,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আগুনের উপর বাংলাদেশ ঐক্য, একাগ্রতা, ঋজুতাই সমাধান

লাইক এবং শেয়ার করুন

বাপ্পাদিত্য বসুঃ
প্রিয় বাংলাদেশ এখন স্রেফ আগুনের উপর দাঁড়িয়ে। ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের আগুন। বিপদ ঘনিয়ে আসছে চারদিক থেকে। এ বিপদ নতুন নয়। আগে থেকেই তার আঁচ লেগেছে। এখন তার রূপ পাল্টেছে মাত্র। ১৯৭১ এ সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে পরাস্ত করে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সার্বজনীন গণমুখী যে বাংলাদেশ জন্মেছিলো, আজ সে কোমায়। বিশেষ করে ৭/১ এর গুলশান এ্যাটাক আর ঈদের দিনে শোলাকিয়া এ্যাটাক বাংলাদেশের কোমাগ্রস্ত চেহারাকে চেনাচ্ছে বিশ্বের কাছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে এ সাম্প্রদায়িকীকরণের যাত্রা শুরু। বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যদিয়ে কার্যত বাংলাদেশকেই ওরা হত্যা করতে চেয়েছিলো। ওরা কারা? পাকিস্তানের প্রেতাত্মা সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ গোষ্ঠীরই সামরিক সংস্করণ। সে কালে সিংহাসনে ছিলো উর্দিধারীরা। আর পেছনে সরাসরি সেই জামাত, একাত্তরের পরাজিত শত্রু। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ আর ‘সমাজতন্ত্র’ বাদ দিয়ে তথাকথিত ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ আর ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ প্রতিস্থাপন, ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ এবং সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ দিয়ে তাদের মিশন শুরু। পাকিস্তান থেকে উড়িয়ে এনে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের গুরু গোলাম আজমকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন আর জামাতে ইসলাম তথা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুনর্বাসন করা হলো সেই যুগেই। আশির দশকেই ওরা নিশানা স্থাপন করলো শিক্ষাঙ্গনে। প্রগতিশীল রাজনৈতিক ছাত্রকর্মী হত্যার মিশন নিয়ে ওরা আঘাত হানা শুরু করলো। আটাশি’র ৩১ মে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ছাত্রনেতা জামিল আক্তার রতন হত্যায় প্রথম হাত রাঙালো। সে সময়ের হত্যার ধরন ছিলো ‘হাত-পায়ের রগকাটা’। জামাতের সশস্ত্র ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির নাম কুড়ালো ‘রগকাটা শিবির’। চলেছে অনেকদিন। ছিয়ানব্বইতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলো একুশ বছর পর। একা। কিছুই করা গেলো না। ২০০১, আবারও বিএনপি এলো, সাথে সেই জামাত। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে জামাতীরা এবার আবার আরো সশস্ত্র হয়ে উঠলো। একেবারে জঙ্গিবাদের রূপে। জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ, জাগ্রত মুসলিম জনতা, হরকাতুল জিহাদ, হিযবুত তাহরীর ইত্যকার নানা নামে।

পাল্টা লড়াই চললো। যুথবদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তি এক হয়ে লড়লো। চৌদ্দ দলের জোট হলো। জামাত-বিএনপি’র জোট আর অসাংবিধানিক অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল পার হয়ে দুই হাজার আটের ঊনত্রিশে ডিসেম্বরের নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরলো আওয়ামী লীগ, সাথে চৌদ্দ দল। এই নিয়ে টানা দুইবার ক্ষমতায়। কিন্তু দেশের চেহারা ফিরলো না। গুলশান আর শোলাকিয়া কাণ্ড দেশকে আরো ভয়াবহ কদর্য চেহারা দিলো। এই কি বাংলাদেশ?

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদা ছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এগোচ্ছে। ওয়াদা ছিলো বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাবার। ফিরলো না। মাঝে দুইবার সংবিধান সংশোধন হলো। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কিংবা ‘সমাজতন্ত্র’ ফিরলো না। বহাল রয়ে গেলো ‘রাষ্ট্রধর্ম’ আর ‘বিসমিল্লাহ’। উপরে জামাত কোণঠাসা, ভিতরে শক্তিশালী। এখানে ওদের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত। তার কেশাগ্রও স্পর্শ করা হলো না। বরং যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে সংঘটিত শাহবাগের তারুণ্যের বিস্ফোরণের বিপরীতে গজালো হেফাজতে ইসলাম। জামাতের ছাতার নিচে সব ধর্মান্ধ মৌলবাদী এখানে আশ্রয় নিলো। শেখ হাসিনার সরকার তাকে শুরুতে কঠোর হাতে দমন করলেও ভিতরে কিছু ইন্ধন রয়েই গেলো। হেফাজত জমি পেলো, টাকা পেলো, প্রকাশ্য সভা-সমাবেশের অধিকারও পেলো। সে চর্চা তাদের বহাল তবিয়তে। নীতিগত দ্বিচারিতা বটে।

হাসিনা সরকার দেশের প্রগতিশীল অংশের এমনকি তার সরকারের বামপন্থী শরিকদের আপত্তি না শুনে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোটে অংশ নিলো। এখন বলছে- মক্কা-মদিনার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী। সংবিধান তা সমর্থন করে না। কিন্তু শেখ হাসিনা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এদিকে সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও আবার প্রধানমন্ত্রী ‘যার পর নাই’ কঠোর। বয়ানে। কাজেও। এখানেও দ্বিচারিতা। ভুলে যাওয়া ভুল হবে যে এই সৌদি আরব কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো বঙ্গবন্ধু খুনের পর। আর আজকের বৈশি^ক জঙ্গিবাদের ব্রহ্মা-বিষ্ণু যে মার্কিন-সৌদি-তুরস্ক-ইসরাইল জোট- তা কে না জানে?

শাহবাগ প্রতিরোধের সময়ই বাংলাদেশ ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদের নতুন রূপ দেখলো। মুক্তচিন্তার ব্লগার-লেখকদের গুপ্তহত্যা শুরু হলো। চললো একের পর এক। শুরুতে সবাই ধরে নিয়েছিলো ‘নাস্তিক’ খুনের মিশন। খুনীদের তরফ থেকে প্রচারটা সে রকমই ছিলো। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের সময়ও উর্দুপন্থীরা আন্দোলনকারীদের ‘নাস্তিক’ ব্রান্ডিং করেছিলো। বাঙালি সে ফাঁদে পা দেয় নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সে প্রচার ছিলো। কাজ হয় নি। স্বাধীন বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে স্তব্ধ করতেও একই ‘নাস্তিকতা’র প্রচার ছিলো। কিন্তু এবার শেখ হাসিনা বোধহয় কিছুটা ফাঁদে পা দিলেন। তিনিও পাল্টা ধর্মকেই বর্ম করে নিলেন। লক্ষ্য ভোটের বাক্স। পপুলার মুসলিম ভোট পক্ষে রাখতে তিনি ঘোষণা দিলেন- ‘মদিনা সনদে দেশ পরিচালনা হবে’। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান তা বলে না। আরো একধাপ এগিয়ে অতি সম্প্রতিই তিনি বললেন- ‘মুক্তচিন্তার নামে নাস্তিকতা বা ধর্মদ্রোহিতার কাজ যারা করেন, যারা এ জাতীয় লেখেন, তারা মরলে দায় সরকার নেবে না’। ব্যাস। পালে হাওয়া পেলো উগ্রপন্থীরা। নির্বিচারে খুনের উৎসব শুরু হলো। ব্লগার থেকে শিক্ষক, লেখক থেকে প্রকাশক, হিন্দু পুরোহিত থেকে ভিন্নমতের মুসলিম উপাসক, সাধারণ শহরবাসী থেকে গ্রামের দর্জি, বিদেশি নাগরিক- কেউই আর বাদ পড়লো না। পুলিশের উপরও আঘাত এলো বারবার। সবশেষ ৭/১। গুলশান এ্যাটাক। সপ্তাহ না ঘুরতেই ঈদের দিন। শোলাকিয়া।

যারা ভাবছেন ব্লগার খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন হিন্দু খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন বৌদ্ধ খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন খ্রিস্টান খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন ইমাম বা মুয়াজ্জিন তথা ভিন্নমতের মুসলমান খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন শিক্ষক-লেখক-প্রকাশক খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন নিরীহ গ্রামবাসী খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন মুক্তমনা-মুক্তচিন্তক খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন পুলিশ খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন নাস্তিক খুনের মিশন, তারা ভুল করছেন।

আসলে এটা বাংলাদেশকে খুনের মিশন। আক্রান্ত তো আজ সারা বাংলাদেশ।

একেকটি খুন হয়ে যাচ্ছে আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন- ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। দেশে কোনো জঙ্গি নেই। হ্যাঁ, আমরা জানি, জঙ্গি উপস্থিতি প্রমাণে সক্ষম হলেই একটা জুজুর ভয় আছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। তারা তাদের ‘সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো’ নীতি অবলম্বন করে এখানে আগে জঙ্গি উপস্থিতি প্রমাণ করতে চায়, পরে তাদের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী বৈশি^ক যুদ্ধ’ চাপিয়ে এখানে ঘাঁটি গাড়তে চায়। বাংলাদেশের বদ্বীপ তাদের জন্য ভূ-রাজনৈতিক কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিস্তীর্ণ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে এই ভূমি বেশ সুবিধাজনক স্থান। সেকথা শেখ হাসিনার চাইতে ভালো আর কে বোঝেন? কিন্তু তাই বলে ‘জঙ্গি নেই’ বলে চিৎকার করে তো আর সত্যকে লুকিয়ে রাখা যাবে না। আর লুকিয়ে রেখে সমস্যার মূলোৎপাটনও সম্ভব না। তাতে লাভ সেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদেরই। গুলশান এ্যাটাকের পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনা পাঠানোর প্রস্তাব তো সেই সত্যেরই প্রমাণ দেয়।

তাই যারা ভাবছেন এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চালাবেন তারা ভুল করছেন। যারা ভাবছেন জামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধ না করে কৌশলে হাতে রেখে ক্ষমতা পোক্ত করবেন, তারা ভুল করছেন। আবার একটি রাজনৈতিক ও সুশীল নামধারী গোষ্ঠী আছেন যারা ভাবছেন বিএনপি-জামাতের জন্য গণতন্ত্রের স্পেস করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে, তারাও ভুল করছেন। কারণ গুলশান এ্যাটাকের পরপরই একে ‘রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান’ উল্লেখ করে খালেদার বিবৃতিই তার আসল চেহারা পরিষ্কার করেছে।
আসলে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির দৃঢ় ঐক্য আর তার সাথে জনতার দৃঢ় সংশ্লেষই একমাত্র পারে এই মহাসংকট ও আক্রমণের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে। সাময়িক কোনো আপোসের পথে সমাধান নেই। বিচ্ছিন্ন বলে চোখ বন্ধ রাখাতেও সমাধান নেই। মদিনা সনদ কিংবা ধর্মের বর্ম গায়ে জড়িয়ে ধর্মান্ধ এই অপশক্তিকে নিরস্ত্র করা যাবে না। দৃঢ় ঐক্য, ‘অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নীতির প্রতি কঠোর একাগ্রতা, চলার পথের ঋজুতা আর জনতাকে আশ্রয় করেই আসবে একমাত্র সমাধান। না হলে বাংলাদেশকে আগুনের মধ্য থেকে বের করে আনা যাবে না।

আর জানি, এই বাংলাদেশ পরাজয় স্বীকার করে না। এই বাংলাদেশ জয়ী হবেই।

লেখকঃ প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী; নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক নতুন কথা 


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ