,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে নানা হিসাব-নিকাশ

লাইক এবং শেয়ার করুন

২২ ডিসেম্বরের ভোট সামনে রেখে নির্ঘুম প্রচার চলছে নারায়ণগঞ্জে। বন্দর নগরীর এই নির্বাচন নিয়ে দৃষ্টি সারা দেশেই। মেয়র পদে সাতজন প্রার্থী থাকলেও প্রধান আগ্রহ আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভী আর বিএনপির সাখাওয়াত হোসেন খানকে নিয়ে। কে জিতবে? পশ্চিমা দেশে গণমাধ্যম বা অন্যান্য সংস্থা নির্বাচনের আগে ভোটারদের ওপর জরিপ করে তা প্রকাশ করে। তবে বাংলাদেশে জরিপ হলেই বিতর্ক হয়। এবার কে এগিয়ে-তাই কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না।

কিন্তু ভোটের ময়দানে কে এগিয়ে তা নিয়ে আগ্রহ কম নয়। শনিবার বন্দরনগরীতে দুই প্রার্থীর অবস্থান জানতে নির্বাচনী এলাকা  বেড়িয়েও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেল না। কোনো একটি এলাকায় আইভীর সমর্থক বেশি, তো অন্য এলাকায় সাখাওয়াতের। কোনো একটি শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় তো অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় বিএনপি।

আলোচিত এই নির্বাচনী এলাকা মোট তিনটি উপজেলায় বিস্তৃত। এর একটি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক এবং একটি বিএনপির ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। এ সিটি করপোরেশনে মোট ভোটার দুই লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৩৯ হাজার ৬৬২ এবং নারী দুই লাখ ৩৫ হাজার ২৬৯। এর মধ্যে বন্দর উপজেলায় ভোটার সংখ্যা এক লাখ ১৩ হাজার। সিদ্ধিরগঞ্জে দেড় লাখেরও কিছুটা বেশি। বাকি ভোট নারায়ণগঞ্জ শহরের।

স্থানীয়রা জানান, এই তিন উপজেলার মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ বরাবর আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত। আর বন্দর উপজেলায় ভোট বেশি বিএনপির। আর শহরে একবার এক দল, আরেকবার অন্য দল বেশি ভোট পায়। আর তিন উপজেলায় সংসদীয় আসন দুটি যার সংসদ সদস্য হলেন, নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দরের সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির সেলিম ওসমান এবং সিদ্ধিরগঞ্জের সংসদ সদস্য তার ভাই আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান।

নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে আট বছর এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে পাঁচ বছর শাসন করেছেন আইভী। এই ১৩ বছরে তার বিরুদ্ধে বলার মতো কোনো অভিযোগ ওঠেনি। আর নারী হিসেবেও নারী ভোটারদের কাছে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে দাবি করছেন তার সমর্থকরা। এর পাশাপাশি যোগ হবে আওয়ামী লীগের দলীয় ভোটব্যাংক। এই তিনে মিলে আইভীর সহজ জয় দেখছে ক্ষমতাসীন দল।

ওসমান পরিবার প্রসঙ্গ

তবে ভোটের ময়দানে এত সহজ হিসাব খাটে না। বিশেষ করে শামীম ওসমান আইভীকে সমর্থন জানালেও ওসমান পরিবারের সঙ্গে তার পূর্ববিরোধ ভোটে কী প্রভাব ফেলে সে নিয়ে কথা এখনো শেষ হয়নি। বিতর্ক থাকলেও ওসমান পরিবারের জনপ্রিয়তা আর প্রভাবও নারায়ণগঞ্জে উপেক্ষা করার মতো না। তাদের ভোট আইভীর বাক্সে পড়ে কি না- সে প্রশ্নই নির্বাচনের ফলাফলে অন্যতম নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন এলাকাবাসী।

বিএনপি আশা করছে, শামীম ওসমান ও আইভীর পুরনো দ্বন্দ্ব তাদের ভোটের ময়দানে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে। তবে আইভী বলেছেন, শামীম ওসমান যেহেতু তার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন, তাই নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সাত খুন প্রসঙ্গ

সাত খুনের ঘটনাটি স্তিমিত হয়ে উঠলেও ভোটের আগে তা চাঙা করার চেষ্টা করছে বিএনপি। তাদের আশা সিদ্ধিরগঞ্জে ঘটা দেশ কাঁপানো এই খুনই পাশার দান উল্টে দেবে। এই ঘটনায় সরকারি বাহিনী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশের যোগসাজশ আদালতে উঠে এসেছে। বিএনপি সাত খুনকে ক্ষমতাসীন দলের ওপর চাপিয়ে ভোটের ময়দানে আইভীকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে।

বিএনপি সমর্থন আহমেদ হোসেন বলেন, ‘সাখাওয়াত আলোচিত সাত খুন মামলায় বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী ছিলেন। সেই হিসাবে স্থানীয় জনগণের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা আছে। আমরা এর সুফল পাবো।’ এমনিতে সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। আইভীর সমর্থকরা বলছেন, এটা একটা দিক, পাশাপাশি আইভী মেয়র থাকাকালে এই এলাকায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছেন। আবার তিনি সব সময় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, সোচ্চার ছিলেন। তাই তাকে সন্ত্রাসের তকমা দিয়ে ঠেকানো যাবে না।

সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, আইভী মেয়র থাকার সময় আমাদের এলাকায় রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছে। তবে ভোটের হিসাব-নিকাশ কী হয় তা বলা যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন দলীয় ভোটারের বাইরে বড় অঙ্কের নীরব ভোটার রয়েছে। নির্বাচনে সেই ভোট অনেক বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে।

বন্দরের নবীগঞ্জের বাসিন্দা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, অন্য দুটি উপজেলার তুলনায় বন্দরে বিএনপির ভোট বেশি, সেই হিসাবে বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত সাহেব এখানে এগিয়ে থাকবেন। তবে আরেকটা বিষয় হলো অতীতের তুলনায় বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সেলিনা হায়াৎ আইভী বেশি করছেন। কিন্তু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় সেই প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে।

আঞ্চলিক প্রভাব

নারায়ণগঞ্জ বন্দর এলাকা হওয়ায় আশপাশের এবং দূর এলাকার হাজারো মানুষ এখানে বসবাস করেন। এর মধ্যে কিছু এলাকা আওয়ামী লীগ প্রভাবিত এবং কিছু এলাকা বিএনপি প্রভাবিত হিসেবে চিহ্নিত। আঞ্চলিক ভোট রয়েছে যার মধ্যে মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, বরিশাল অঞ্চলের। এ অঞ্চলের ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে বড় দুটি দল। এসব অঞ্চলে বাড়ি দলের কেন্দ্রীয় দায়িত্বে আছেন এমন নেতাদের প্রচারণায় পাঠাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

দুই প্রার্থীর ভাবমূর্তি

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এতটুকু কালিমা লাগেনি আইভীর কপালে। পাশাপাশি পাঁচ বছর মেয়র থাকাকালে তার উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। তিনি সদালাপী, ভদ্র আর মিশুক মানুষ। সন্ত্রাসের অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে। এসব বিবেচনায় তিনি এগিয়ে বলে দাবি তার সমর্থকদের। তবে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির দিক থেকে পিছিয়ে নন সাখাওয়াতও। তারও ব্যক্তিগত জীবনেরও কালো দিক নেই বলাই যেতে পারে। এই আইনজীবী কেবল টাকা কামাননি, কাজ করেছেন অন্যের স্বার্থেও। বিশেষ করে সাত খুনের পর অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করাতে তার বলিষ্ঠ অবস্থানের প্রশংসা আছে।

রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা

এদিক থেকে যোজন যোজন এগিয়ে আইভী। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে জড়িত এই নারী নানা সময় দলের ভেতরে-বাইরে জটিল পরিস্থিতি সামলেছেন শক্ত হাতে। জনতা কী চায়, সেটা ভালোই জানা আছে তার। তাদের মন জয় করতে কখনো ব্যর্থ হননি। কোনো ভোটে হারেননি তিনি। এদিক থেকে স্পষ্টই পিছিয়ে সাখাওয়াত। তিনি বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন মূলত তিনজন প্রার্থী হতে না চাওয়ায়। তবে এক দিক থেকে তিনি ইতিবাচক অবস্থানে আছেন। আওয়ামী লীগে স্পষ্ট বা গোপন বিভেদ থাকলেও সাখাওয়াতকে এই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীর সমর্থন পাচ্ছেন তিনি।

নারী ভোটার

নির্বাচনী এলাকার প্রায় অর্ধেক ভোটার নারী। এই দিক থেকে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার আশায় আইভী। তিনি সরাসরি ঢুকে যাচ্ছেন অন্দরমহলে। বোন-চাচি, নানি-দাদি বলে ভোট চাইতে পারছেন। সাখাওয়াত ঢুকতে পারছেন না অন্দরমহলে। তবে এই দুর্বলতা ঢাকতে তিনি অবশ্য তার নারী কর্মীদের মাঠে নামিয়েছেন ছোট ছোট দলে ভাগ করে। আশা করছেন, সুফল পাবেন তিনিও।

–ঢাকাটাইমস


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ