,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

প্রেয়সীর রূপের আড়ালে বাংলার রূপে মুগ্ধ জীবনানন্দ দাশ

লাইক এবং শেয়ার করুন

মুস্তাক মুহাম্মদ # তিমির হননের কবি ,নির্জনতম কবি, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ ( ১৮৯৯ – ১৯৫৪ ) । তার কবিতায় উপমা , বিশেষণ ও ভাষার চমৎকারিত্বে আমাদের ইন্দ্রিয়বোধে চরমভাবে পুলক ছড়ায়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , কাজী নজরুল ইসলামের পরে ১৯৩০ সালের দিকে নতুন কাব্য আন্দোলন শুরু হয় পঞ্চপা-দের হাত ধরে । যে স্বতন্ত্র কাব্য আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশ। কবিতায় , আমাদের সবচেয়ে কাছের পরিচিত শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি। কিন্তু তার ডিকশনের গুণপানায় তা অপরূপ হয়ে ধরা দিয়েছে পাঠকের কাছে। তার ব্যবহৃত অনেক শব্দ কবিতায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন আগে কোনো দিন ভাবান্তর হত না; তার হাতে তা নান্দনিক হয়ে উঠেছে। শব্দ বুননের কৌশল অভিনবত্ব। দেশীয় বিশেষ করে আমাদের মুখের ভাষাকে চমৎকার উপস্থাপনায় আমাদের হৃদয়গ্রাহি করে তুলেছেন কবি। জীবনের বোধে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম । তার উপমার কারুকাজ আমাদেরকে অপার আনন্দ দান করে। ‘ বনলতা সেন’ কবিতায় কি অসাধারণ উপমা তিনি ব্যবহার করেছেন -পাখির নীড়ের মতো বনলতা সেনের চোখ। প্রেয়সী -নারী তার কবিতার অন্যতম উপাদান। এই বিষয়কে অবলম্বন করে তিনি দারুণ দারুণ সব কবিতা আমাদের উপহার দিয়েছেন। প্রেয়সীর রূপের বিভাতে দেখেছেন স্বদেশের মুখোছবি।

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার নারীর বিচিত্র রূপ দেখেছেন। সে রূপের মধ্যে অন্যতম – প্রেয়সী রুপটি। প্রেয়সী হিসেবে বাংলার মেয়েদের তুলনা জগত জুড়ে প্রসিদ্ধ – প্রবাদতুল্য। শত প্রতিকূলতার সত্বেও এরা প্রেমিকের হৃদয় জয় করতে চেষ্টার ত্রুটি করে না। প্রিয়তমকে জয়ই তাদের একমাত্র কাম্য। নানা ধরনের অভিজ্ঞতাকে কবি “বোধ” কবিতায় চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন । সব শেষে বলেছেন , বাংলার নারীকূল কি অসাধারণ। প্রেমিক তাকে অবহেলা – ঘৃণা , তুচ্ছ – তাচ্ছিল্য করলেও সে তার মোহন কোমল বাঁশিতে প্রেয়সী হয়ে বার বার ফিরে আসে প্রিয় মানুষের কাছে। প্রেমিককে ফিরতেই হবে – তার কাছে এই তার পণ। দুদ- শান্তি পৃথিবীর কোথায়ও না পেলে প্রেয়সীর কাছে আছে সেই অধরা শান্তি। আর সেই ভালবাসা শান্তি দিয়ে তারা জয় করে প্রিয়র হৃদয়। এক্ষেত্রে “বোধ” কবিতার কয়েকটি পঙক্তি তুলে দিলাম – “ ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে, / অবহেলা করে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে, / ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে ; / আমারে সে ভালোবাসিয়াছে , / আসিয়াছে কাছে ” ( বোধ / ধূসর পান্ডুলিপি )

বাংলার রমনকুল নিয়ে তার এই পরীক্ষা নিরীক্ষালব্ধ সিন্ধান্ত কতই না সত্য। এই সত্যকে আরো গভীরতা দান করতে তিনি কি লিখেছিলেন বিখ্যাত পাখির নীড়ের মত চোখ যার -সেই বনলতা সেন । হ্যাঁ তাই। পৃথিবীর আদি থেকে মানুষ সুখের সন্ধান করছে। হাজার হাজার মাইল পথ মাড়িয়ে পৃথিবীতে তন্ন্ তন্ন করে খুঁজছে শান্তি। যা করতে গিয়ে আজ সে ক্লান্ত । তবুও শান্তির অন্বেষণ চলছে । সুখের সন্ধানে পৃথিবী পরিভ্রমণ করে ক্লান্ত পথিক ফিরে আসে তার প্রেয়সীর কাছে । যে প্রিয়র জন্য পথ চেয়ে আছে । যত দিন প্রিয় শান্তি খুঁজতে বাইরে ততোদিন প্রেয়সী তার অপেক্ষায় পথ পানে চেয়ে আছে। চোখে রেখেছে গভীর ভালোবাসার জাদু। “ বোধ” কবিতার উল্লেখিত পঙক্তিতে আমরা দেখেছি । নারীকে তাচ্ছিল্য করলেও – সে বিপুল ঐশয্য দিয়ে ভালোবেসে জয় করবেই।

ভালবাসার এ সম্পদ পৃথিবীর আর কোথায়ও পাওয়া যাবে না।তাইতো প্রেমিককে ফিরতে হবে প্রেয়সীর কাছে। ফিরে পেয়েছেন Ñ সেই অধরা দুদ- শান্তি। কি সরল স্বীকারুক্তি কবি করেছেন। হাতের কাছে কাঙ্খিত কাম্য সুখ – শান্তি রেখে মিছে হয়রান হয়ে পৃথিবীব্যাপি খুঁজে আবার ফিরতে হয়েছে; পথ চেয়ে থাকা ঘরের প্রেয়সীর কাছে। পথ চেয়ে থাকা প্রেয়সীর মোহনীয় চোখ তো পাখির নীড়ের মতো সৌন্দর্যময় হবে এটাই স্বাভাবিক। এমন উপমা চিত্রকল্প বিশ্বে সাহিত্যেও অপ্রতুল। প্রেয়সীর চোখে রয়েছে অপার শান্তি যা কবিকে দিয়েছিল। পৃথিবীর অন্য কোনো ঐশয্যÑ সৌন্দর্য তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন চিত্রের রঙের দ্রুতি বিশ্ব পাঠকের বোধে চমৎকারভাবে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। শান্তির এই সুবাতাস, শান্তি অন্বেষণী মানুষের কাছে চিরকাল প্রবল প্রাসঙ্গিক হবেন তা হলফ করে বলতে পারি।

নিচে “বনলতা সেন” কাব্যের নাম কবিতা “ বনলতা সেন ” কবিতাটি সম্পূর্ণ তুলে দিলাম। পাঠক অনুভব করতে পারবেন কি উপমা, শব্দের ব্যঞ্জনা, দারুণ উপস্থাপনা শৈলী! এক কথায় নিটুট একখানি কবিতা। যা আমাদের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। এই প্রসঙ্গে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতির একটি কথা বলব । তা হল – আমার জৈনক ইংরেজি পড়া বন্ধু কবি জন ডানের একটি কবিতা পড়ে বলেছিলে – ‘এমন কবিতা বিশ্ব সাহিত্যে বিরল। যা পড়া মাত্রই যে কোনো পাঠকের হৃদয়কে প্রবলভাবে স্পর্শ করে। এমন কবিতা আমাদের সাহিত্যে পাওয়া কষ্টসাধ্য।’ আমি সাথে সাথে ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি আবৃত্তি করতে থাকি। বন্ধু শুনেই বলল , দোস্ত কি অসাধারণ কবিতা ।

মনে হল – আমার হৃদয়ের উপর দিয়ে স্বর্গের একটা দমকা বাতাস বয়ে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। আমার হৃদয়ের কথা জানলো কি করে কবি! কবিতাটি সম্পূর্ণটি তুলে দিলাম – “ হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, / সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে / অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে / সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে; / আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, / আমারে দু – দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।/  চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা , / মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর / হাল ভেঙে যে – নাবিক হারায়েছে দিশা / সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি – দ্বীপের ভিতর , / তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে , ‘ এতদিন কোথায় ছিলেন’ ? / পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।/  সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন / সন্ধ্যা আসে; ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল; / পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পা-ুলিপি করে আয়োজন / তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল; / সব পাখি ঘরে আসে – সব নদী – ফুরায় এ – জীবনের সব লেন দেন; / থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”

প্রেয়সীকে পৃথিবীব্যাপি খুঁজে যখন ক্লান্ত হয়ে আপন কুটিরেই তাকে পেয়েছে তখন তাকে কোনো জরা ছুঁতে দেবে না প্রেমিক। কারণ বহু কষ্টে এ সম্পদ অর্জন করতে হয়েছে। সব জরাজীর্ণ – সীমাবদ্ধতার উপরে তাদের ভালবাসা। আর এই ভালবাসা পৃথিবীতে থেকে যাবে চিরকাল। নশ্বর দেহ ক্ষয়ে যাবে -হবে মাটি কিন্তু ভালবাসা রয়ে যাবে। স্বর্গীয় ভালবাসা সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। তার শক্তি শাশ্বত। রূপসী বাংলার কবির পঙক্তি ছন্দের যাদুতে সে কথার চিত্র দেখতে পাই। তিনি লিখেছেন – “হলুদ রঙের শাড়ি , চোরাকাঁটা বিধেঁ আছে , এলোমেলো অঘ্রাণের খড় / চারিদিকে শূন্য থেকে ভেসে এসে ছুঁয়ে ছেনে যেতেছে শরীর । / চুলের উপর তার কুয়াশা রেখেছে হাত, ঝরিছে শিশির; / প্রেমিকের মনে হল : ‘এই নারী – অপরূপ – খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে / যেখানে রব না আমি , রবে না মাধুরী এই, রবে না হতাশা, / কুয়াশা রবে না আর Ñ জনিত বাসনা নিজে Ñ বাসনার মতো ভালোবাসা / খুঁজে নেবে অমৃতের হরিণীর ভিড় থেকে ইপ্সিতেরে তার।’ ” ( দুজন / বনলতা সেন )

যৌবনে প্রেয়সী এসে এলোমেলো জীবনটা শৃঙ্খলাবদ্ধ করে পরিপূর্ণ করে তোলে। জীবনের ফুলগাছে তখন ধরে বর্ণিল ফুল । প্রেয়সীর সেবা – ভালবাসা – অভিমান সত্যিই অতুলনীয়। কিন্তু জীবনের সমাপ্তি আছে। প্রাণ এক সময় পাতার মত বিবর্ণ হয়ে ঝরে যায়। শুধু পড়ে থাকে প্রেয়সীর আদর – সোহাগ – অনুরাগ – বিরাগের স্মৃতি। ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী ছেড়ে মানুষ চলে যায়; প্রেমিকও চলে যায়। কিন্তু আশা রাখে আবার প্রেয়সীর সাথে দেখা হবে। আবার দু’জনা মিলে একটি স্বপ্নের সংসার গড়বে। গড়ে তুলবে অনিন্দ্য সুন্দর একটি মায়াময় জগত । সেখানে তারা চিরকাল ভালবাসার চাদরে বাধা থাকবে। প্রেয়সী বা প্রেমিক একজন যদি চলে যায় আর একজন ভোগ করে বিবর্ণ পৃথিবীর অবর্ণনীয় বিরূপ কঠিন ব্যবহার।

ক্ষত হৃদয়ের হাহাকার অবর্ণনীয়। তেমন হাহাকারের বিদীর্ণরূপ দেখি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় । তিনি যখন লেখেন – যৌবনের কোন এক নিশীথে সে কবে / তুমি যে আসিয়াছিলে বনরানি। জীবনের বাসন্তী -উৎসবে / তুমি যে ঢালিয়াছিলে ফাগরাগ – আপনার হাতে মোর সুরাপাত্রখানি / তুমি যে ভরিয়াছিলে – জুড়ায়েছে আজ তার ঝাঁঝ , গেছে ফুরায়ে তলানি। /  তবু তুমি আসিলে না, বারেকের তরে দেখা দিলে নাকো হায় ! / চুপে চুপে কবে আমি বসুধার বুক থেকে নিয়েছি বিদায় – তুমি তাহা জানিলে না – চলে গেছে মুসাফের , / কবে ফের দেখা হবে আহা / কে বা জানে ! কবরের পরে তার পাতা ঝরে , হাওয়া কাঁদে হা হা । ” ( ওগো দরদিয়া / ঝরা পালক )

রূপসী বাংলার সৌন্দর্য পিপাসু কবি জীবনানন্দ দাশ। কবিতায় উপমা ছন্দের ব্যবহারে বাংলার রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। কিন্তু প্রেয়সীর নরম হৃদয়ের জন্য তার ছিলো হাহাকার। আর তার জন্য সমগ্র পৃথিবীব্যাপি পরিভ্রমণ করেছেন তিনি। অবশেষে সুখ পেয়েছেন – নাটোরের বনলতা সেনের কাছে । তাকে পেয়ে আজীবন ধরে রাখার জন্য চেষ্টার ক্রুটি করেন নি কবি। বাংলার নারীর রূপ – ভালবাসা অতুলনীয়। সে ভালবাসা স্বর্গীয়। তিনি বারবার তার প্রেম – প্রেয়সীকে অমর করে রাখার কথা দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন। এমন কি মৃত্যুর পারও তিনি আকাঙ্খা করেছেন প্রেয়সীর সাথে মেলার। আসলেই বাংলার রমনিকুলের এই নিপুণ ভালবাসায় তিনি আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।

এখানে এ কথা বলা অবান্তর হবে না যে – তার কবিতায় নারী চরিত্রর আড়ালে ছিল বাংলার অপরূপ রূপ। মূলত তিনি এই বাংলার রূপেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাইতো পৃথিবী ঘুরে যা খুঁজেছেন – সেই শান্তি এই বাংলা পেয়েছিলেন।এবং আমৃত্যু বাংলার রূপ – সুধাপান করেও অতৃপ্ত থেকে গেছেন। তার আকাঙ্খার শেষ হয়নি। তিনি বাংলাকে ভুলতে পারেন নি একমুহূর্তের জন্যও। বাংলার মাটি – বাতাস তাকে মজায়ে রেখেছিল। তিনি প্রেয়সীর রূপের আড়ালে বাংলার অপরূপ রূপ দেখতে পেয়েছিলেন। এই জন্য তিনি বাংলাকে কখনো ছেড়ে যেতে চাই নি এমনকি মৃত্যুর পরেও থেকে যেতে চেয়েছেন অপরূপ এই বাংলার কোলে। সম্ভব হলে পুর্নজন্মে ফিরে আসতেও চেয়েছেন। হ্যা , তিনি থাকবেন বাংলার কোল জুড়ে ; তার প্রাণের মানিক হয়ে । বাংলা কবিতা অঙ্গনে যে স্বতন্ত্র পথ আবিষ্কার করেছেন জীবনানন্দ – তার জন্য অবশ্যই তিনি চিরকালীনতা লাভ করবেন। কত দৃঢ়প্রত্যয়ের সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন – “ আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে – এই বাংলায় / হয়তো মানুষ নয় – হয়তো বা শঙ্কচিল শালিখের বেশে; ” ( আবার আসিব ফিরে / রূপসী বাংলা )

(তারিখ : ০৭/০৯/২০১৬ , পাঁচপোতা)
যোগাযোগ
মুস্তাক মুহাম্মদ
কারুকাজ , কেশবলাল রোড, যশোর Ñ ৭৪০০


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ