,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

অবশেষে বিসিএস উত্তীর্ণরা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক

লাইক এবং শেয়ার করুন

ইসমত পারভীন রুনু # বিসিএস পরীক্ষা মূলত ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। প্রতিযোগিতামূলক এ পরীক্ষার মাধ্যমে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে বারবার স্থায়ী বা অস্থায়ী নানারকম ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিভিন্ন রকম পরিবর্তন- নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, কোটাভিত্তিক বয়স বিবেচনা, সিলেবাস সংক্ষিপ্ত কিংবা বর্ধিতকরণ ইত্যাদি। তাছাড়া দু-একবার সংক্ষিপ্ত ও কেবলমাত্র কোটাভিত্তিক বা পদভিত্তিক সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়ায় মূল্যায়নের মাধ্যমেও নিয়োগ হয়েছে অতীতে। ৩৮তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষা থেকে আবার দুই পরীক্ষকের নিয়মও চালু হচ্ছে।

অধিকতর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়েই এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো, যাতে পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত না হন। সর্বোপরি সিভিল সার্ভিসের গুণগত মান বৃদ্ধিতেও এসব পরিবর্তন ভূমিকা রেখেছিলো। বিসিএস থেকে নন-ক্যাডার চাকরির জন্যেও বর্তমানে পিএসসি সুপারিশ করছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও যুগোপযুগী পদক্ষেপ। আরও বিস্তারিতভাবে বলা যায়, বিসিএস উত্তীর্ণ যে সকল প্রার্থী ক্যাডার পেতে বিভিন্ন কারণে বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁরাই নন-ক্যাডারে জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত। একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অনেকে ক্যাডার, কেউবা নন-ক্যাডার ১ম শ্রেণি, কেউবা ২য় শ্রেণি, আবার কেউবা ক্ষেত্রবিশেষে নন-ক্যাডার হলেও নন-গেজেটেড। এমনকি গ্রেডের বৈষম্যও রয়েছে। আবার অনেকে পিএসসির সুপারিশ পেয়েও চাকরি পাননি। এ দুঃসহ পরিস্থিতিতে বলা যায়, দুর্ভাগ্য আমাদের, আর আমাদের মেধাবী সন্তানদের। এখানে উল্লেখ করতে দ্বিধা নেই অনেকে বিসিএস উত্তীর্ণ না হয়েও ক্যাডারভূক্ত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও হবেন।

বছর খানেক আগে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে ৩৪তম বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে সহকারী শিক্ষক (বিষয়ভিত্তিক গেজেটেড ২য় শ্রেণি) পদের জন্য পিএসসি সুপারিশ করে। অতঃপর গত ৩০ আগস্ট গেজেটভূক্ত হয়ে ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে সেই সুপারিশপ্রাপ্তদের (৩৪তম বিসিএস নন-ক্যাডার) মধ্য থেকে ২৮৯ জন শিক্ষক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। যদিও শিক্ষকতা একটি সেবামূলক পেশা এবং মর্যাদাই এ পেশার মূলমন্ত্র, তথাপি শিক্ষকের পদমর্যাদার সাথে সামাজিক মর্যাদাও অনেকাংশে জড়িত। আমার প্রশ্ন হলো, আদৌ কি যোগদানকৃতরা এ পেশার জন্য চয়েস দিয়েছিলেন? আমরা জানি, বর্তমানে অনেকে ডিপ্লোমা করেও ২য় শ্রেণির নন-ক্যাডার গেজেটেড কর্মকর্তা হচ্ছেন, আবার গ্র্যাজুয়েশন করেও হচ্ছেন। আবার অনেকে ৩য় শ্রেণির পদে নিয়োগ পেলেও মাত্র একটি পদোন্নতিতেই ১ম শ্রেণির কর্মকর্তা, এমনকি ক্যাডারভূক্তও হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে আমাদের এই ২৮৯টি সন্তান কি সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিসিএস উত্তীর্ণ হয়েও ১ম শ্রেণির চাকরি থেকে বঞ্চিত হলো না? উপরন্তু সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পদায়ন নিয়েও রয়েছে নানা রকম ভোগান্তি ও বিড়ম্বনা। এমন দুর্গম সব এলাকায় কারো কারো পদায়ন হয়েছে যে, ইচ্ছা করলেও অনেকে চাকরিটা করতে পারবেন না।

বিষয়ভিত্তিক পদায়ন হলেও একজন সহকারী শিক্ষককে দৈনিক নিজের বিষয় ছাড়াও অন্যান্য প্রায় সব বিষয়েই ক্লাস নিতে হয়। কারণ অধিকাংশ বিদ্যালয়ে পদের তুলনায় শিক্ষক আছেন প্রায় অর্ধেকেরও কম। তাই একজন নব্য যোগদানকৃত সহকারী শিক্ষককে দৈনিক গড়ে ৪/৫টি ক্লাস নিতে হচ্ছে। আর অধিকাংশ বিদ্যালয়েই অবকাঠামোসহ অন্যান্য সুবিধা নেই বললেই চলে। আবাসন ব্যবস্থার অবস্থা তো রীতিমত ভয়াবহ! নতুন শিক্ষকদের বাড়িভাড়া করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাও মানসম্মত বাড়ি পাওয়াও বেশ মুশকিলের ব্যাপার। এমতাবস্থায় নানারকম অসঙ্গতি, অসম পরীক্ষা পদ্ধতি এসব তরুণ-তরুণীদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনে বাঁধার সৃষ্টি করছে। যার ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করার পরিবর্তে শুধুমাত্র মর্যাদার কারণেই শিক্ষকেরা কাজ করার আগ্রহ, পরিশ্রমী মনোভাব, পেশার প্রতি শ্রদ্ধা ইত্যাদি ধরে রাখতে পারছেন না।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (নন-ক্যাডার বিসিএস উত্তীর্ণ) পদগুলো যদি ১ম শ্রেণির পদমর্যাদা পায় তাহলেই কেবল এ নিয়োগ সার্থক ও সফল হবে, অন্যথায় নয়। দেখা যাবে, যেসব প্রার্থীর চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা শেষ, শুধু তাঁরাই এ পেশায় নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখবেন। কিন্তু যাঁদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা এখনো অতিক্রম করেনি, তাঁরা এ পেশায় স্থায়ীভাবে মনোযোগ দেবেন বলে মনে হচ্ছে না। ভবিষ্যতে নিজের পছন্দের পেশার জন্য আবারও চেষ্টা করবেন তাঁরা। আসলে জীবনের সব সিদ্ধান্তই কোনো না কোনোভাবে পেশার সাথে সম্পর্কিত। উচ্চশিক্ষিত বেকারদের চাকরি পাওয়াটাই বড় কথা নয়, যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হওয়া বাঞ্ছনীয়।

এদিকে দেখা গেছে, শূন্যপদের বিপরীতে প্রচুর রিকুইজিশন থাকলেও ৩৫তম বিসিএস থেকে আবেদনের সিস্টেমগত ত্রুটির কারণে ১ম শ্রেণির নন-ক্যাডার চাকরিবঞ্চিত হয়েছেন অনেকে। ৩৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডারের আবেদন প্রক্রিয়া ছিলো ম্যানুয়েল। সেখানে বিসিএস পরীক্ষার আবেদনের সময় হতে নন-ক্যাডারে আবেদন পর্যন্ত অর্জিত অতিরিক্ত বা উচ্চতর ডিগ্রি (যেমনঃ মাস্টার্স, বিএড ইত্যাদি), বিভিন্ন ডিপ্লোমা প্রদর্শনের সুযোগ ছিলো। কিন্তু ৩৫তম বিসিএসের ক্ষেত্রে নন-ক্যাডার আবেদন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড হয়ে যাওয়ায় অনেকেই আর নতুন করে অর্জিত এসব ডিগ্রি প্রদর্শন করতে পারেননি। ফলে তাঁদের অনেকেই কিছু ১ম শ্রেণির পদের জন্য বিবেচিত না হয়ে বঞ্চিত হয়েছেন, যেগুলোর যোগ্যতা ছিলো ওই উচ্চতর ডিগ্রি। মারাত্মকভাবে স্বপ্নের হয়েছে অপমৃত্যু।

অতএব, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার মূল্যায়ন করে, কর্মঠ এইসব তরুণ-তরুণীদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে, স্বপ্ন সফলতায়, জীবনের নিরাপত্তায় মাধ্যমিক স্তরে বিসিএস উত্তীর্ণ নন-ক্যাডার সহকারী শিক্ষক পদগুলো ১ম শ্রেণির পদমর্যাদায় উন্নীত করা খুবই জরুরি। বিসিএস চাকরির পরীক্ষা হলেও এর সম্মান রক্ষার্থে শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সব দেশেই সর্বোচ্চ মেধাবীরাই শিক্ষকতায় আসেন। ব্যতিক্রম শুধু আমাদের দেশ। তবে সহকারী শিক্ষকদের পদকে ১ম শ্রেণির গেজেটেড মর্যাদার করা হলে এ অবস্থার পরিবর্তন সহজেই ঘটানো সম্ভব। উচ্চশিক্ষিত ও ভালো একাডেমিক ফলধারী মেধাবী বেকারেরা তখন আর হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না, সাগ্রহেই শিক্ষকতায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করবেন।

লেখিকা: সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মী।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ