,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

রিভিউ নয়, একজন কবির প্রতিকৃতি ।। আবুল কাইয়ুম

লাইক এবং শেয়ার করুন

বইমেলায় অনুপ্রাণন প্রকাশনীর স্টলে এক বন্ধুর কবিতার বই খুঁজতে গিয়ে তাঁর সাথে পরিচয়। স্টলে মধ্যবয়সী মাঝারি গড়নের শ্যামলা এক ভদ্রলোক, মুখে ছাটা দাড়িগোঁফ আর মাথার পেছনে পনিটেল করে বাঁধা চুল। কথাবার্তায় বোঝা গেল, তিনি আমাকে আগে থেকেই জানতেন। প্রশ্ন করলাম, তিনি আমার সাথে ফেসবুকে আছেন কিনা? তাঁর উত্তর, ‘হ্যাঁ’। এরপর তিনি র‌্যাক থেকে আমার কাঙ্ক্ষিত বইটি এনে দিলেন। কেনার আগে পাতা উল্টাতেই বইয়ের কবিতাগুলোর মান দেখে আমার একটু অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। ভদ্রলোক আমার মনের এই অবস্থাটি বুঝতে পেরে জানতে চাইলেন, বইটি আমি আসলেই নেব কিনা? বললাম, ‘এটি আমার এক ফেসবুক বন্ধুর বই। যেমনই হোক বইটি পড়বো এবং পাঠ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবো”। ভদ্রলোক বললেন, “আমি আপনাকে শুধু পড়ার জন্য আর একটি কবিতার বই দেব। আপনার ভালো লাগবে”। এবার তিনি আমাকে যে কাব্যটি দিলেন তার নাম ‘নামানুষ’, আর এর কবি কুহক মাহমুদ। জানতে চাইলাম ‘কে এই কবি?’ তিনি লাজুক হাসি হেসে বললেন, “আমি”। বইটির দাম দিতে চাইলে তিনি বললেন, “আপনি এসেছেন, এটা আপনার সেৌজন্যে”।

বাসায় এসে ফেসবুক সার্চ করে দেখলাম, আমার ফ্রেন্ডস লিস্টে তিনি নেই। আমার নিজের রক্ষণাবেক্ষণকৃত ডেটাবেসে আনফ্রেন্ডেড ব্যক্তিদের তালিকায় পেলাম তাঁর নাম। তখন আমার মনে একপ্রকার লজ্জামিশ্রিত কষ্ট, কী করেছি! অত:পর তাঁকে রিকু পাঠালে তিনি বন্ধু হলেন। বইটি রিভিউ করার ইচ্ছে প্রকাশ করে ইনবক্সে তাঁর কবিজীবনের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় জানতে চাইলাম। কিন্তু বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ঘটনা বললেন। জানলাম, তিনি বংশগতভাবে এক ঘাতক রোগ নিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। এই রোগে তাঁর এক ভাইও মারা গেছে। কষ্ট পেলাম। একজন মানুষ জীবনে কত বেদনা নিয়ে কবি হতে পারে তার আর এক প্রমাণ তিনি। তবু জানতে চাইলাম, বইতে উল্লিখিত দুটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়া তাঁর আর কোন সাহিত্য বিষয়ক গ্রন্থ আছে কিনা, তিনি কখন থেকে কাব্যচর্চা করছেন ইত্যাদি। কিন্তু এসব প্রশ্নে কবি সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত রইলেন। আমার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেল, এমন কবি কী আর আছেন যিনি লিখেই খালাস এবং আত্মপ্রচারে একেবারে নির্মোহ?

এমন একজন মানুষের কাব্যগ্রন্থ ‘নামানুষ’। কাব্যটির প্রায় প্রতিটি কবিতায় আত্মনিবিষ্ট ভাষায় এক এক প্রকৃতির নামানুষের চরিত্রপট অঙ্কন করেছেন কবি। এই নামানুষ সভ্যতার সুবিধাবঞ্চিত, অধিকারহীন কিংবা অন্নের শূণ্য থালা হাতে পড়ে থাকা মানুষ। পরিপার্শ্বের শোষণ-নির্যাতন, নিধনযজ্ঞ ও জ্বালা-যন্ত্রণা সয়ে কোনভাবে টিকে থাকা মানুষ। আবার নামানুষ হয়ে ওঠে সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়া প্রেমিক, ভালোবাসাবঞ্চিত মানুষ অথবা ভালোবাসার কাঙাল অন্ধ ভিখারি মানুষ। তাঁর লেখনীতে নামনুষ যেন নানা শৃঙ্ক্ষলে অনাদিকালের কালের বন্দী মানুষ। এ সকল নামানুষের চরিত্র আঁকতে গিয়ে কবি সমকালীন জীবন ও সমাজের নানা চিত্র তুলে ধরেছেন। মিথ্যের ফুলঝুরি, সভ্যতাবিনাশী দু:স্বপ্নের চিৎকার, খুনি আর গুপ্তঘাতকের হল্লাবাজি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পর্যদুস্ততা, স্বেচ্ছাচার ও স্বৈরাচারের দাপট, দুর্নীতি, বকধার্মিকতা সহ নানা অপঘাত ও অপকাণ্ডের বাস্তব বর্ণনায় কাব্যটি যেন সময়ের এক দুর্দান্ত ফটো অ্যালবাম। বন্দী মানবতার মুক্তির দিশারী এই কবি মানুষের বাসযোগ্য সুন্দর স্বদেশ-পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন। শব্দের যাদুখেলা, গাঢ়বদ্ধ বাণীবন্ধের প্রবহমানতা ও অসাধারণ চিত্রকল্প নিয়ে এক নতুন কাব্য-আঙ্গিক গড়েছেন তিনি।

কুহক মাহমুদ এক আত্মগুণ্ঠিত, মার্জিত কবির নাম। তাঁর কাব্যটির একেকটি কবিতা যেন পৃথক শিল্পকর্ম। প্রতিটি কবিতাই আমার কাছে সমাজবাস্তবতার একেকটি দিক উন্মোচিত করে দেয়, আমাকে ভাবায়, ঋদ্ধ করে নতুন বোধে। কবিতাগুলো এমনই যে, এক বৈঠকে পড়ে শেষ করার মতো নয়। তাই তো অবসর পেলেই বইটি খুলে একটি বা দুটো কবিতা পড়ি। এভাবে হয়তো আরো অনেকদিন একজন মানুষ কবির ‘নামানুষ’ কাব্যটি আমার পাঠ্য হয়ে থাকবে।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ