,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আত্মপ্রত্যয়ী গুলতেকিন এবং পুরুষতান্ত্রিকতার অহং ।। সীনা আক্তার

লাইক এবং শেয়ার করুন

সদ্য বিবাহিত এক কিশোরীকে মুগ্ধ করার জন্য বাসরঘরে তাঁর প্রাপ্তবয়ষ্ক, উচ্চশিক্ষিত স্বামী বিশেষ আবেগ দিয়ে রপ্ত করা যাদু দেখালেন, একটা-দুইটা-তিনটা। কিন্তু প্রত্যেবারই সহজ-সরল সেই কিশোরী চমৎকৃত হবার পরিবর্তে তাঁর স্বামীর যাদুর কলাকৌশল ধরে ফেললেন। সেই কিশোরী গুলতেকিন খান। তাঁর মেধা অনুধাবনের জন্য এই ঘটনাই যথেষ্ট। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তা মেনে নিতে, স্ত্রীর সহযোগিতাকে স্বীকার করতে অধিকাংশ স্বামীর অহংবোধে চোট লাগে। সেই স্বামীটি যদি হয় কোন বিখ্যাত ব্যক্তি, তাহলে এই সংকীর্ণ মানসিকতা সেই ব্যক্তির সমর্থকদেরও প্রভাবিত করে। গত ক’দিন থেকে যেমনটা দেখা যাচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ এর গোড়া ভক্তদের আহাজারিতে। কারণ গুলতেকিন দ্বিধাহীনভাবে হুমায়ূন আহমেদের অসংবেদনশীল, কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা উন্মোচন করে পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্র-শিল্প-সাহিত্যে অন্যতম জনপ্রিয় শ্রষ্ঠা। তাঁর আছে বিশাল ভক্তকূল, এর মধ্যে অনেকে এতোটাই গোড়া যে পারলে তাদের প্রিয় লেখককে ঋষি’র মর্যাদা দেয়। দোষে-গুণে মানুষ এই চিরন্তন সত্য মেনে নিতে এরা অপারগ, ব্যক্তি এবং ব্যক্তি’র কাজের মধ্যে পার্থক্য করতে অক্ষম। এদের আছে অফুরক্ত আবেগ, কারণে-অকারণে লেখককে প্রশংসায় ভাসায় এবং কেউ লেখকের বিরুদ্ধে গেলে তাকে ঘৃণা, আক্রমণাত্মক সমালোচনায় জর্জরিত করে।

যেমন গুলতেকিন খানের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন নিরবতা ভেঙ্গে সম্প্রতি গুলতেকিন খান এক সাক্ষাৎকারে তাঁর নিজের কথা, বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা বলেছেন। সেখানে তিনি তার সাবেক স্বামী হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে কোন অসম্মানজনক কথা বলেননি। হুমায়ূন আহমেদ মানুষ এবং স্বামী হিসাবে ভাল-মন্দ কেমন ছিলেন সে ব্যাপারে নেতিবাচক কোন মন্তব্য করেননি। বরং তাঁর প্রতি হুমায়ূন আহমেদের আচরণ, তাঁর মনো:কষ্টের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করেছেন। এ থেকে তার ঘর-সংসার, সন্তান পালন করে পড়াশোনা করার সংগ্রাম, তাঁর চেষ্টা-উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি স্বামীর অবহেলা প্রকাশিত হয়েছে।

আমরা জানতে পারি তিনি অবহেলিত ও উপেক্ষিত বোধ করেছেন। তিনি যা বলেছেন তা মোটেই নতুন কিছু না। হুমায়ূন আহমেদের অনেক লেখায়ই নারীর প্রতি অবমাননা এবং তার কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়। যা তাঁর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকেই প্রকাশ করে, যেমন তিনি লিখেছেন,

“মেয়েদের বেশি বুদ্ধি ভাল না। বেশি বুদ্ধির মেয়ে কখনো সুখী হয় না। সংসারে যে মেয়ের বুদ্ধি যত কম সে তত সুখী” (হুমায়ূন আহমেদে, বৃষ্টি বিলাস)।

এখন মনে হচ্ছে গুলতেকিনের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব-ই তাঁদের সংঘাত এবং বিচ্ছেদের মূল কারণ ছিল। যদি তাই হয়, তাহলে হুমায়ূন আহমেদের সংকীর্ণ মানসিকতাই এর জন্য দায়ী। কিন্তু তিনি এর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে বাণী দিয়েছেন। উল্লেখ্য তাঁর এই বাণী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কত শত প্রচারিত হয়েছে তার হিসাব নেই। এভাবেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো সৃষ্টি হয় এবং টিকে থাকে, যেখানে হুমায়ূন আহমেদের মত বিখ্যাত জনরা সক্রিয় অবদান রাখেন। তাঁর লেখা থেকেই তাকে ‘নিয়ন্ত্রক এবং কর্তৃত্ববাদী’  স্বামী হিসাবে বিবেচনা করা যায়।

“প্রবাস জীবনের সাত মাস পার হয়ে গেছে। আমার স্ত্রী গুলতেকিন আমার সঙ্গে নেই। হলিক্রস কলেজ থেকে আইএস সি পরীক্ষা দিবে। কোমর বেঁধে পড়াশুনা করছে। পরীক্ষার আর মাত্র মাসখানেক দেরি এই অবস্থায় আমি আমার বিখ্যাত চিঠি লিখলাম। চার পাতার চিঠিতে একা থাকতে যে কী পরিমাণ খারাপ লাগছে, তার প্রতি যে কী পরিমাণ ভালোবাসা জমা করে রেখেছি- এইসব লিখলাম।

শেষ লাইনে ছিল- “আমি এনে দেবো তোমার উঠানে সাতটি অমরাবতী”।

এই চিঠি পড়ে সে খানিকটা কাঁদলো। পরীক্ষা-টরীক্ষার কথা সব ভুলে গিয়ে সাতমাস বয়সী শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে চলে এল আমেরিকায়। আমি আমার চিঠি লেখার ক্ষমতা দেখে স্তম্ভিত। পরীক্ষা-টরীক্ষা সব ফেলে দিয়ে চলে আসায় আমি তার উপর খানিকটা বিরক্ত। দু’মাস অপেক্ষা করে পরীক্ষা দিয়ে এলেই হতো!” (হূমায়ূন আহমেদ, স্মৃতিকথা: হোটেল গ্রেভার ইন)। কেমন মানসিক ফাঁদ (emotional blackmail)! ঠিক এটাই আমার মনে হয়েছিল যখন উপরের ঐ লেখাটি আমি প্রথম পড়েছিলাম। সামনে গুরুত্বপূর্ণ একটা পরীক্ষা, এমতাবস্থায় একজন শিক্ষক হয়ে কিভাবে তিনি ঐ আবেগময় চিঠি গুলতেকিনকে লিখেছিলেন!

তিনি ভাল করেই জানতেন ঐটা একটা ফাঁদ ছিল এবং তা আড়াল করতে কূটকৌশলে তাঁর ‘বিরক্তির’ কথা উল্লেখ করেছেন। বিরক্তিটা যে ভান ছিল তা ঐ লেখার মধ্যেই লক্ষণীয়। কারণ বর্ণনায় মনে হয়, যেন চিঠি পাবার পরের দিনই তাঁকে না জানিয়ে গুলতেকিন আমেরিকায় হাজির হয়েছেন এবং তিনি তা দেখে বিরক্ত হয়েছেন! আমেরিকা যাত্রায় সেটা কি বিশ্বাসযোগ্য? যাই হোক, গুলতেকিনের সাক্ষাতকারে এখন আসল ঘটনাটি প্রকাশিত হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ যদি এখন জীবিত থাকতেন তিনি কি গুলতেকিনের প্রতি তাঁর উল্লেখিত আচার-আচরণ স্বীকার করতেন? মনে হয় না। তিনি অস্বীকার করলেই কি গুলতেকিনের কথাগুলো মিথ্যা হয়ে যেত? না। এতোদিনের চাপা কষ্ট প্রকাশ করার জন্য এ সময়টাকেই গুলতেকিন সঠিক মনে করেছেন। হয়তো অন্য কোন কারণে এতদিন তা অপ্রকাশিত ছিল। স্বামী কর্তৃক নিপীড়ন-অপমান নীরবে সহ্য করা আমাদের কুসংস্কৃতির অংশ এবং তিনি এর শিকার হয়ে থাকতে পারেন। যতদিন তিনি সন্তান লালন-পালন করে অন্তরালে ছিলেন, ততদিন গোড়া ভক্তরা তাকে মহিমান্বিত করেছে। এর মাধ্যমে তাকে প্ররোচিত করা যাতে তিনি নিভৃতে, সঙ্গীহীন থেকে হুমায়ূন আহমেদকে মনে করে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বাকি জীবন পার করেন।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গুলতেকিনের মত নারীদের এভাবেই দেখতে চায়। কিন্তু বিচক্ষণ, আত্মবিশ্বাসী গুলতেকিন সেই ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করেছেন এবং এখানেই তাঁর কৃতিত্ব। আমাদের দেশে পুরুষ-নারী নির্বিশেষে পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ এতটাই পাকাপোক্ত যে স্ত্রীর অগ্রগতিতে স্বামীর অবহেলা, অসহযোগিতা প্রায় স্বাভাবিক মনে করা হয়। বিয়ের পর ঘর-সংসার, একাধিক বাচ্চা লালন পালন করে মেয়েদের পড়াশোনা করা কতটা কঠিন তা ভূক্তভোগী মাত্রই জানেন।

গুলতেকিনের মত নারীদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম। কিন্তু গুলতেকিন তার লক্ষ্যে অবিচল থেকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। মানসিক কষ্ট এবং সংগ্রামের কাছে তিনি হেরে যাননি, বরং মেধা-মনোবল দিয়ে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য পূরণ করেছেন এবং পেশাজীবন শুরু করেছেন। বিচ্ছেদ মানেই কষ্ট কিন্তু সে কষ্টকে পেছনে ফেলে তিনি মাথা উঁচু করে, মর্যাদার সঙ্গে সামনের দিনগুলিকে সাজিয়েছেন নিজের জন্য এবং সন্তানদের জন্য। অন্যের অবমূল্যায়নকে উপক্ষো করে, আত্মবিশ্বাসের সাথে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নিজেকে অনন্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সম্প্রতি তাঁর সাফল্যে নতুন পালক যুক্ত হয়েছে, তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সাফল্যের ধারাবাহিকতা অটুট থাকুক সেই শুভ কামনা করি।

ড. সীনা আক্তার: সমাজতত্ত্ববিদ, প্যারেন্টিং পেশাজীবী।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ