহন করতেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের নৌপথে যাতায়াত চলত হাশেম মাঝির নৌকায়। এই সত্য ইতিহাস এ জনপদে স্বীকৃত । তবু হাসেম মাঝি রাষ্ট্রের খাতাপত্রে মুক্তিযোদ্ধা নন!

দেশ স্বাধীনের পর হাশেম খুলনা ও মংলায় শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা শুরু করেন। গত ১৪ বছর আগে তিনি কাউখালীতে ফিরে আসেন। নিজের জমি ও ঘর না থাকায় শুরু হয় তার বস্তি জীবন। ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিপন্ন হাসেম গৃহহীন হয়ে পড়েন। সিডর পরবর্তী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সন্ধ্যা নদী তীরবর্তী বিড়াল ঝুড়ি আবাসন প্রকল্পে মাথা গোজার তাঁর ঠাঁই মেলে।

এ ব্যাপারে কাউখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার মো. হারুন আর রশীদ সাইদ বলেন,হাশেম একজন প্রকতৃ মুক্তিযোদ্ধা। সে একজন শ্রমজীবী মানুষ। সালসা বেচে জীবিকা চালান। তাঁর ঘর নেই বলে তিনি সরকারী আবাসনে থাকেন। আমাদের দুর্ভাগ্য হাশেম মুক্তিযুদ্ধের সময় নয় নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর(অবঃ)জিয়াউদ্দিনের সাথে ছিলেন তারপরও এই মুক্তিযোদ্ধা আজও স্বীকৃতি পেলেন না। অথচ তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আরও বলেন,মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেমের নাম প্রস্তাব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও সে গেজেটভূক্ত হতে পারেনি। বিষয়টা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ