,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

চন্দ্রশিলা ছন্দার কাব্যগ্রন্থ ‘দেহ ভাস্কর্য’ ।। আবুল কাইয়ুম

লাইক এবং শেয়ার করুন

‘দেহ ভাস্কর্য’। কবি চন্দ্রশিলা ছন্দার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১৬ উপলক্ষে গ্রন্থটি বের করেছে চট্টগ্রামের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শৈলী প্রকাশন। ঢাকার সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে সরব এই কবির কাব্য চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশের কারণ বোধগম্য নয়। যা হোক, শিল্পী ধ্রুব এষের নান্দনিক প্রচ্ছদ, টেকসই বাঁধাই ও সুন্দর কাগজে ঝকঝকে ছাপা নিয়ে আটচল্লিশ পৃষ্ঠার এই কাব্যটিতে কবির মোট পঁয়ত্রিশটি কবিতা স্থান পেয়েছে। গ্রন্থটির পৃষ্ঠাগুলোতে প্রতিটি কবিতার মটিফ অনুসারে দৃষ্টিনন্দন ছবি সংযোগ করা হয়েছে। এই অঙ্গসজ্জার কাজটি করেছেন আজিজুর রহমান। এর আগে প্রকাশিত কবির অপর কাব্যগুলো হচ্ছে- ‘ছি’, ‘ভালোবাসা দ্রোহে, ভালোবাসা মোহে’ এবং ‘স্পন্দনে তুমি’।

কবি চন্দ্রশিলা ছন্দা তাঁর এই নতুন কাব্যে প্রেম, জীবনঘনিষ্ঠতা ও সমাজমনস্কতার কবি। তাঁর প্রেমে আছে স্বপ্নাচ্ছন্নতা। বাস্তব যাই থাক, প্রেম কখনো কবির মাঝে এক আনন্দময় ভুবন রচনা করে এবং কখনো বা দয়িতকে হারানোর বেদনা তাঁকে মূহ্যমান করে তোলে। আবার কখনো দেখি এই প্রেম ভঙ্গুর, ক্ষণিকের-

থই থই থই মাঠ ভেসে যায়
প্রেমে ছলাৎছল
ভালোবাসা এমন খেলা
পদ্মপাতার জল।

তবু একটি আশাজাগানিয়া প্রেমবোধ তাঁর অন্তরে। পাওয়া-না পাওয়া ও অতৃপ্তির বেদনার মাঝেও তাঁর স্বপ্নগুলো চিরন্তন প্রেমের প্রত্যাশা নিয়ে তাঁর চিত্তে জাগ্রত থাকে। তারপরও স্বপ্নাচ্ছন্নতায় কখনো বা আত্মবৈরী হয়ে বলে ওঠেন, “জলের নির্ভরতা দুকূল/ প্রেম এক বহতা নদী”। যত মান-অভিমান, বিরহ-মিলন ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি থাক, অন্তরে যতই গুমরে মরুক বঞ্চনাবোধ, এই সর্বজনীন প্রেমচেতনাটিই যেন বেঁচে থাকার একটি অর্থ নিয়ে আসে। কবি চিরন্তন প্রেম দেখেছেন দারিদ্রপীড়িত ও সরলা গ্রাম্যবঁধূর নির্মল সাংসারিক জীবনে।

তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন নারীজীবনের কিছু কঠিন বাস্তবতার কথা উঠে এসেছে, তেমনি নারীকে নির্মম পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার বাস্তব আখ্যানও নির্মিত হয়েছে। বেড়ে ওঠার সাথে মেয়েদের মাঝে যে দীপ্র আশা-আকাঙ্ক্ষা জন্মে, বিরূপ সময়ের তোড়ে কীভাবে তার জলাঞ্জলি হয় এবং ঘাতসহ ও ধাতস্ত জীবনের কাছে তাদের সমর্পণ ঘটে তার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন কবি। সব বিলিয়ে দিয়ে নারী রিক্ত ও নি:স্ব হয়ে যায়, কিন্তু তার “অর্থহীন জীবন অর্থের মত/ চাহিবামাত্র করতে হয়/ বাহকের হাতে সমর্পণ”। অধিকাংশ বাঙালি নারীর ক্ষেত্রে বিরাজমান পরনির্ভরতা ও স্বাধীনতাহীনতার এই চিরসত্য সামাজিক সঙ্কটটি ছাড়াও কবি সমাজে নারী নির্যাতন ও পাশবিকতার শিকার অসহায় নারীর চালচিত্রও নির্মাণ করেছেন। নরপিশাচের লাম্পট্যের পরিণতিতে নারীগর্ভে অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রুণ ধারণের যন্ত্রণা ও তা থেকে উদ্ভূত দ্রোহকে কবি একজন ভুক্তভোগী নারীর উক্তিতে এভাবে তুলে ধরেছেন-

যে কাপুরুষ ফাগুন পুড়িয়ে
পিতৃত্বের দায় অস্বীকার করে
তার মুখে থুথু ছিটিয়ে
তলপেটে বাড়তে দিই শিশুটিকে
আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি
কোন অশুভ শকুনের জন্মদাত্রী না হই যেন

এ কাব্যে কবি নারীর অসহায়ত্ব, দুর্দশা ও নিষ্ঠুর পরিণতির যে সব চিত্র প্রকাশ করেছেন সেগুলো আসলে বিদ্যমান সঙ্কটেরই বাস্তব ছবি। এক্ষেত্রে কবি একজন মানবিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ। তাঁকে শুধু নারীবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। তিনি নিজেই বলেছেন-

আমি সংঘাত বিদ্বেষী
নারী বা পুরুষ বিবাদী নই
অসমতা অন্যায়ে সোচ্চার
প্রতিবাদী আমি
মানবতার কবি।

ইতিবাচক সামাজিক চেতনায় প্রদীপ্ত বলেই কবি পরিপার্শ্বে বিদ্যমান অন্যায় ও অপঘাতের বিরুদ্ধেও লেখনী ধারণ করেছেন। স্বাধীন দেশে গুম, হত্যা ও সন্ত্রাস দেখে তাঁর অন্তর বেদাপ্লুত হয়, তিনি এ সবের বিরুদ্ধে দ্রোহ প্রকাশ করেন। সে সাথে গণতন্ত্রহীনতা, দারিদ্র, দুর্নীতি, লুটপাট, দমন-পীড়ন – এ সব দেখেও তাঁর প্রাণ ব্যথাতুর হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল না পাওয়ার আক্ষেপ তাঁর হৃদয়কে বিদীর্ণ করে। এই সভ্য সমাজে তিনি নিরীক্ষণ করেন,- ধর্মের নামে মানুষকে ধর্ম থেকে বিচ্যুত করার এক হন্তারক প্রয়াস। একজন আধুনিকতামনস্ক ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে তিনি পাশবিকতা, হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত একটি সুন্দর সমাজের জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেন।

কবি দেশ ও দেশের স্বাধীনতাকে বড় ভালোবাসেন। তাঁর উচ্চারণ-

যে পতাকা আঁকা হয়েছে কৃষ্ণচূড়ার লাল সবুজ রঙে
যে পতাকায় লেখা আছে কাঁচা মাটির গল্প
লেখা আছে লক্ষ কবির বুকে অমর কাব্যগ্রন্থ
সে আমার প্রিয় স্বাধীনতা

কিন্তু এই স্বাধীন দেশে যখন স্বাধীনতার মহানায়ক, শিশু রাসেল সহ অন্য শিশুরা এবং নিরীহ মানুষগুলো নির্মম হত্যার শিকার হয় তখন কবির অন্তর থেকেও ক্ষরিত হয় রক্ত।

এ কাব্যে কবি ছন্দা গদ্য আঙ্গিকেই বেশি কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতার ভাষা সুগঠিত ও সাবলীল। তাঁর পদ্যগুলো সুন্দর ছন্দোস্পন্দময়। তাঁর কবিতার আঙ্গিকে দারুণ এক কমনীয় ভাব লক্ষ্য করা যায়। এই কমনীয়তার কারণ একমাত্র তাঁর সুচারু শব্দ-বিশেষণ নয়, তাঁর সাথে যুক্ত হয়েছে সরল চিত্রকল্পের রমণীয় সেৌন্দর্যও। তাঁর চিত্রকল্প কতটা হৃদয়গ্রাহী হতে পারে তার প্রমাণ নিম্নের কবিতাংশটি-

ঝিলের জলে কলমি ফুলে ভোরের আলো খেলে
বুকের তাপে ঘুমিয়ে থাকা বঁধূটি চোখ মেলে।

পরিশেষে বলবো, ‘দেহ ভাস্কর্য’ আবেগের তীব্রতা ও ভাষার সহজবোধ্যতা নিয়ে অনবদ্য একটি কাব্য, যা সকল শ্রেণীর পাঠকের কাছে গ্রহণীয় হবার উপযোগী।

[গ্রন্থ পরিচিতি : ‘দেহ ভাস্কর্য’ (কাব্য)। লেখক : চন্দ্রশীলা ছন্দা। প্রকাশক : শৈলী প্রকাশন, ৫ সিডিএ বানিজ্যিক এলাকা, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম। প্রচ্ছদ শিল্পী : ধ্রুব এষ। মূল্য : ১৬০ টাকা।]


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ