,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান বাড়াতে হবে

লাইক এবং শেয়ার করুন

হিন্দু ধর্মাবলম্বী আমার এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুর বাড়িতে পূজা হয় না। সে বা তার পরিবারের সদস্যরা পূজা বা কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যায় না। বহুদিন আগে কৌতূহলী হয়ে আমি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, ‘সব ধর্মের লোক মিলে যদি এক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উপাসনা করতে না পারি তবে সে অনুষ্ঠানে যাওয়ার কোনও অর্থই হয় না’।কথাটির গুরুত্ব দেওয়ার সেদিন কোনও কারণ খুঁজে পাইনি। ভেবেছিলাব ধর্মকর্ম বিমুখ কিছু মানুষ বড়বড় বুলি আওড়িয়ে পরিতৃপ্তি পায়, এটাও বোধহয় সে ধরনেরই একটা কিছু।
এর অনেক পরে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ধ্যান চর্চা অনুষ্ঠানে গিয়ে আমি বিমোহিত হই। দেখি বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে ধ্যান বা মেডিটেশনে দোয়া বা উপাসনায় অংশ গ্রহণ করছে। বন্ধুটির কথা মনে পড়ে গেল। তাকে বললাম, ‘আপনার কল্পনার সেই সব ধর্মের মানুষের একসঙ্গে উপাসনা করার অনুষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করুন। বন্ধুটি পরে সেখানে যোগাযোগ করেছিলেন কিনা কিংবা সেই প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন কিনা তা আমার জানা নেই।
আমাদের সমাজ বাস্তবতায় মুসলমান ধর্মের মানুষরা যেমন ছেলেবেলা থেকেই বাড়িতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ওয়াজ মাহফিলে যা শোনে সেই শোনা থেকে ধীরে ধীরে যে বিশ্বাস লালন করে তা হলো তার নিজের ধর্ম ছাড়া আর সব ধর্মের কোনও অস্তিত্ব নেই।
এ প্রসঙ্গে একটি মজার ঘটনা বলি। সময়টি ছিল ১৯৮০ সাল। কেবল কর্মজীবন শুরু করেছি। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থানার এক গ্রামে গ্রামীণ ব্যাঙ্ক প্রকল্পে চাকরি করতাম আমি আর বন্ধু গোস্বামী বাদল চন্দ্র। আগে পরিচয় ছিল না। চাকরির সুবাদেই আমাদের বন্ধুত্ব। দুজনে ভাড়া করা একটি টিনের দো চালা ঘরে এক চৌকিতে এক বিছানায় ছিলাম। সে এক চমৎকার সময়! এক কোরবানির ঈদের ছুটি কাটিয়ে দুজনেই কর্মস্থলে ফিরলাম। রাতে ঘুমাতে এসে দেখি বিছানা আলাদা। গোস্বামীর চৌকিতে তার বিছানা আর আমার বিছানা মাটিতে। সেখানে পাটি পেতে তার ওপর আমার কম্বল ও চাদর বালিশ দিয়ে আমার জন্য বিছানা করে রেখেছে বন্ধু গোস্বামী। বলল, ‘আমি ব্রাহ্মণ মানুষ। তুই ঈদে গরু খেয়ে এসেছিস। এখন আমার বিছানায় তুই বসলে, আমরা এক বিছানায় ঘুমালে আমার অকল্যাণ হবে। স্বপ্নে দেখবো, কেউ রাম দা নিয়ে তেড়ে আসছে। বলছে, ধররে মাররে কাটরে…’।  দিন তিনেক পরে গোস্বামীর ভাষায় আমি পবিত্র হলাম। আবার ওর বিছানায় আমার স্থান হলো। সেই উপলক্ষে পরপর দুই দিন গোস্বামীকে আজগরের হোটেলে খাসির কলিজা ভুনা দিয়ে লাঞ্চ করালাম। গোস্বামীও খুশি আমিও খুশি। পরের দিন বললাম, ‘আচ্ছা গোস্বাই, গত দুই রাতে তুই কি কোনও স্বপ্ন দেখিসনি? কেউ কি রাম দা নিয়ে তোর দিকে তেড়ে আসেনি? বলেনি, ধররে মাররে কাটরে…?’ গোস্বামী বলল, ‘মানে কী!’ বললাম, ‘গত দুই দিন দুপুরে খাসির কলিজা নয় গরুর কলিজা ভুনা দিয়ে তুই ভাত খেয়েছিস’। বিষয়টি নিয়ে ঘটে গেল তুমুল ঝগড়া। ক’দিন গোস্বামী আমার সঙ্গে কথা বলেনি। তারপর অবশ্য সব ঠিক হয়ে গেছে। এখনও আমরা চমৎকার বন্ধু।
এই ঘটনাটি নিছক মজা করার মতো একটি বিষয় হলেও এতে মানুষ মানুষের মধ্যে বন্ধু বন্ধুর মধ্যে সহপাঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কৌশল রয়েছে। এ সবই ধর্মান্ধতা, অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা। এটা শুধু  মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে না ভয়ঙ্কর অকল্যাণও বয়ে আনে। অথচ সকল ধর্মেরই মূলমন্ত্র হলো ধর্ম বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে মানবতার কল্যাণের মধ্যদিয়ে সৎকর্মের মধ্যদিয়ে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
মুসলিম ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআন এ সূরা বাকারা ৬২নং আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, নিশ্চয়ই মুসলমান ইহুদি খ্রিস্টান ও সাবেয়ীদের মধ্যে যারা স্রষ্টা ও মহাবিচার দিবসে বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে তাদের সবার জন্যই প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের কোনও ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। এখানে আল্লাহ শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কথা বলেননি অথবা অন্য ধর্মকে বাতিল করে দেননি। মুসলমানদের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদের কথাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
তাছাড়া মানুষের জন্মের ব্যাপারে তার নিজের কোনও হাত থাকে না। মহান স্রষ্টা আমাকে মুসলমানের ঘরে জন্ম দিয়েছেন বলেই আমি ইসলাম ধর্মের অনুসারি আর আমার বন্ধু বাদল চন্দ্র হিন্দুর ঘরে জন্মেছে বলে সে হিন্দু। আমার বা গোস্বামী বাদল চন্দ্রের জন্মের সময় ধর্মের বিষয়ে কোনও চয়েস ছিল না। বিষয়টি সূরা হুজুরাতের ১৩নং আয়াতে আরও পরিস্কার ভাবে বিবৃত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হে মানুষ! তোমাদেরকে আমি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং বিভিন্ন সমাজ ও জাতিতে ভাগ করেছি যেন তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যে বেশি আল্লাহ সচেতন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব জানেন, সব বিষয়ে সচেতন।
মহানবী (স.) ইসলাম ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি অন্য ধর্মকে একটি বারও অবজ্ঞা করেননি বরং সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছেন। শান্তির জন্যে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সন্ধি করেছেন। এটাই ধর্মের উদারতা, শান্তির পথ। আর আমরা ধর্মের এই উদারতাকে বাইপাস করে চলছি অসারতার পথে। বিশ্বাস করছি নিজের ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্ম মিথ্যে। জেহাদের ভিন্ন অর্থ করছি এবং সে ভাবেই গড়ে তুলছি নতুন প্রজন্মকে। আর এই নড়বড়ে অবস্থাকে পুঁজি করে টোপ ফেলছে কেউ কেউ। সেই টোপ গিলছে আমাদেরই সন্তানরা। সৃষ্টি হচ্ছে গুলশান-শোলাকিয়া ট্র্যাজেডি উপাখ্যানের।
সন্দেহ নেই সামাজিক এই অবক্ষয়ের অনেক কারণ আছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা সে কারণগুলো হয়তো চিহ্নিত করেছেন বা করছেন। হয়তো এর থেকে মুক্তির পথ নির্দেশিকাও বের করছেন।

তবে অতি সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে আমি সাদাচোখে যা দেখছি এবং আমার যা মনে হচ্ছে তা হলো, আমাদের মতো ধর্ম ভিরু জাতির মানুষদের জন্যে সঠিক ধর্মীয় শিক্ষার অতি প্রয়োজন। প্রয়োজন ধর্মের সঠিক বার্তা অনুধাবন প্রচার ও প্রয়োগ। নিজের বিশ্বাস বা ধর্মকে একমাত্র স্বীকার করে ভিন্ন মতাবলম্বীদের ঘৃণার মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য এখনই যুগপযুগি ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য। অনতিবিলম্বে সেই শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন প্রয়োজন যে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্যের বিশ্বাস বা ধর্মকে ঘৃণার পরিবর্তে শ্রদ্ধা করার নিশ্চয়তা বিধান করবে। কোনও ধর্মই যে বিনা বিচারে কোনও হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে না এবং এটা যে বিপথগামীতা এই সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
প্রত্যেক ধর্মই সত্য এবং প্রত্যেক ধর্মের লক্ষ্যও অভিন্ন- এই সত্যটি যখন আমাদের বিশ্বাসে রূপ নেবে। যখন কেউ ছুঁয়ে দিলে কারও জাত যাবে না। যখন মানুষ বুঝতে পারবে খুন করে নিজে নিহত হলে বেহেস্তে যাওয়া যায় না তখন আর যাই হোক ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে এত সহজে বিপথগামী করা যাবে না।
এটাও সত্য যে মানুষকে বেঁধে রাখা এই অবিদ্যা থেকে এক দিনে বের হয়ে আসা সহজসাধ্য নয়। তবুও বলবো মহা বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে অবিদ্যা থেকে বেরিয়ে আসার যুদ্ধ এখনই শুরু করা প্রয়োজন। যে যে অবস্থানে রয়েছে সেই অবস্থান থেকেই এ যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কৃষ্টি। তা না হলে গুলশান-শোলাকিয়ার মতো আরও বহু ট্র্যাজেডি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ