,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

এটা একটা ব্যাধি, পুরুষ জন্মের ব্যাধি

লাইক এবং শেয়ার করুন

 

(১)
একই কাজ করে বা একই মাত্রার দক্ষতা দেখিয়ে একজন নারী আমাদের এখানে একজন পুরুষের সমান সাফল্য বা মর্যাদা পায় না। এই কথাটি কি সত্যি নয়? অবশ্যই সত্যি। আমরা সকলেই জানি যে এই কথাটি একটি সত্যি কথা। এই কথাটির সত্যটা আরো স্পষ্ট হয় যখন একজন নারী আফসোস করে এই কথাটি বলেন আর আমাদের পুরুষবাদী সাহেবেরা সেকথা শুনে চিড়চিড় করে গালাগালি শুরু করে দেন। আপনারা কি সম্প্রতি এই বিষয়টি লক্ষ্য করেননি? আমি ব্যাপারটি ব্যক্তিগতভাবে অভিজ্ঞতা পেয়েছি।

তসলিমা নাসরিন এইরকমই একটা কথা বলেছেন প্রথমে ওঁর ফেসবুকের ওয়ালে। পরে সেটাই আরেকটু বিস্তৃত করে একটা কাগজে লিখেছেন। এখন, তসলিমা নাসরিন একটা কিছু লিখেছেন, সেখানে তিনি এনালজি টেনেছেন নিজের কাজের সাথে অন্যান্য লেখকদের কাজের সাথে, আর যায় কোথায়। আমাদের ‘ভদ্রলোকেরা’ খেপে গিয়ে রেগে গিয়ে চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু করে দিয়েছেন। আর তসলিমার বিরুদ্ধে আমাদের ভদ্রলোকেরা যখন রেগেমেগে কিছু বলতে থাকেন তখন ওরা কিরকম ভাষা আর কি সব কথাবার্তা বলেন সে তো অনুমানই করতে পারেন। নিরেট ব্যক্তিগত আক্রমণ। আর আপনি যদি সেখানে তসলিমার পক্ষে কিছু বলতে যান, আপনাকেও গালাগালি খেতে হবে।

আপনার কি কখনো মনে হয়েছে যে এটা আসলে একটা ব্যাধি? শুধু মওকা পাওয়া অপেক্ষা মাত্র, তসলিমাকে দুইটা গালি দেওয়া বা তসলিমাকে ‘গুরুত্বহীন’ লেখক বলে খারিজ করে দেওয়ার চেষ্টা- এইটা একটা ব্যাধি। আমার এইরকমই মনে হয়। এই ব্যাধির উৎসও আমি অনুমান করতে পারি। এই ব্যাধির উৎস হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শত বছর ধরে রাখা আমাদের মানে কিনা পুরুষদের মগজে পুষে রাখা শভিনিজম। আমার পুরুষরা ইয়া বড় একটা নারীবিদ্বেষী নাক নিয়ে জন্ম গ্রহণ করি এবং শৈশব থেকে সে নাকটি আমাদের কেবল উঁচুই হতে থাকে। মগজের গভীরে প্রোথিত এই নাকটি যদি কারো যথেষ্ট উঁচু না থাকে, আমরা মনে করি ওর পৌরুষই নাই।

এইযে নাকটি, বা মেল শভিনিস্ট ইগোটি, তসলিমা এটিকে আঘাত করেন। শুধু তসলিমা নন, সকল নারীবাদী এমনকি নারীবাদী নন এমন সফল নারীরাও আমাদের এই নাকটিতে আঘাত করেন। তসলিমা যেহেতু বাঙালী পুরুষের এই নাকটিতে ক্রমাগত আঘাত করেই যাচ্ছেন করেই যাচ্ছেন আর করেই যাচ্ছেন, এইসব আঘাতে আমাদের বাঙালী মধ্যবিত্ত পুরুষদের এই নাকটিতে এখন একটি তসলিমা-ক্ষত হয়ে গেছে। এই ক্ষতটিই একটি নিরাময় অযোগ্য ব্যাধিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই ব্যাধি আক্রান্ত পুরুষরা যখনই তসলিমার নামে শুনে ওদের সেই ক্ষতে তখন প্রদাহ শুরু হয়ে যায়। ওরা যেসব গালাগালি করে, সেগুলি আসলে সেই প্রদাহেরই উদ্গারন।

(২)
তসলিমা কি ভুল কিছু বলেছেন? তসলিমা যতটুকুই লিখেছেন, যাই লিখেছেন, তার জন্যে তাকে সারা জীবন ধরে কিরকম নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছে সে কি আপনারা জানেন না? হাজার হাজার মিছিল করে ওঁকে মারতে গেছে, ওঁর কল্লার জন্য পুরস্কার ঘোষণা হয়, বইমেলায় ওকে লোকে খুন করতে যায়। দেশ ছেড়ে থাকতে হচ্ছে বছরের পড় বছর। এইগুলি তো হচ্ছে প্রত্যক্ষ আক্রমণ। সেই সাথে যোগ করেন আমাদের সমন্বিত পুরুষ সমাজের ক্রমাগত মৌখিক আর লিখিত আক্রমণ, গালাগালি আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা। আপনি কি মনে করেন তসলিমা নারী না হলে ওঁকে একই লেখার জন্যে একই মাত্রায় আক্রমণ করা হতো? আমার মনে হয় না।

আমার মনে হয় না একই রকম লেখার জন্যে আমার বীর পুরুষ সমাজ একজন পুরুষ লেখককে একই মাত্রায় আক্রমণ করতো। তসলিমা নারী বলেই আমরা বেশী বিরক্ত হই। একটা মাইয়া মানুষ, তার এত সাহস? বা মেয়ে মানুষ হয়ে তোর এইসব বলার দরকার কি? আমাদের ইগোতে লাগে। তসলিমা যখন নারীর অধিকারের কথা বলেন তখন তিনি সেটা স্পষ্ট করে বলেন এবং আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলেন। আমরা বিরক্ত হই। এইসব প্রসঙ্গে তসলিমাকে যারা বিরোধিতা করেন, ওদেরকে তো দেখিনা খুব একটা যুক্তি তর্ক দিতে। স্রেফ গালি দিয়ে ওঁকে খারিজ করে দিতে চায় আর বলে, তসলিমা সব না জেনে বলছে। ও ভাই, তসলিমা যদি ভুল বলেন, ঠিক কথাটা কি আমাকে বলেন, ওঁকে গালি দেন কেন?

আর তসলিমা কিনা তার ব্যক্তিগত জীবনযাপন প্রেম ভালোবাসা এইসব খোলামেলা বলে দেন। আর তাতেও পুরুষ সাহেবেরা রেগে যান আর রেগে গিয়ে ওঁকে গালিগালাজ করতে থাকেন। কেন ভাই? তসলিমার জীবন তসলিমার নিজের ব্যাপার। তিনি কোন পুরুষের সাথে বিছানায় যাবেন আর কোন পুরুষের সাথে টেলিভিশনে যাবেন নাকি আরেকজন নারীর সাথে যাবেন সেটা তাকেই নির্ধারণ করতে দেন। আপনি আপনার পছন্দ অপছন্দ আপনার কাছেই রাখেন। আপনার নৈতিকতা বোধ আপনার, সেটা দিয়ে তসলিমা বিচার করার আপনি কে? তিনি কি আপনার বিশেষ অঙ্গটি ব্যাবহার করতে চেয়েছেন? নাকি আপনাকে কামনা করে হায় হুতাশ করেছেন? যতক্ষণ না তিনি আপনার কোন অঙ্গের দিকে হাত বাড়াবেন ততক্ষণ পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত জীবন বা বেডরুম জীবন নিয়ে কিছু বলার অধিকার আপনার নাই।

প্রতিটা মানুষের অধিকার আছে নিজের মত জীবন যাপন করার। আমি একজন সাবালক মানুষ নিজের বেডরুমে আমি যা খুশী তাই করবো, সমাজে বা রাষ্ট্রের তাতে কিসসু বলার অধিকার নাই।

(৩)
কিন্তু আমাদের পুরুষেরা রেগে যায়। আমরা কিনা পুরুষ, আমরা একাধিক নারীতে গমন করবো। আবার সেই কথা বুক ফুলিয়ে বন্ধুদেরকে শোনাবোও। প্রয়োজনে টাকা দিয়ে যৌন সেবা গ্রহণ করবো। নারী কেন এরকম করবে? নারীকে চুপ থাকতে হবে। এইটাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। কেননা নারী পুরুষের মিলনকে আমরা পুরুষরা আসলেই দুইজনের ব্যাপার মনে করিনা। আমাদের কাছে শারীরিক মিলন জিনিসটা হচ্ছে নারীকে ভোগ করার ব্যাপার। নারী হচ্ছে একটা খাওয়ায়র জিনিস- সে কেন কথা বলবে। নারীকে আমরা যখনই আহবান করবো সে আমাদের বিছানায় আসবে, ব্যাস।

তসলিমা তো সেই জিনিস না। তিনি কথা বলবেন। অধিকারের কথা তো বলবেনই, নিজের জীবনের কথা, নিজের ভালোলাগার কথা, মন্দ লাগার কথা, প্রেম ও অপ্রেমে মিলনের কথা তিনি বলবেন। তার ভাষায় তার স্টাইলেই বলবেন। এই জিনিস পুরুষের সহ্য হবে কেন? সহ্য হবে না। আমরা মুরগি পছন্দ করি, মুরগি খাই, কিন্তু মুরগি আমাদের সমান লেভেলে এসে কথা বলবে সেটা কি সহ্য হবে? হবে না। সুতরাং তসলিমার জন্যে বরাদ্দ গালাগালি আর হুমকি।

কয়েকদিন আগে এক অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক খুব বাজে ভাষায় তসলিমাকে গালাগালি করছিলেন ফেসবুকে। আমি সবিনয়ে বললাম, ভাই গালি দেন কেন? তিনি রেগে গেলেন। এরপর আরও কয়েক দফা পোস্ট, কয়েক দফা গালাগালি। এখানে তিনি তার এক বন্ধুর নাম করে বললেন, যে বন্ধু নাকি তাকে তসলিমার সাথে কোন এক বইমেলায় পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তবে তসলিমার সাথে ঐ হাই হ্যালো পর্যন্তই, আর কোন বিশেষ কথা হয়নি। এর পরে যেটা বললেন সেটা বড় কৌতুকের কথা। সম্পাদক ভাইজান বেশ ইয়ে করে লিখছেন, ‘ভাগ্যিস, আমার উপর তসলিমার নজর পড়েনি সেদিন’। আমি তো পড়ে হাসতে হাসতে পেটে খিল। সম্পাদক ভাইজান কি নিজেকে একটা রসগোল্লা মনে করেন? আমি আনফ্রেন্ড করার পর তিনি খুব রেগেমেগে দুইচারটা কড়া কথা লিখে আমাকে ব্লক করে দিলেন। আলহামদুলিল্লাহ্‌।

(৪)
না, সেই সম্পাদক বা আমার অন্যান্য বন্ধু যারা তসলিমাকে সুযোগ পাওয়া মাত্র কাছা খুলে (নাকি বলবো প্যান্ট খুলে!) গালাগালি করেন, ওদের উপর আমি আলাদা করে রাগ করি না। ঐ যে শুরুতেই বলেছি, এটা একটা ব্যাধি। পুরুষ জন্মের ব্যাধি। নারী আমাদের সমান হবে, আমার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে এটা এই ব্যাধিগ্রস্তরা সহ্য করতে পারেন না। এদের দোষ নাই, নারীকে সমান জেনে সম্মানের সাথে মুখোমুখি দাঁড়াতে এরা ভয় পায়, সেই থেকেই ওদের রাগ। নারী জোর গলায় স্পষ্ট করে কথা বললে ওদের নিজেদের ক্ষুদ্রতা বেরিয়ে পরে, ঐটাই ওদের রাগ।

আর কার উপর রাগ করবেন- এই ব্যাধিতে আক্রান্ত কে নয়? আশেপাশে দেখেন, একেকটা চেহারা দেখলে নাম শুনলে চমকে উঠবেন।

ইমতিয়াজ মাহমুদ এর ফেসবুক থেকে


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ