,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

ঐতিহাসিক পলাশী দিবস ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা ।। সফিউল্লাহ আনসারী

লাইক এবং শেয়ার করুন

২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী ট্রাজেডির দিন “পলাশী দিবস”। পলাশীর এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব। বাংলা ও বাঙালীর ভাগ্যে দেখা দেয় দুর্যোগের ঘনঘটা। ২৫৬ বছর আগে এ দিনে পলাশীর আম্র-বাগানে ইংরেজদের সঙ্গে এক যুদ্ধে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার সুর্য। করুন পরাজয়ের পর নবাবের বেদনাদায়ক মৃত্যুর মাধ্যমে উপমহাদেশের মানুষ নবাবের অবর্তমানে দ্বীর্ঘ পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। স্বাধীনতাকে হারিয়ে বাঙালী হতাসার সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল। আশা-নিরাশার দোলাচলে জনগন নবাবের অভাব তীব্রভাবে অনুভব করলেও তা থেকে সহসাই মুক্তি মিলল না। পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্তির জন্য অপেক্ষা ছিল দ্বীর্ঘদিনের।

নবাব ছিলেন একজন আদর্শবান শাসক, নির্ভেজাল এক দেশপ্রেমিক তাতে সন্দেহ নেই।একাধারে একজন সৎসাহসী, দূরদৃষ্টিস¤পন্ন শাসক ছিলেন ষড়যন্ত্রে মসনদচ্যুত নবাব সিরাজ উদ দৌলা। তার শাসনকে পোক্ত-সুসংহত করার আগেই বিশ্বাসঘাতকরা আমাবস্যার আধাঁরে ঢেকে দেয় ঝলঝলে সুর্য ।যার ফলশ্র“তিতে বাংলার জনগনের ভাগ্যে দীর্ঘ অন্ধকার নেমে আসে। ইতিহাসবিদ নিখিল নাথ রায়ের লেখা  ‘মুর্শিদাবাদ কাহিনী’ থেকে জানা যায়, নবাবের সেনা বাহিনীর তুলনায় ইংরেজদের সেনা সংখ্যা ছিল অনেক কম। সেখানে বিশ্বাসঘাতকতা না হলে নবাবের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত। আলীবর্দী খাঁর পর ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজউদ্দৌলা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে আসীন হন। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর। তরুণ নবাবের সাথে ইংরেজদের বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।

এছাড়া, রাজ সিংহাসনের জন্য লালায়িত ছিলেন- সিরাজের পিতামহ আলীবর্দী খাঁর বিশ্বস্ত অনুচর মীর জাফর ও খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজদের সাথে তারা যোগাযোগ স্থাপন কার্যকর করে নবাবের বিরুদ্ধে নীলনকশা পাকাপোক্ত করে। দিন যতই গড়াচ্ছিলো এ ভূখণ্ডের আকাশে ততোই কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিলো।১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল কোলকাতা পরিষদ নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার পক্ষে প্রস্তাব পাস করে। এ প্রস্তাব কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমির চাঁদকে এজেন্ট নিযুক্ত করেন।এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক মীরজাফর, তা আঁচ করতে পেরে নবাব তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ কওে আব্দুল হাদীকে অভিষিক্ত করেন। কূটচালে পারদর্শী মীর জাফর পবিত্র কুরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করায় নবাবের মন গলে যায় এবং মীর জাফরকে প্রধান সেনাপতি পদেই পুনর্বহাল করেন।

সমসাময়িক ঐতিহাসিকরা বলেন, এই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজুদদৌলার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।ইংরেজ কর্তৃক পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকে সাহায্য করা, মীরজাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ও ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা,ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ,নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার,কৃষ্ণ বল্লভকে কোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় দান প্রভৃতি কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর অম্রকাননে সকাল সাড়ে ১০টায় ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।কিন্তু প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাবের শোচনীয় পরাজয় ঘটে।

তবে মীর জাফরকে প্রধান অভিযুক্ত করা হলেও ষড়যন্ত্র ছিল সুদুরপ্রসারী, যা ঐতিহাসিক মোহর আলীর বক্তব্যে স্পষ্ট- “মীরজাফর যদি এই চক্রান্তে যোগ নাও দিত ষড়যন্ত্রকারীরা অন্য কাউকে খুঁজে নিত।”“পলাশীর রক্তাক্ত ইতিহাস, পরাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিসংগ্রামীদের পরাজয়ের ইতিহাস, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস, ট্রাজেডি ও বেদনাময় এক শোক স্মৃতির ইতিহাস। এই নৃশংস ও কলঙ্কজনক ঘটনার মাধ্যমে কলকাতা কেন্দ্রিক একটি নতুন উঠতি পুজিঁপতি শ্রেণী ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে।”(ইউকিপিডিয়া)

সত্য চির অম্লান, উদ্ভাসিত। সত্যকে কেউ কোনদিন চাঁপা দিয়ে রাখতে পারেনি, তেমনি নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে কুচক্রের ফাঁদে পড়ে জীবন দিয়েও গেলেও তার অবদান, ভালোবাসা বাঙালিদের মন থেকে কেউ কোনভাবেই মুছতে পারেনি বরং তা আচো অম্লান হয়ে আছে, থাকবে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে জ্বল জ্বল করবে তার যশ-কীর্তি। ঐতিহাসিক মেলেসন পলাশীর প্রান্তরে সংঘর্ষকে “যুদ্ধ”  বলতে বলতে চাননা, কারন- “নবাবের পক্ষে ছিলো ৫০ হাজার সৈন্য আর ইংরেজদের পক্ষে মাত্র ৩ হাজার সৈন্য কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারী ও কুচক্রী মীরজাফর, রায় দুর্লভ ও খাদেম হোসেনের অধীনে নবাব বাহিনীর একটি বিরাট অংশ পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেকার্যত কোনো অংশগ্রহণই করেনি।

এই কুচক্রীদের চক্রান্তে যুদ্ধের প্রহসন হয়েছিলো।” ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়,জাতীয় বেঈমানরা নবাবের সাথে,দেশ ও জাতির সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে, বাংলার স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বিক্রি করে দেয় বিদেশীদের হাতে। আর ঘৃণিত কলঙ্ক জনক এই ষড়যন্ত্রের অধ্যায় সৃষ্টির পেছনে জড়িত সেই বিশ্বাসঘাতকরা আজ ঘৃণার পাত্র হিসেবে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিপতিত। মীরজাফর আজ আর নাম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, এটা ঘৃনিত শব্দ যা এদেশে গালি হিসেবে মানুষের মুখে মুখে অভিশপ্ত হয়ে আছে । ১৭৫৭ সালের এই পলাশী  প্রান্তরের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলার সাড়ে পাঁচশ বছরের মুসলিম শাসনেরও অবসান ঘটে, যাতে বিপন্ন হয় রাষ্ট্রের ভিত্তি।পিছিয়ে পড়ে স্বাধীনতার অগ্রগামীতা। এতে শুধু ক্ষমতাই নয়-“ ইংরেজ ও তাদের এ দেশীয় দালালগোষ্ঠী দেশবাসীর ওপর একের পর এক আগ্রাসন চালায়।ফলে দেশীয় কৃষ্টি-সৃংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে।বিকাশমান ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরির ক্ষেত্রে তারা মরণ কামড় দেয়।”(ইউকিপিডিয়া)

“পলাশী বিপর্যয়ের পর শোষিত বঞ্চিত শ্রেণী একদিনের জন্যও স্বাধীনতা সংগ্রাম বন্ধ রাখেনি। এ জন্যই বৃটিশ কর্তৃপক্ষ সাধারণ জনগণকেই একমাত্র প্রতিপক্ষ মনে করত। ফলে দীর্ঘ দুইশ বছর ধরে আন্দোলন সংগ্রামের ফলে বৃটিশরা লেজ গুটাতে বাধ্য হয়। পরে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামে দু‘টি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে নানা রকমের রটনা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক নবাব। যিনি বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রের কারণে স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেননি। তিনি নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য দেশপ্রেমকে বিকিয়ে দেননি। জীবন দিয়ে নবাবের সম্মান বজায় রেখেছিলেন।”(উইকিপিডিয়া)

ঐতিহাসিক এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কারন দেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্বকে ধ্বংসের ঘড়যন্ত্রকে উসকে দিতে মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, রায় দূর্লভদের মতো দেশদ্রোহীরা এখনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত । ইতিহাসের প্রত্যেকটি সাফল্য ও ব্যর্থতা থেকে যেমনি শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্মকে জাগ্রত করা হয় তেমনি ঐতিহাসিক পলাশী দিবসের শিক্ষা আমাদের প্রজন্ম ও জাতিসত্তার বিকাশে সঠিক নির্দেশনা দিতে পারে। এ দিবসের প্রকৃত শিক্ষা ও সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে আমাদেরকে উদ্যোগী হতে হবে, যাতে কোন পরাশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে। সাথে সাথে এদেশের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা নবাব সিরাজ উদ দৌলার আদর্শকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে আমাদেরই মঙ্গরের জন্য।

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশী ও বিদেশী শত্র“দের সকল ষষড়যন্ত্র রুখে দিতে আমাদের উচিত গণতান্ত্রিক চর্চাকে অব্যহত রেখে দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে যাওয়া।সত্যি বলতে-সত্যের মৃত্যু নেই,সাময়িক হারকে পরাজয় বলে দমে যাওয়া বোকামী।কবির ভাষায়-‘নিষিক্ত ফুলের পাপড়ি হারানো, পরাজয় নয়,আগামীর প্রতিশ্রুতি’…কিংবা ‘আচ্ছন্ন মেঘের জলে স্খলন,অশ্রুধারা নয়,নব জন্মের প্রয়াস…’।

জননন্দিত শাসক সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি বলেও ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়। এদেশীয় নব্য মীরজাফরদেরও শেষ রক্ষা হবেনা। আমাদেরকে নব্য মীরজাফর-জগৎশেঠদের চিহ্নিত করতে হবে, যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে দেশ  জাতির স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়ার অপতৎপরতায় লিপ্ত, যারা দেশের সার্বভৌমত্বকে অবমাননা করে ভিনদেশীদের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিতে চায়। এরা বাংলার সন্তান নয়, ভন্ড প্রতারক। সত্যের ঝান্ডাকে সমুন্নত রাখতে মীর জাফর রুপিদের প্রতিহত করা সময়ে দাবী। আমাদের ভবিষৎ প্রজন্ম যাতে খাঁটি দেশ প্রেমিক হিসেবে বাংলার লাল-সবুজের পতাকা উড্ডীন রাখতে পারে কুচক্রিদের প্রতিহত করে। ঐতিহাসিক পলাশী দিবসে আমাদের প্রত্যাশা হোক দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখতে বিশ্বাসঘাতকদের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে এগিয়ে যাওয়া।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ