,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

সাহিত্যের সংস্পর্শ ছাড়া আমি এক মুহূর্তও বাঁচতে পারবো না ।। শীতল বোরহান

লাইক এবং শেয়ার করুন

আপনার তো প্রথম বই প্রকাশ হতে যাচ্ছে। নিজের বই নিয়ে অনুভূতি কী?

হ্যাঁ, এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলাতেই প্রকাশিত হচ্ছে আমার প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘অন্ধের দিনলিপি’; তাও সম্ভব হতো না—যদি না জায়েদ হোসাইন লাকী ভাই আমার এই বই প্রকাশের সবটুকু খরচ নিজে বহন না করতেন এবং রবীন ভাই আমার প্রতি নির্মল ভালোবাসা না দেখাতেন। আর অনুভূতি—মনে হচ্ছে, আমার সন্তানগুলি মায়ের গর্ভে আর তার মা সন্তান প্রসবের যন্ত্রণায় ছটছট করছে! যত দ্রুত এবং যত মঙ্গলভাবে ভূমিষ্ট হবে তবেই যেন বাঁচি।

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

আমার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে নিদারুণ কষ্টে আর হাহাকারে। তিনবেলা রান্নার বাজার কখনওই করতে দেখেনি বাবাকে। এমনও হয়েছে সকালে কোনোভাবে খেয়েছি, দুপুরে খাইনি; রাতে বাবা বাজার করে এনেছে তবেই আগুন জ্বলত আমাদের চুলোয়। তো সেইসময় খুব করে চাইতাম, বড় হয়ে খুব টাকা কামাবো—যাতে অভাব-অনটন, দুঃখ, হাহাকার আমাদের আর স্পর্শ করতে না পারে।

আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে মানে কতোদিন ধরে লেখালেখি করছেন?

যদি প্রকৃত অর্থে বছর গুণে বলি তবে বলব আমার লেখালেখির বয়স এগারো গিয়ে বারো বছরে পা দিয়েছে। এই বারো বছর ধরেই লেখালেখি করছি; এবং তার চেয়ে বেশি অধ্যয়ন।

আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে বলে মনে হয়?

ছোটবেলার ওইসব সাময়িক বিষাদগ্রস্থতার কঠিন মুহূর্তগুলি ভুলে থাকার জন্য যখন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না; তখন পাশের বাড়ির এক বড়ভাইয়ের একটা রেডিও ছিল, সে সবসময় বাঙলাদেশ বেতারের বিভিন্ন সংগীতমালাগুলি গভীর আগ্রহভরে শুনতো এবং নিয়মিত বেতারে চিঠি পাঠাতো। নানান ছলে ভিড়ে তার সঙ্গে সঙ্গে আমিও শুনতাম; এবং একটা সময় আমিও চিঠি পাঠাতে শুরু করি। আর এভাবেই মূলত আমার লেখালেখির শুরু।

আপনি কি শেষ পর্যন্ত কবি হতে চান নাকি অন্যকিছু?

বেশ কঠিন একটা প্রশ্ন করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কবি হতে চাই কিনা সেটা এখন এই মুহূর্তে বলতে পারব না; তবে এটুকু বলতে পারি, কবিতা কিংবা সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে সাহিত্যের সংস্পর্শ ছাড়া আমি এক মুহূর্তও বাঁচতে পারব না।

আপনার কাছে কবিতা কী?

আমার কাছে কবিতা হলো, নিদ্রাহীন রাতে নিদ্রাকাতরতা ভুলে থাকার একমাত্র অবলম্বন। প্রিয়ংবদা হাজার লক্ষ মাইল দূরে থেকেও তাকে মুহূর্তেই ভাব-কল্পনায় তুমুল আনন্দ-উৎসবে পাইয়ে দেয়ার একটা হাতিয়ার। আমার কাছে কবিতা মানেই ‘দুমুঠো ডালভাত সঙ্গে শুকনো মরিচের আলুভর্তা’ আর ‘স্বস্তির শেষ আশ্রয়’।

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

যদিও ঈশ্বরে বিশ্বাস আমার কোনোকালে ছিল কিনা সন্দেহ—তারপরও কেন জানি মনে হয়, কবিতার পঙক্তিগুলি সম্পূর্ণভাবে ঐশ্বরিকভাবে কারোর ওপর নাজিল হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি তো ভাবছিই; অথচ সে নিয়ে লেখার মতো একটা শব্দও মাথায় আসছে না। আবার হঠাৎ করে এমনভাবে আসতে শুরু করেছে যে লিখে শেষ করতে পারি না।

বিশেষ কারও কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যের লেখা কম-বেশি সবই পড়েছি। তবে কবিতায় জীবনানন্দ, রবি ঠাকুরের ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের প্রায় সবগুলি কবিতা এবং হুমায়ুন আজাদের কবিতাগুলি আমাকে খুব বেশি টানে। এখনও সময় পেলেই হুমায়ুন আজাদের কবিতা পড়তে বসে যাই।

আপনার নিয়মিত কার কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে, কেন লাগে?

ভালো লাগাটা নিজের আপেক্ষিক বিষয়। বর্তমানের অগ্রজ কবিদের মধ্যে আল মাহমুদ, জয় গোস্বামী, দুখু বাঙাল, মারজুক রাসেল, মুজিব ইরম এবং জায়েদ হোসাইন লাকী ভাইয়ের কবিতা সময় পেলেই পড়ার চেষ্টা করি। যদিও কবিতা পড়ে কখনওই কবিতা লেখা যায় না; তবে এঁদের কবিতা পড়লে মনে হয় নতুন কিছু একটা যেন পেয়েছি।

কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

আমরা যে খুব ভালো একটা সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি—এ কথা বুকে হাত দিয়ে বলার মতো দুঃসাহস হয়তো কারোরই হবে না; আবার এ কথাও উড়িয়ে দেয়া যাবে না যে দেশ ও দেশের মানুষ আগের থেকে অনেক উন্নতি করেছে। তবে এতকিছুর মাঝেও কিছু ফারাক থেকে গেছে; কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত ঘটনা আমাদের দেশ ও জাতিকে নানাভাবে করেছে কলঙ্কিত, ছোট। কাজেই একজন শুদ্ধ কবির কাজ হচ্ছে দেশ ও তার পরিমণ্ডলের যাবতীয় কিছুকে লেখনীর মধ্যে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে আমাদের এই বাঙালি জাতি নিয়ে বিশ্ব-দরবারে বীরের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।

আপনার সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

সমকালীন কবিদের মধ্যে রাসেল রায়হানের কবিতা আমি নিয়মিত পড়ি। খুব সহজ ভাষায় সে অসাধারণ সব কাব্যসৃষ্টি করে ইতোমধ্যে মুনশিয়ানার পরিচয় দিতেও সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও শিমুল সালাহ্উদ্দিন, সাইয়েদ জামিল, শারদুল সজল এবং ডাল্টন শৌভাত হেরা’র কবিতার নিয়মিত পাঠক আমি। অনুজদের মধ্যে শফিকুল রাজুর কবিতাও আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

এই সময়ে যারা কবিতা লিখেন তাদের কবিতা বিষয়ে বলেন। তাদের অনেকের মাঝে কি স্টান্টবাজি লক্ষ করেন না?

এ কথা অস্বিকার উপায় নেই যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে কেন্দ্র করে এখন অনেকেই সাহিত্যচর্চা করার চেষ্টা করছেন। একদিক থেকে এর ভালো দিকও যেমন আছে ঠিক তেমনি মন্দ দিকটাও খুব সহজভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। কিন্তু যখনই দেখি একজন ব্যক্তি সাহিত্যের স-ও  বুঝে উঠতে পারেনি এখনও কিন্তু তার নামের আগে ঠিকই কবি অমুক, কবি তমুক—তখন নিজেকে ধিক্কার দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। সাহিত্য হচ্ছে প্রচুর অধ্যয়নের বিষয়, ধ্যানের বিষয়। সেখানে দুচারটা উপন্যাস কিংবা দশ-বিশটা কবিতা পড়ে কবি বনে যাওয়া কস্নিনকালেও সম্ভব না। আপনি মুজিব ইরম ভাইয়ের ‘কবিবংশ’ কাব্যগ্রন্থটির দিকে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন যে কবিতা বা সাহিত্য সৃষ্টির জন্য ঠিক কী পরিমাণ অধ্যয়ন আবশ্যক। আর হ্যাঁ, অনেকের মাঝেই স্টান্টবাজি জিনিষটা লক্ষ্য করি। কিন্তু সেসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী লাভ, বলুন। খারাপদের দল সবসময়ই বড় থাকে এবং তা আজও বর্তমান এমনকি তা ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে যতটা সম্ভব এদের থেকে নিজেকে দূরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

দশক বিভাজন বিষয়ে আপনার মত কী?

কে কীভাবে নেবে জানি না, তবে দশকটাকে আমি কখনওই মন্দভাবে নিইনি; নেবোও না। আমরা যারা শূন্য দশক থেকে  লেখালেখি করছি, আজ থেকে চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ বছর পর পেছনপানে তাকালে অবশ্যই দশককে এড়িয়ে যেতে পারবেন না।

শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে পুরস্কার প্রকৃতপক্ষে কি কোনো ভূমিকা রাখে?

যে কোনো কাজের একটা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেলে আরেকটা বাড়তি উৎসাহ, উদ্দীপনা আলাদাভাবে কাজ করে। আর আমার কাছে কেন জানি মনে হয় বিশেষত কবিরা একটু বেশিই আর্থিক টানাপোড়নের মধ্যে তাঁদের দিন অতিবাহিত করে থাকেন। কাজেই শিল্প-সাহিত্যে পুরস্কার দেয়াটা আমার কাছে মঙ্গল কিছুই বয়ে আনে।

সবশেষে আপনি আপানার এমন একটা স্বপ্নের কথা আমাদের বলেন, যেটা বাস্তবায়ন করতে আপনার চেষ্টা আছে।

মাস তিনেক আগে আকর্ষিকভাবে বাবার চলে যাওয়ায় পুরো সংসারটা এখন আমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যতটা পারছি সংসারের জন্য করে যাচ্ছি। ছোট ভাই আতিক কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয় নিয়ে স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে এবং ছোটবোনটিও একই বিষয় নিয়ে ইডেন কলেজে স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। আমি চাই ওরা পড়াশোনা শেষ করে মায়ের মুখে হাসি ফুটাক। এবং এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমি যতটা পারি একাগ্রচিত্তে করে যাবো। আর মায়ের মুখে হাসি ফুটানোর চাইতে বড় কোনো কাজ পৃথিবীতে আছে বলে আমার মনে হয় না। স্বপ্ন বলতে আমার এটুকুই।

<

p style=”text-align: right;”>–কথাবলি থেকে


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ