,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

দিদি ভাল হয়ে উঠুন ।। সুকুমার মিত্র

লাইক এবং শেয়ার করুন

মহাশ্বেতা দেবীর লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় কলেজ জীবনে। ‘অরণ্যের অধিকার’ এক নিঃশ্বাসে পড়েছিলাম। বলা যায় অরণ্যের অধিকার আমার পড়ার চোখ ও মন তৈরি করে দিয়েছিল। তারপর থেকে তাঁর লেখা গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রিপোর্টাজ, কলাম নিয়মিত পাঠক। মহাশ্বেতা দেবী সম্পাদিত বর্তিকার বিশেষ সংখ্যা পড়া ও সংগ্রহ রাখা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। বর্তমান পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হল, মহাশ্বেতা দেবীর কলাম বেশ জনপ্রিয়। তারপর আজকাল-এ অবিরাম লিখেছেন। আর কত যে লিটল্ ম্যাগে লিখেছেন তার কোনও ইয়ত্তা নেই। তবে চুনী কোটালের মৃত্যুর পর তাঁর লেখনি ও লড়াই-এ আমরাও শরিক হয়ে গেলাম।

খেড়িয়া শবরদের ‘অপরাধী উপজাতি’ তকমা লাগানো ‘পুরুলিয়া পুলিশ কোড’ –এর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই করে সেই তকমা প্রত্যাহারে বাধ্য করা নয়, খেড়িয়া শবরদের সমাজে সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে সাক্ষারৎ কথা বলার সুযোগ, পরিচয় থেকে পরিবারের একজন হয়ে ওঠা ১৯৯৩ সালে। তখন দিদি থাকতেন ১৮ নম্বর বালিগঞ্জ স্টেশন রোডের ভাড়া বাড়িতে। লোহার ঘোরানো গোল সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় তাঁর ঘরে যেতে হত। স্থানীয় এক সংবাদপত্রে তহমীনার বি.এড কলেজে ধর্ম পরিচয় না উল্লেখ করার জন্য ভর্তি প্রত্যাখ্যানের খবর পড়ে দেখা করতে বলেছিলেন। তহমীনার সঙ্গী হিসেবে আমি ও মধ্যমগ্রামের বিজ্ঞান চেতনা ফোরামের সুরেশ কুণ্ডু। তহমীনার লড়াইয়ে সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেন। সুরেশ দা হঠাৎই তসলিমা নাসরিনের প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন ঘরের মেয়ে তহমীনার পাশে আছি, পাশে থাকুন।

তসলিমাকে সমর্থন জানালে কোনও ঝুঁকি নেই, বরং ইমেজ তৈরি হয়। তহমীনার পাশে দাঁড়ালে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। আমি চ্যালেঞ্জ-এর পক্ষের। তহমীনার মুখে হাবড়া গান্ধি সেন্টিনারি বি.টি. কলেজের বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই-এ আমাদের আইনজীবী প্রয়াত অসীম চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকার জন্য তাঁকেও অভিনন্দন জানালেন। পরে অসীমদার সঙ্গে দিদির পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল তহমীনার মামলার সূত্রে। সেদিনই তহমীনা ও আমাকে দিদি বললেন মনে রেখে, সংগ্রাম কখনও ফুরোয় না। সত্যি সংগ্রাম ফুরোয়নি। প্রথম পরিচয়ের দিন দিদির কথার ছন্দপতন ঘটিয়েছিলেন সুরেশদা। তহমীনাকে বললেন সমস্ত ঘটনা আমাকে প্রতি মুহুর্তে চিঠি লেখে জানাবে।

তারপর তহমীনাকে নিয়ে আজকালে টানা লিখেছেন। কলাম লিখলেন ‘কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তহমীনা’। সেই লেখা এতটাই মর্মস্পর্শী ছিল পরের দিন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বুদ্ধিজীবী ও নানা ক্ষোত্রের বিদগ্ধজনেরা মহাশ্বেতা দেবীর লেখার প্রসঙ্গে টেনে সেই সময়কার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে খোলা চিঠি লিখলেন তহমীনাকে বি.এড. পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। সরকারের ঘুম ভাঙল না। টানা এক দশক আইনি লড়াই। মামলার পিঠে মামলা আসে। সব কিছু মিলে এক সময় ১১টা মামলা। দিদি তহমীনার মামলার পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখতেন। দেখা করে বলে আসতে হত। বিচারাধীন বিষয় তার মাঝেও সামান্য কোনও সূত্র থাকলে তা কাগজে লিখতেন। তহমীনার লড়াই চালানোর ক্ষেমত্রে সেই সব লেখা ‘লাইফ সাপোর্ট’-এর মত কাজ করেছে। এরপর মামলা কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে। ২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট।

সেখানেও তহমীনার পক্ষেি ডিভিশন বেঞ্চের রায়। হাইকোর্ট থেকে ফোন করতেই দিদি বললেন তোরা আমার বাসায় চলে আয়। সোজা দিদির গল্ফ গ্রিনের বাসায়। ওই বছর প্রসাদ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় উপন্যাস- “এলাটিং, বেলাটিং, সইলো’ লিখলেন তহমীনাকে নিয়ে। এরপর শুরু তহমীনার কর্মজীবনে নানা সমস্যা। সরকারি দফতরে তহমীনার বেতন অ়জ্ঞাত কারণে ৬/৭/৮ মাস আটকে। দিদি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ফোন ও চিঠিতে বিষয়টি জানালে সমস্যার সমাধান হত। বাম জমানায় তহমীনার চাকরিটাও ছিল ওই রকম। জীবনের মূল্যবান দু’দশক সময় নষ্ট হয়েছে তহমীনার। তবে আপস নয়, লড়াই জারি ছিল, জারি আছে। ১৯৯৭ সালে নিকাশিজনিত সমস্যায় বন্যা। আমাদের উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় সাধারণ মানুষ ও কৃষিজীবী মানুষ ক্ষ‌তিগ্রস্ত হয় ফি বছর বন্যায়।

আমরা বেশ কয়েকজনের উদ্যোগে জেলায় গঠন করলাম ‘নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন সমিতি’। আন্দোলনের একটা স্বাধীন মঞ্চ। জেলার ২২টি ব্লকেই আমাদের কর্মীরা সক্রিয়। একই সঙ্গে কৃষিজমির উর্বর মাটি কাটছে ইটভাটায় মাটি সাপ্লায়ারদের সিন্ডিকেট। আমরা আগে বুঝতেই পারিনি যে আমাদের এই নদী ও পরিবেশ উন্নয়নের কথা নিয়ে দিদি ‘বর্তিকা’র বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করছেন। দিদির বাড়িতে যেতেই হাতে তুলে দিলেন বর্তিকা-র সেই সংখ্যাটি। আমরা যে কিছু একটা বড় কাজ করছি তা তিনিই বুঝিয়ে দিলেন। পরিবেশ রক্ষা র লড়াই চলছে এরই মাঝে চলে এল ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যা। এবার লড়াই নয়, লড়াই-এর মানুষরা বিপন্ন শুরু হল ত্রাণের কাজ। সেই কাজে দিদি টানা তিন মাস আমাদের গাইড। কত ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে আমাদের দিয়েছেন তার হিসেব রাখিনি, তিনিও রাখেননি।

এরও আগে ইরাকে মার্কিন হানা। আমরা জেলা জুড়ে প্রতিবাদ করছি। বারাসতে সুভাষ ইনস্টিটিউটে আমরা সভা আয়োজন করলাম দিদি এলেন, ডাক দিলেন, পেপসি-কোলা ড্রিংকস বয়কট করার। স্লোগান তুললেন পেপসি, কোলা পান করা মানে ইরাকি শিশুর রক্ত পান। পেপসি, কোলার লাভের টাকায় যুদ্ধ চলছে ইরাকে। ওই সভা থেকে দুনিয়ার দেশি সরবত, আখের রস, লস্যি, কুলপি মালাই, ডাব বিক্রেতাদের কাছ থেকে পানীয় কেনার আবেদন জানালেন। ওই সভায় নবারুণদাও (ভট্টাচার্য) এসেছিলেন। অশোকনগরে বাইগাছি গ্রামে আদিবাসীদের জমিতে বি.এস.এফ. ক্যাম্প গড়ার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন দিদি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আমডাঙায় আদিবাসী বর্গাদারদের উচ্ছেদ করে প্রোমাটারির বিরুদ্ধেও দিদিকে দেখেছি, পেয়েছি সব সময়ে। রাজারহাটে নিউটাউনের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে চলছে রাজারহাট জমি বাঁচাও আন্দোলন। পেশাগত কারণে ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে রাজারহাট নিয়ে নিয়মিত সংবাদ, ধারাবাহিক প্রতিবেদন লিখছি।

প্রতিদিনই সংবাদ পড়ে সকালেই ফোন করে উত্তেজিত হয়ে বলতেন, সুকুমার রাজারহাটে হচ্ছেটা কি? তুই যা লিখছিস তা তো ভয়াবহ। কলম ধরলেন রাজারহাটের কৃষকের পক্ষো। প্রায় নিয়মিত রাজারহাট নিয়ে দিদিও লিখছেন, প্রতিবাদ করছেন। সরকার অনমনীয়। কোনও কথাই কানে শোনে না। এমন সময় শান্তিনিকতেন শুরু হয়েছে প্রোমোটারিরাজ। কোমর বেঁধে লাগলেন দিদি। লিখেই ক্ষাকন্ত নন, সোজা খোয়াই-এর পারে আবাসনের শিলান্যাস হওয়া পাচিল লাথি মেরে ভেঙে দিলেন তিনি। তারপর থেকে শুরু এক অন্য সময়। সিঙ্গুরে টাটাদের ন্যানো গাড়ির কারখানা জমি দখল শুরু হল প্রশাসনের। সিঙুর কৃষিজমি লড়াইয়ে মমতা ব্যানার্জির পাশে, মানুষের পাশে দাঁড়ালেন মহাশ্বেতা দেবী।

হরিপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জমি দখলের বিরুদ্ধে উপকূলবাসীর লড়াই, সেখানেও মহাশ্বেতা দেবী। প্রতিবাদ আর প্রতিরোধে উত্তাল সময়ের মাঝে নন্দীগ্রামে স্বতস্ফুর্ত কৃষকের গণপ্রতিরোধ ৩ জানুয়ারি, ২০০৭। টানা লড়াই চলছে নন্দীগ্রামে। সেই লড়াই-এর পর্বে কতবার নন্দীগ্রামে দিদি গেছেন বলা সম্ভব না। রক্তস্নাত নন্দীগ্রামের মানুষ মহাশ্বেতা দেবীকে অভিভাবকের মত নালিশ জানাত। সব নালিশ শুনে সংবাদপত্রে কলাম লিখে বুদ্ধিজীবীদের, সাধারণ মানুষদের পথে নামার আহ্বান জানাতেন। নন্দীগ্রাম পর্বের মাঝেই ঘটে গেল লালগড়ের ছোট পেলিয়া গ্রামে আদিবাসীদের উপর বর্বর পুলিশি হামলা। সেখানেও তৈরি হল পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি। তাঁদের পাশেও বারবার ছুটে গেছেন দিদি। ২০০৬ থেকে ২০১১ পর্যন্ত টানা এই সময়কালে দিদির প্রতিটি কর্মসূচির প্রত্যক্ষ‌দর্শী সাংবাদিক হিসেবে আমি কাছে থেকেছি।

সভার পরে কথা হলেই বলতেন, ‘লড়াই জমে গেছে, এবার ওদের পালাতে হবে’। সিঙ্গুর, হরিপুর, নন্দীগ্রাম, জঙ্গলমহলের প্রতিবাদ আন্দোলনের ময়দানে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘কোনও চিকিৎসা দরকার নেই আমার, লড়াই চলুক-রোগ পালাবে। লড়াই জারি আছে, তাই তো আমি ভালই আছি’।দিদি প্রতিবাদী মানুষের ও গণ আন্দোলনকারীদর রক্ষািকবচ। দিদি ভেন্টিলেশনে আছেন জেনেও আশা রাখছি, দিদি ভাল হয়ে উঠুন। রাজ্যে তো প্রতিবাদ করার মানুষের বড্ড অভাব। আমার সম্প্রতি লেখা বই ‘নদী কথা হুগলি-ইছামতী অববাহিকা’ তাঁকেই উৎসর্গ করা। বইটি উদ্বোধনের অপেক্ষা‘য়। বইটি দিদির হাতে তুলে দেব এই আশা রাখছি।

সুকুমার মিত্র, কলকাতা


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ