,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

বই আলোচনা: হেলাল আনওয়ারের “মনু মাঝি” – মুস্তাক মুহাম্মদ

লাইক এবং শেয়ার করুন

হেলাল আনওয়ার মূলত একজন কবি। এই বছর একুশে বই মেলাই তাকে আমরা নতুন রূপে আর্বিভূত হতে দেখলাম । গল্পকারের ভূমিকা নিয়ে আর্বিভূত হয়েছেন তিনি। “মনু মাঝি” তার গল্পগ্রন্থের নাম। এতে আটটি গল্প মলাটবদ্ধ হয়েছে। গ্রন্থটিতে মনু মাঝি শিরোনামের গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র মনু মাঝি। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লিখিত গল্পটি। মনু মাঝি কপোতাক্ষের বুকে খেয়া পার করাকে ব্রত মনে করে। দায়িত্বে কখনো অবহেলা করে না সে। সারাদিন খাটুনের পর একটু ঘুমাতে যায়।স্ত্রীর ডাকে তার মাঝ রাতেই ঘুম ভাঙে।কোনো একদল লোক পার হবে তাই চিৎকার দেয়। মনু মাঝি ছুটে যায়- স্ত্রীর বাধা উপেক্ষা করে। স্ত্রীকে সে প্রচণ্ড ভালোবাসে, মেয়ে আখিকে ও ভালোবাসে। কিন্তু দায়িত্বকে আরও বেশি ভালোবাসে মাঝি। সেই সময় মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। মনু বুঝতে পারে জীবন বাঁচানোর জন্য কেউ হয়তো তাকে ডাকছে।  সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে অনেক সুযোগ সন্ধানী মানুষেরা লুটপাত করতে থাকে। মানুষদের অত্যাচার-লুটপাট , ঘর হারা করতে থাকে ।মনু মাঝি সেদিকে নজর না দিয়ে দেশের টানে ঘরে স্ত্রী সন্তান ফেলে যুদ্ধে যায়। প্রকৃত পক্ষে মনু মাঝি একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু  দেশ স্বাধীন হলে সেই ত্যাগী গাজী – শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কি সঠিক মর্যাদা আমরা দিতে পেরেছি, পারেনি। বরং সেই অত্যাচারী রাজাকার ক্ষমতা দখল করে আছে। স্বাদীনদে েএকাত্তএরর অত্যাচারীরা মন্ত্রীর গাড়িতে চড়ে আর লুনঠনকারীরা।  মুক্তিযোদ্ধারা মানবেতর জীবনযাপন করেছে। স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর পরেও আমরা সংবাদ পত্রের শিরোনাম দেখি- অমুক মুক্তিযোদ্ধা  ভিক্ষা করছে, চিকিৎসা পাচ্ছে না। আমরা তাহলে কি কৃতজ্ঞ জাতি?

আলেয়া গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আলেয়া। জীবন সংগ্রামে এক সংগ্রামী নাম। পিতা হারায়ে সংগ্রাম করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থা আলেয়াদের সঠিক ভাবে বাঁচতে দেয় না। তারা নানা ভাবে তাদেরকে দুমিয়ে রাখতে চাই। গ্রামে পেটে ভাতে কাজ জোটে না।  ‍জুটলেও নির্যাতন। কাজের খোঁজে আলেয়া শহরে যায়। সবজি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে । বহু কুপ্রস্তাব এসেছে কিন্তু  নৈতিকতায় বলীয়ান আলেয়া হার মানে নি।মা ভাই –বোনকে নিতে এলে গ্রামের মাতুব্বারের কুদৃষ্টিতে পড়ে আলেয়া। বিচারের নামে প্রহসন চালালেও আলেয়া নৈতিক চরিত্রর জোরে হার মানেনি। কিন্তু তাকে রাতের আঁধারে শহরে পালিয়ে যেতে হয়েছে।  আমাদের সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তন করা দরকার। আলোয়াদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব। মানুষের মৈালিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

“ছাড়পত্র” গল্পে গ্রাম্য বালিকা বধূ মমতার কষ্টের কথা বলা হয়েছে। আসাদ তার স্বামী। দীর্ঘদিন ঘন সংসার করার পরেও তাদের সন্তান হয় না। মমতা শ্বশুড়- শামুড়ির সেবা – যত্ন করে মন জয় করেছে। তাকে নিয়ে তার শ্বশুড় গর্ব করে। আসাদ শহরে য়ায়।  কিন্তু মমতার কোনো খোঁজ খবর নেই না। তবু বাঙালি বধু সহ্য ক্ষমতা অনেক। এক সময় আসাদ তাকে ছাড়পত্র দিয়ে দেয়। তখন কারোর আর কিছু যেনো করার থাকে না।  মমতা অজানা পথে পাড়ি দেয়।দোষ কার সে বিচার সমাজ করে না। সন্তান না হবার জন্য স্বামীও দায়ী হতে পারে কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থা শুধু নারীকে দায়ী করে। তাকে  নির্দোষ প্রমাণ করার আগেই শাস্তি দিয়ে দেয়। আর কত মমতাদের ঘর ভাঙবে বিনা দোষে? আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন অত্যাশয় আবশ্যক।

 “ভ্রম ও সম্বিত” গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র শিহাব নামক এক ছাত্র। তার মাকে অনেক আগে তার বাবা ত্যাগ করেছে। শিহাবকে তার মা খুব কষ্ট করে লেখা পড়া শিখিয়ে মানুষ করেছে। শিহাব তার বাবাকে কখনো দেখিনি। বাবা তাের দায়িত্ব পালন করেনি।সে কারণে বাবাকে সে প্রচণ্ড ঘৃণা করে। চাকরী পেয়ে বাড়ি আসার পথে এক ভিক্ষুককে করুণ অবস্থায় দেখে শিহাব তাকে কিছু খেতে দেয়।ভিক্ষুক বাবার কথা বললে শিহাব রেগে যায়। পরদিন লোক মারফত খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে দেখে সেই ভিক্ষুকই শিহাবের বাবা। বাবার প্রতি শিহাবের রাগ আর থাকে না। সে য়ে জন্মদাতা পিতা।

            “লাশ” গল্পে তিনজন প্রফেশনার কিলার একজন মানুষকে হত্যা করে আর একজনের উপরে হত্যার দায় ভার চাপিয়ে দিতে চাই । কিন্তু সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না। তাদের বিবেক দংশন করতে থাকে। একটু রহস্য ময়তা সৃষ্টি করেছেন গল্পকার মৃত মানুষকে ফিরিয়ে এনে। আসলে মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা নয় মূলত কিলারদেন মানবিক আত্নাটাকে জাগ্রত দেখাতে চেয়েছেন গল্পকার। রূপকের আড়ালে গল্পের কাহিনী এগিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত কিলাররা বিবেকের কাঠগোড়ায় অপরাধী হয়েছে।

            “দোলা” গল্পের প্রধান চরিত্র সোহেল নামক একজন চাকুরীজীবী । যাকে তার মা কষ্ট করে লেখা পড়া শিখিয়েছে।  এখন সোহেল শহরে থাকে। চাকুরী কলর কিন্তু মায়ের জন্য তার মন খারাপ হয়। তাই সে ছুটে গ্রামে আসে। গ্রামে তার মাকে সঙ্গ দেয় রওথী নামক একটি মেয়ে। মার নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য; রওথীকে বিয়ে করার জন্য মায়ের প্রস্তাবে সোহেল রাজি হয়ে যায়। মাও খুব খুশি হয়। কিন্তেু বর্তমান অনেক ছেলে আছে যারা বিয়ে করতে চাই না। আর বিয়ে করলেও স্ত্রীকে নিয়ে শহরে থাকে। মায়ের যে কষ্ট সে কষ্ট থেকে য়ায়। এ দিক থেকে সোহেল আদর্শ ছেলের কাজ করেছে। গল্পের কাহিনীটি আরো শাখা প্রশাখা ‍বিস্তার করা সুযোগ লেখকের ছিল।  কিন্তু তিনি সে সুযোগ গ্রহণ করেননি।

“বিশ্বাস” গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বুনোগাজি। সে সম্পাদ গড়েছে ন্তিু ভোগ করতে পারে না কৃপনতার জন্য। তার স্ত্রী- সন্তানেরাও তার মত কৃপন। কিন্তু স্ত্রী জামেলা টাকার ক্রপনতার জন্য বিনা চিকিঃসায় মারা যাবার পরে সম্বিত ফিরে পায় বুনোগাজি। কষ্টে গড়া সম্পাদ সে ভোগ করতে পারে না। বয়েস বাড়ার সাথে সাথে সে মূল্যহীন হয়ে যায়। ছেলেরা তাকে দেখে না। তার সম্পাদ তাকে দেখে না। তার দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ভেঙে গেছে। মানুষের সম্পাদ বলতে কিছু নেই। যা আছে তার তার মহৎ কর্ম।কিন্তু বুনোগাজিদের সম্বিত ফিরে পেতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তখন আর কিছু করার থাকে না।

“শ্রদ্ধা” গল্পটি ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে রচিত। শ্যামল এবং সজীব কেন্দ্রীয় চরিত্র। অসাম্প্রদায়িক চেতনার শ্যামল মুসলিমদের অনুষ্ঠানে আসে। সজীবের সাথে বন্ধুত্ব রেখে চলে।  তার কিশোর  মন সাম্প্রদায়িকতা – (হিন্দু- মুসলিমদের দ্বন্দ্ব) বিপক্ষে কাজ করে। হিন্দু ধর্মের অনেক গোড়ামী- অসাড়তা উঠে এসেছে শ্যামলের কথায়।কিন্তু আমাদের সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হবে। কোনো ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ না রেখে শ্রদ্ধা রাখায় প্রকৃত ধর্ম।

হেলাল আনওয়ারের গল্পের স্থান মূলত কপোতাক্ষ নদ অববাহিক অঞ্চাল। এই অঞ্চলের মানুষের বর্তমান যাপিত আচার- আচারণ ফুটে উঠেছে গল্পগুলোতে। গল্পের কাহিনী- চরিত্রগুলো আমাদের চেনা জানা । আমাদের আশে পাশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে।প্রতিটি গল্প নৈতিকতার ফ্লেভারে পরিপূর্ণ।  যা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বোধ সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে।

বইটির প্রচ্ছদ করেছেন মিজানুর রহমান। প্রচ্ছদটি সুন্দর। কিন্তু ফুলের ছবি দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক- বেমানান বলে মনে করছি। বইটি প্রকাশ করেছে- সমুদ্র প্রকাশনী, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ: বইমেলা, ফেব্রুয়ারি- ২০১৭,দাম: একশত টাকা মাত্র।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ