,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায়……

লাইক এবং শেয়ার করুন

মোঃ রাজন আমান,কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি# কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি বছরের ভর্তির পরীক্ষা চলাকালীন ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় জড়িত রাঘব বোয়ালদের নাম বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। আইন-শৃংখলা বাহিনীর নজরদারিতে আছেন ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ স্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা। আর এ ঘটনায় ফেঁসে যেতে পারেন ইবি ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির শীর্ষ এক নেতা ছাড়া আরো বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা কাজ করছে, পাশাপাশি আইন-শৃংখলা বাহিনীর তদন্তে ইতিমধ্যেই চিহিৃত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন নিজ দোকানে ফটোকপি করে জালিয়াতির অভিযোগে গণিত বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটোকপি দোকানের মালিক মনোজিৎ কুমারের দোকানটিও গতকাল সিলগালা করে তালা লাগিয়ে দেন প্রক্টর প্রফেসর ড. মাহবুবর রহমান। লাল্টু গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে সে পলাতক। সূত্র জানিয়েছে মনোজিৎ কুমারের ছোট ভাই এ ইউনিটে মেধা তালিকায় ২য় স্থান অধিকার করে।

অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীন সময় খুব কৌশলে ইবির কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মাধ্যমে ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্ন বাইরে চলে আসে। আর প্রশ্নটি চলে যায় ক্ষমতাসীন দলের একটি চক্রের হাতে। পরীক্ষার আগে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী তবিবর রহমান তোতার বাড়িতে কথিত একটি ক্যাম্প খোলা হয়। সেখানে অর্থ দিয়ে ভর্তিচ্ছু প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থীকে এ প্রশ্ন  সরবরাহ করা হয়।

তোতা ছাড়াও ইবি ছাত্রলীগের বতর্মান কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম, সদর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক আনিচুর রহমান বিকাশ, ইবির কর্মচারী লাল্টুসহ আরো বেশ কয়েকজন বিষয়টি সমন্বয় করেন। বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের সোর্স ও দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে পরীক্ষার্থী। হরিণারায়ণপুর, পূর্ব  আব্দালপুর, শান্তিডাঙ্গাসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে এ চক্রের হাতে তুলে দেন অর্থ। আর এসব টাকা লেনদেন হয় ইবির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মাধ্যমে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন শৃংখলা বাহিনী এ বিষয়ে তদন্তে নামে। এতে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে এ চক্রের হোতাদের নাম ও পরিচয়। পুলিশ ও র‍্যাব বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। ভর্তি সময়কার ফোনের কথোপকথনও এখন আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান,‘ প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর তারা তদন্ত শুরু করেন। ওই সময়কার ভর্তি সংক্রান্ত কয়েকজনের ফোন রেকর্ডও তাদের কাছে আছে। এ ঘটনার সাথে এক সময়কার আলোচিত চরমপন্থি নেতা তবিবর রহমান তোতা, যুবলীগ নেতা আনিচুর রহমান বিকাশসহ আরও কয়েকজনের যোগসূত্র আছে বলে জানতে পেরেছে আইন শৃংখলা বাহিনী।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অমিত কুমার দাস বলেন, ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এতে করে কতিপয় অযোগ্য ও কম মেধাবীরা ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছে। এরা যে অর্থের বিনিময়ে ভর্তি হয়েছে সে বিষয়ে আমাদের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য প্রমাণ আছে। যথাযথ তদন্ত হলেই রাঘব বোয়ালদের নাম বেরিয়ে আসবে।’

এদিকে ইবি ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও তবিবর রহমান তোতার মাধ্যমে ‘এফ’ ইউনিটে মেয়েকে ভর্তি করান শান্তিডাঙ্গা এলাকার পল্লী চিকিৎসক ও বিএনপি নেতা লাল্টু ডাক্তার। তিনি মেয়েকে ভর্তির জন্য প্রায় দুই লক্ষ টাকা দেন এ চক্রকে। লাল্টুর মেয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হয়েছে। এদিকে এ বিষয়টি নিয়ে সাইফুলের সাথে লাল্টুর বেশ কিছুদিন আগে বাকবিতান্ডা হয়। কয়েকদিন আগে সাদা পোষাকে একদল লোক লাল্টু ডাক্তারকে বিত্তিপাড়া বাজার থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে তার পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেছেন। এরপর তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভর্তি পরীক্ষার জালিয়াতি বিষয়ে লাল্টুর কাছে ব্যাপক তথ্য রয়েছে। এ কারনেই হয়ত তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। লাল্টুর একজন আত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভর্তির বিষয় নিয়ে সাইফুলের সাথে কিছুদিন আগে লাল্টুর ঝামেলা হয়।

এদিকে ইবির কর্মচারী আলাউদ্দিন আলালকে ‘এফ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার আগের দিন একজন শিক্ষার্থী খুঁজে দিতে বলে তোতা ও সাইফুল। আলাউদ্দিন তার ঘনিষ্ট একজনের মাধ্যমে একজন মেয়ে শিক্ষার্থী জোগাড় করে দেয় ভর্তির জন্য। এ জন্য তোতা ও সাইফুলের সাথে তার ২ লাখ টাকায় মিটমাট হয়। ওই শিক্ষার্থীর গণিতে চান্স হয়।

আলাউদ্দিন আলালের সাথে কথা হলে জানান, আমাকে ভর্তি পরীক্ষার আগের দিন তোতা ও সাইফুল একজন শিক্ষার্থী দিতে বলে। পরে একজন মেয়েকে খুঁজে বের করলেও সাইফুল জানায় এখন আর হবে না। পরে অনেক অনুরোধের পর তারা নিতে রাজী হয়। ওই মেয়েকে সাইফুল মটর সাইকেলে নিয়ে যায়। এ জন্য ২ লাখ টাকা মিটমাট হলেও পরে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। তোতা আমাকে ১০ হাজার টাকা ভাগ দেয়। আলাল জানায়, এখন আমার ওপর চাপ আসছে। আর সাইফুলকেও সন্দেহ করছে প্রশাসন। কয়েকদিন আগে প্রক্টর স্যার সাইফুলকে ডেকে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে তার সম্পৃক্ততা আছে বলে জানায়। আলাল জানায়, এ ঘটনার সাথে তোতা, বিকাশ ও মোক্তারসহ আরও কয়েকজন জড়িত। অনেক টাকা তারা আয় করেছে এ কাজ করে।

ইবি ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলামের সাথে এ বিষয়ে কথা হলে জানান,  তোতা ও বিকাশ জড়িত থাকতে পারে। তবে আমি এসব কাজের সাথে জড়িত নয়। প্রক্টর স্যারের সাথে কথা বলে পরে আপনার সাথে কথা বলব বলে ফোন রেখে দেন সাইফুল।’

এ অভিযোগের ব্যাপারে তবিবর রহমান তোতার ফোনে একাধিক বার রিং দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। সদর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক আনিচুর রহমান বিকাশ সাংবাদিকদের জানান, ভর্তির সময় অনেকের সাথেই ফোনে কথা হয়েছে। তবে বিষয়টির সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন।’

বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‘এফ’ ইউনিটের প্রকাশিত ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ায় গত ২৫ জানুয়ারি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম মোস্তফা কামালকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আহসান উল আম্বিয়া ও প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান।

এদিকে এক মাসেও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি তদন্ত কমিটি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘তদন্তের কাজ প্রায় শেষের দিকে। আশা করি সামনের সপ্তাহে যেকোনো দিন প্রতিবেদন জমা দিতে পারবো। সম্প্রতি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক হওয়া স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক লাল্টুসহ অভিযুক্তদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি কি কারণে আটক হয়েছেন তা আমার জানা নেই। হতে পারে তিনি প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িত সন্দেহে আটক হয়েছেন অথবা অন্য কোনো কারনে আটক হয়েছেন। তবে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে তিনিসহ কে বা কারা জড়িত তদন্তের স্বার্থে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না।’

র‍্যাব-১২ কুষ্টিয়া ক্যাম্পের কোম্পনী কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন,‘ আমরা অভিযোগ পাওয়ার  পর তদন্ত শুরু করেছি। ইতিমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। তবে এ ঘটনার সাথে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। যথা সময়ে মিডিয়াকে জাননো হবে।

প্রশ্ন পেয়ে উত্তীর্ণরা মেধা তালিকায় শীর্ষে- গত বছরের ৭ ডিসেম্বর ‘এফ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরের দিন ওই ইউনিটের ফল প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ ওঠে, পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র পেয়ে উত্তীর্ণ ৭ জন পরীক্ষার্থী মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানসহ শীর্ষস্থান দখল করেছে। বিষয়টি নিয়ে এই প্রতিবেদক অনুসন্ধান চালায়। প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা হলেন-তিথি খাতুন (ভর্তি পরীক্ষার রোল-০০২৮২, মেধাক্রম দ্বিতীয়), শিলন হোসেন (ভর্তি পরীক্ষার রোল-০০০৫৩, মেধাক্রম-৩), হিরামুন মন্ডল (ভর্তি পরীক্ষার রোল-০২৭৫৭, মেধাক্রম চতুর্থ), নিরা খাতুন (ভর্তি পরীক্ষার রোল-০০১৪৪, মেধাক্রম-৮), মো. সাইদুর রহমান (ভর্তি পরীক্ষার রোল-০১১৪৩, মেধাক্রম-১৮), সুমাইয়া তাবাসসুম (ভর্তি পরীক্ষার রোল-০১৫৭১, মেধাক্রম-৩০), ইনতে খা বিনতে সাগর (ভর্তি পরীক্ষার রোল-০২২৫২, মেধাক্রম-৩২)। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানপ্রাপ্ত তিথি খাতুন ‘এফ’ ইউনিটে এমসিকিউ ৮০ নম্বরের প্রশ্নে গণিতে ৬০ এর মধ্যে ৫১ এবং ইংরেজি ২০ নম্বরের মধ্যে ১৪ পেয়েছেন। অথচ তিনি বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‘ই’ ইউনিটের পরীক্ষায় ফেল করেছেন। তিনি ‘ই’ ইউনিটে গণিত প্রশ্নে উত্তর করেননি। ‘ডি’ ইউনিটে অপেক্ষমান তালিকায় থাকলেও তার অবস্থান ৭শত জনের পরে।

 


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ