,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

ব্যক্তিচর্চা নয়, কবিতা’চর্চা হোক ।। কালের লিখন

লাইক এবং শেয়ার করুন

‘একজন কবি দর্শনীয় মাধ্যম হিসেবে নিজেকে অন্যের চোখে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি একটি দীর্ঘ, সীমাহীন এবং পদ্ধতিবিহীন, অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় অনেকসময় সকলের দৃষ্টিগ্রাহ্যতার বাইরে অবতীর্ণ হয়ে কবিতা রচনা করেন। সকল’স্তরের ভালবাসা, দুঃখ-বেদনা, উন্মত্ততা-উন্মাদনার মাঝে নিজেকে খুঁজে পান তিনি। তিনি সকল ধরণের বিষবাষ্পকে নিঃশেষ করতে পারেন। সেই সাথে পারেন এগুলোর সারাংশকে কবিতা আকারে সংরক্ষণ করতে।

অকথ্য দৈহিক ও মানসিক যন্ত্রণাকে সাথে নিয়ে তিনি অকুণ্ঠ বিশ্বাসবোধ রচনা করে যখন খুশী, যেমন খুশী, যেখানে খুশী অগ্রসর হন। একজন বড় ধরণের অকর্মণ্য ব্যক্তি থেকে শুরু করে কুখ্যাত অপরাধী, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিসম্পাতগ্রস্ত ব্যক্তি, এমনকি সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক হিসেবেও তিনি অভিহিত হতে পারেন!’

উদ্ধৃত কথাগুলো আমার নয়, বলেছেন ফরাসি কবি আর্থার রিমবোঁদ। আমরা কথায় কথায় বলি একজন কবিকে সবার আগে মানুষ হতে হবে। কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। মানুষ হওয়া না হওয়া অনেক পরের ব্যাপার। সবার আগে একজন কবিকে কবি হয়ে উঠতে হবে। যারা বলেন- কবি যদি মানুষ না হয়, কবি যদি সত্যবাদী না হয়, কবি যদি চরিত্রহীন হয়, তবে সে কবি না। কিন্তু পরমসত্য হচ্ছে- মহাকাল ব্যক্তি’কবির যাপিত জীবনের কিছুই ধারণ করে না সেভাবে। মহাকাল গ্রহণ করে ব্যক্তির কর্ম। সোনার তরী কবিতায় রবিঠাকুর বললেন-

এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে—
এখন আমারে লহ করুণা করে।

কিন্তু মহাকালরূপী সোনার তরীতে ঠাকুরের স্থান হয়নি, সেখানে ঠাঁই পেয়েছে ঠাকুরের সোনার ধান। সময়তরী বলছে-

ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই— ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি—
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

আমাদের চারপাশে অসংখ্য অগণন ভালো মানুষ, নিষ্ঠাবান মানুষ, কিন্তু সেইসব ভালো মানুষের কয়জনকে মহাকাল মনে রাখে? মহাকাল মনে রাখে একমাত্র কর্মকে। কর্মকে ধারণ করাই মহাকালের ধর্ম। মহাকাল মনে রাখে সৃষ্টিশীলের সৃষ্টিকে। আইনস্টাইন কয়টা বিয়ে করেছেন, নিউটনের প্রেমিকা কয়জন ছিলো বা অ্যালেন গিন্সবার্গ সমকামী ছিলো কিনা এসব কিন্তু মহাকালের বিবেচ্য বিষয় নয়, মহাকাল স্মরণ করে, বরণ করে, কাজে লাগায় একজন সৃষ্টিশীলের সৃষ্টিকে। ভালো মানুষের চেয়ে সৃষ্টিশীলের কদর বেশি। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় তাঁরা নমস্য! অন্যদিকে মানুষের সংজ্ঞা, ভালো মানুষের সংজ্ঞা এসব আপেক্ষিক। কিন্তু কবির সংজ্ঞা সার্বজনীন।

বন্যার কণ্ঠে যখন আমরা রবিঠাকুরের ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ গানটা শুনি, তখন কিন্তু আমাদের ভাবনায় ব্যক্তি ঠাকুরের চিন্তা আসে না, উনি কাকে ভালোবেসেছেন, কতজনের সাথে প্রেম ছিলো, এই গান উনি কাকে ভেবে লিখেছেন এসব তখন অর্থহীন। আমরা সেই গানের সাথে, গানের কথার সাথে একাত্ম হয়ে নিজেদের অনুভব খুঁজতে সচেষ্ট হই। একইভাবে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ পড়তে পড়তে আমরা কিছুতেই এটা ভাবি না যে, কবির ব্যক্তিজীবন কত বিষাদময় ছিলো। কবি অনাহারে অর্ধাহারে দিনেরপর দিন অসহনীয় জীবনযাপন করেছেন। রুদ্র মদ্যপ ছিলো কিনা সেটা বিবেচ্য নয়; সমুদ্র গুপ্ত গাঁজা খেতেন কিনা এটাও বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হচ্ছে তাঁদের সৃষ্টি। ধূমপায়ী, অধূমপায়ী, মদ্যপ, নেশাসক্ত, বহুগামী, চরিত্রহীন, লম্পট, হুজুর, পাদ্রী এসব কবির কবিতার সাথে কিছুতেই সংযুক্ত নয়।

পরিপাটি ভদ্রলোক অনেক সরকারপ্রধান আমাদের দেশে ছিলেন, আমরা কয়জনের নাম মনে রাখি বা জানি? কারণ তাঁদের কোনো সৃষ্টি নেই, কিন্তু রুটির’দোকানে কাজ করা দুখু মিয়া আমাদের জাতীয় কবি। কবি কাকে বিয়ে করেছেন, কার সাথে প্রতারণা করেছেন এসব বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হচ্ছে কবি কী রেখে গেছেন আমাদের জন্য! আমরা প্রদীপ্তকণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পড়ি, রণসংগীত গাইতে-গাইতে উদ্দীপ্ত হই। মাঝরাতে বিভোর হয়ে শুনি তাঁর অনুপম সৃষ্টি- ‘মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর!’

কবিতা লেখার সাথে, বিশেষকরে সাহিত্যের সাথে লেখক কবির চরিত্রের ভালমন্দের প্রশ্ন অবান্তর, কারণ ওটা যেমনই হোক তা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত; যেখানে কারোর কোনও নিজস্ব বক্তব্য থাকতে পারে না। ব্যক্তিচর্চা বাদ, একটা কবিতা হোক-

তোমার কাছে মিথ্যে হতে পারে
আমি এরকম এক কবিকে জানি
যিনি আটাশটা খুন করার পর
প্রেমের কবিতা লেখা শুরু করেছেন।
লক্ষাধিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে-
লিখেছেন একের পর এক কালের শপথ।

এঁকেছেন শব্দেশব্দে মানুষের ছবি,
অক্ষরে তুলেছেন মানবতার দাবী,
যখন তিনি ভালোবাসা খুনের দায়ে
কারারুদ্ধ ছিলেন দীর্ঘ কুড়িবছর।

তাঁর কবিতার প্রেম, সখ্যতা আর
মানবিকতার দোলাচল সিক্ত করেছে
চেতনার শ্লোগানমাখা ঋদ্ধ পাঠকমন।
কবির তখনো সময়জুড়ে অসময়ের দহন।

মানো বা নাই মানো, কী আসে যায়?
কবিকে ব্যক্তি নয়, খোঁজো কবিতায়।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ