,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

লক্ষ্মীপুরে ভুয়া চিকিৎসকের ছড়াছড়ি, প্রতারণার জালে সাধারণ মানুষ

লাইক এবং শেয়ার করুন

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরে ভূয়া চিকিৎসকের ছড়াছড়িতে বাড়ছে অপচিকিৎসা। আর এসব ভুয়া চিকিৎসকের প্রতারণার জালে আটকা পড়ছেন সাধারণ মানুষ। জেলায় স্বাস্থ্য বিভাগে ২৮৬টি পদ শূন্য থাকায় জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন বিদ্যা ছাড়াই ডাক্তার সেজে বসেছেন। আবার কেউ কেউ নিজেকে সবজান্তা পরিচয় দিয়ে সামান্য পেটব্যাথা, জ্বর, সর্দি-কাশি, বিয়ের বর বাঁধা কাটানো, জ্বিন তাড়ানো, ঝাড় ফুঁকসহ এসব কাজই করে নিজেকে দাবী করছেন বড় হেকিম।

খোঁজ নিয়ে জানা জানান, জেলা জুড়ে অসংখ্য হেকিম ও ভূয়া চিকিৎসক রয়েছে। সদর উপজেলার ২নং দক্ষিন হামছাদী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের হাসনাবাদ দুলাল কবিরাজ বাড়ীর মৃত দুলালের ছেলে মনা দীর্ঘ ৫২ বছর যাবত প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে জণসাধারণের সাথে করে আসছেন প্রতারণা। তিনি কারো সন্তান না হলে সন্তানের জন্য চিকিৎসা, তাবিজ, প্রেমে বাধ্য, পেটব্যাথা, জ্বর, সর্দি-কাশি, বিয়েতে বাধ্য করা, জ্বিন তাড়ানোসহ ঝাড় ফুঁকের চিকিৎসা করে থাকেন।

এ নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে ছেলে ডিপেন্সে চাকরি করে এবং বাড়ীতে থাকা তার আরো তিন ছেলের ভয় দেখিয়ে একের পর এক প্রতারণা করছেন তিনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিথি ও দালালদের ম্যানেজ করে গড়ে তোলেন এদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। পৌর শহরের ১৫ নং ওয়ার্ডে পশ্চিম লক্ষ্মীপুরে বড় হেকিম সেজে চিকিৎসা করছেন মৃত অরুন চন্দ্রের পুত্র ক্যাশব বাবু। সদর উপজেলার উত্তরের আদিল পুর গ্রামে বড় ওজা মহিব উল্যাহ্ মাওলানা। পূর্বে মিয়া রাস্তায় আবির নগরে আফছার উদ্দিন ভুঁইয়া বাড়ীতে পেটব্যাথা, জ্বর, সর্দি-কাশি, বিয়েতে বাধ্য করা এবং জ্বিন তাড়ানোসহ ঝাড় ফুঁকের চিকিৎসার কাজ করছেন মিজানের স্ত্রী রোশন আক্তার।

এছাড়া দক্ষিনে তেহরীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রামে শাহে আলমের স্ত্রী তৈয়বা খাতুন (৫৫) ডাক্তারি বিদ্যা ছাড়াই সেজে বসেছেন ডাক্তার। তিনি তা চালিয়ে যাচ্ছেন গত ২০ বছর ধরে। ভবানীগঞ্জ বাজারের দক্ষিণে ছলেমা বেগম ঝাড় ফুকসহ চিকিৎসক সেজে কাজ করছেন ১৫ বছর ধরে। একই ইউনিয়নের ভবানীগঞ্জ ওহাবদা অফিসের পার্শ্বে খেজুর তলীতে আব্দুল খালেক সেজে বসেছেন চিকিৎসক। গত ২৫ বছর ধরে খালেক এলাকায় চিকিৎসার নামে প্রতারনা করে রমরমা ব্যবসায় মেতে উঠেছেন। আর এসব ভূয়া চিকিৎসকের খপ্পরে পড়ে অপচিকিৎসার চিকিৎসায় প্রতারিত জনসাধারণ।

কথা হয় সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জের ইউনিয়নের ৬০ বছরের বৃদ্ধা পারভীন আক্তারের সাথে। তিনি জানান, কয়েক বছর আগের তার মেয়ের স্বামী পায়ের একটি রোগের কারনে এন্টিবায়েটিক অতিরিক্ত মাত্রায় বেশি খাওয়ায় মাথা গুড়ানোসহ ও আবল তাবল বলতেন। সে কারনে তিনি তার মেয়ের স্বামী রহমানকে নিয়ে আসেন তার বাড়ীর পার্শ্বে আবীর নগর গ্রামের রৌশনের নিকট। রৌশন ঘরে মোমবাতিসহ আগর বাতি জ্বালিয়ে বলেন জ্বিনের আসর। তাড়াতে হবে। তাড়াতে একটি দামী মোবাইল সেট অথবা দামবাবত ২০ হাজার টাকা দিতে হবে তাকে। রোশনের এমন কথায় ছলে পরে বলে পরে পারভীন ১৫ হাজার টাকা প্রদান করেন। তার পর চিকিৎসায় কোন উপকার না পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে রৌশনের পালিত দালালদের চওরায় সে টাকা ফেরত পাওয়া হয়নি পারভীনের।

অভিযোগ জানতে কথা হয় ভূয়া চিকিৎসক রৌশনের সাথে। রৌশন জানান, তার চিকিৎসায় দালাল কি বুঝেন না। তবে তাঁর পরিচিতরা রোগী নিয়ে আসেন, তাদের যাাতায়েত ভাড়া বাবত তিনি রোগী প্রতি ১-২ হাজার টাকা তাদের প্রদান করেন। তিনি পুরুষদের সাথে দেখা না দিয়ে আরো বলেন, তার চিকিৎসায় কলেজ পড়–য়া অনেক মেয়ের বিয়ে হয়েছে দাবী করেন হ্যাকিম রৌশন।

এছাড়া পেয়ারাপুর এলাকার লাকী বেগম, জোৎসা বেগম ও নারগীস জানান, ভবানীগঞ্জে খেজুর তলীতে আব্দুল খালেকের অপচিকিৎসার কথা। খালেক এলাকায় বর কাটা, বানটোনার কাজ, ক্যান্সার ,লিভার ,জন্ডিস,সরকারি চাকুরি পাওয়ার তকদির দেয়ার কাজ করেন চুক্তি ভিত্তিক। তার খপ্পরে পড়ে নারগীস ও জোৎসা বেগম প্রায় ৩০ হাজার টাকার বেশি দিয়েছেন খালেককে। কিন্তু তারা চিকিৎসা ও তকদির না পেয়ে ওই টাকা ফেরত চেয়ে ৯ বছরেও ফেরত পাননি তারা।

কথা হয় পৌর শহরের ১৫ নং ওয়ার্ডে পশ্চিম লক্ষ্মীপুরে ক্যাশব বাবুর সাথে। তিনি নিজেকে বড় হেকিম চিকিৎসক দাবী করেন। দেখা যায় তার চার পাশ ঘিরে রয়েছেন রায়পুরের কেরোয়া ও বামনী ইউনিয়ন থেকে আসা রোগী। রোগী শাহাআলম জানান, তিনি পেট ব্যাথার রোগ নিয়ে তার বাড়ীর পার্শ্চে এক মহিলার পরামর্শে এ প্রথমই এসেছেন। তাঁকে হেকিম বলেছেন তার কিডনী নষ্ট হয়ে গেছে। ডাব পড়াসহ করাত কাটা পানিতে সেরে যাবে রোগ। এমন বিশ্বাসে তিনি পাচঁ হাজার টাকা দেন ক্যাশব বাবুকে। টিনের মরিচা ধরা করাত বিজিয়ে পানি ও তাবিজ যে মানুষের ক্ষতি হয় তা তিনি জানেন।

তার পরও তার চিকিৎসায় রোগ ভাল হয় জোর গলায় বলে ক্যাশব বাবু জানান, তিনি এ চিকিৎসা করছেন গত ত্রিশ বছর ধরে। তার চিকিৎসায় কেউ ক্ষতি হয় নাই । ক্যাশব বাবুর অপচিকিৎসার অভিযোগ করেন রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী গ্রামের হাসানের স্ত্রী খুকী বেগম জানান, তার শশুর বাড়ীর পার্শ্চের এক মহিলার পরামর্শে তাঁর বিবাহিত মেয়েকে নিয়ে ক্যাসম বাবুর নিকট এসেছিলেন। সমস্যা তার বিয়ের পর তার বাচ্চা হয় না। সমস্যা কথা বলার আগেই ক্যাশব বাবু বলেন তাকে বর বেধেছে দুষ্টরা।

এ জন্য বিয়ে হচ্ছে না। তার কাছথেকে চিকিৎসা নেয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে হবে মেয়েটি। ক্যাশব বাবুর এমন কথা শুনে বিবাহিত মেয়ে হেসে উঠতেই ক্যাশব বিষয়টি বুঝতে পারেন। ততক্ষনে চিকিৎসার কথা না বলে কে পাঠিয়েছে তা জানতে চান ক্যাশব বাবু। খুকী আরো বলেন, এমন চিকিৎসায় তাকে জুটো পেটা করার উদ্দেশ্যে জুতা হাতে তুলতেই তার পালিত কয়েকজন সন্ত্রাসী এগিয়ে এসে বাহির হয়ে চলে যেতে বলেন খুকীকে। নচেৎ তিনি লাঞ্চিত হবেন সে ভয় দেখান সন্ত্রাসীরা। ক্ষহিগ্রস্থ আরো কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, ক্যাশব বাবুর ঝাড় ফু ও তাবিজসহ অপচিকিৎসা বন্ধে বিচার ও দাবী তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্থসহ স্থানীয়রা।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে সম্প্রতি অপচিকিৎসায় এক শিশু অসুস্থ্য হয়ে পড়লে গত ২৩ আগস্ট মঙ্গলবার রাতে ভ্রাম্যমান আদালত ভূয়া চিকিৎসক তৈয়বা খাতুনকে সরকারি কোষাগারে ২ লাখ টাকাসহ শিশুর চিকিৎসা বাবদ আরো ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। ডাক্তারি বিদ্যা ছাড়াই সেজে বসেছেন ডাক্তার তৈয়বার এমন অভিযোগ ভ্রাম্যমান আদালতে দোষ স্বীকার করে বাড়ীতে আর চিকিৎসা করবেন না আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন তিনি।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, তিনি সম্প্রতি সদর হাসপাতালের ওটি বিভাগের ব্রাদার বিকাশ চন্দ্র ভৌমিককে ভূয়া চিকিৎসার অভিযোগে ২ লাখ টাকা অর্থদন্ড করে রায়প্রদানসহ এ পর্যন্ত ২ জনকে ভূয়া চিকিৎসার অভিযোগে অর্থদন্ড করেন ভ্রাম্যমান আদালত। এছাড়া ভূয়া চিকিৎসায় কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলে তদন্ত করে বিচার করা হবে বলে জানান তিনি। সদর হাসপাতালের ই.এম,ও ডাঃ কমলাশীষ রায় জানান, কিছু অসুখ আছে তা সামান্য চিকিৎসায় ভাল হয়ে যায়। এ অসুখে অনেক রুগিরা চিকিৎসকের কাছে না এসে যে কেন ঝাঁড়ফুকের কাছে যাচ্ছেন তা ঠিক না।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোস্তফা খালেদ জানান, চিকিৎসক নামধারী ডাক্তারি বিদ্যা ছাড়াই হাতুরেরা চিকিৎসা করছে সেটা অবৈধ। কয়েক দিনের মধ্যে কোয়াক চিকিৎসকসহ হেকিম, কবিরাজ ও ওজাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এছাড়া জেলায় স্বাস্থ্য বিভাগে ২৮৬টি পদে লোক শূন্য আছে। তবে এসব পদে লোক নিয়োগের ব্যাপারটি প্রক্রিয়াধীন আছে। তিনি আরো জানান, প্রতিটি এলাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন পর্যায়ে রয়েছে ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ,এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতাল ও জেলা শহরে সদর হাসপাতাল। এসব স্থানে রোগীরা চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন বিনা মূল্যে। সে সাথে পাচ্ছে বিনা মূল্যে ওষুধও। তাতে করে জেলায় পর্যায় ক্রমে বন্ধ হবে অপচিকিৎসা।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ