,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

প্রিন্স মুসার দখলে মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি!

লাইক এবং শেয়ার করুন

রাসেল আহমেদ ফজলুল করিম ♦ ছবি : শাহীন আহমেদ | মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী অধ্যাপক ইউসুফ আলী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। একাত্তরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলে ইউসুফকে রাজধানীর বনানীতে ১০ কাঠার একটি জমি উপহার দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

জাতির জনকের সেই স্মৃতিমাখা উপহারটি এখন একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বেদখলে। উপহারের সেই জমিতে ইউসুফ বানিয়েছিলেন দোতলা বাড়ি। বছরের পর বছর সেই বাড়িটি জিম্মি করে রাখেন সময়ের আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের ওরফে প্রিন্স মুসা।

শুধু তাই নয়, এই মুসা অর্থবিত্ত, রাজনৈতিক এবং ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ইউসুফ আলীর ছেলে আইউব আলী এবং তাঁর পরিবারের সাত সদস্যের নামে মামলা ঠুকে দেন আদালতে। একে তো বাড়িছাড়া, তার ওপর মামলার ভারে ন্যুব্জ দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের কিছু অকুতোভয় সৈনিক।

অনুসন্ধান করে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর দেওয়া জমিতে দোতলা একটি বাড়ি বানিয়ে ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের কাছে ভাড়া দেন ইউসুফ। মুসা বাড়িটি ভাড়া নেয়ার পর থেকেই নানা কায়দায় ভাড়ার টাকা ঠিকমতো পরিশোধ না করে টালবাহানা করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত বাড়িটি দখলে নিতে ইউসুফ আলীর পরিবারের বিরুদ্ধে একের পর এক সাজানো মিথ্যা মামলা করেন। ইউসুফ আলীর ছেলে মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী ও তাঁর পরিবারের সাত সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা মামলা দিয়ে প্রায় ২০ বছর ধরে বাড়িটি জোরপূর্বক দখলে রেখেছেন। সেইসব মামলায় নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালতের প্রতিটি রায় যায় মুসার বিরুদ্ধে। তবুও মুসা বিন শমসের মুক্তিযোদ্ধার শত কোটি টাকা মূল্যের বাড়িটির দখল ছাড়ছেন না। যার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দেশ থেকে অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান করছেন, সেই মুসা বিন শমসেরের দখলে একজন মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি! এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে নিউজ১৯৭১-এর অনুসন্ধানে।

 

শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান :

এই প্রতিবেদক ছুটে যান রাজধানীর মগবাজারের মধুবাগ এলাকায়। আশপাশে খুঁজতে থাকেন সেই মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী ও তাঁর পরিবারকে। ঘন্টাখানেক খোঁজাখুজির পর জানা গেল, মধুবাগের নয়াটোলার ৫৭৪/২ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলায় ভাড়া থাকতেন আইয়ুব আলী ও তাঁর পরিবার। কিন্তু সেই বাড়ি থেকে চলে গিয়ে ভাড়া নেন মগবাজারের ১৩৮ নম্বরের বাড়িতে। সেখানে গিয়েও পাওয়া গেলো না আইয়ুব আলীকে। ওই দফায় আর খোঁজ মেলে না আইয়ুব আলীর।

এর কয়েকদিন পর মগবাজারে আইয়ুব আলীর খোঁজ করতে গেলে আব্দুল জব্বার নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী ও তাঁর পরিবার নিয়ে মগবাজার আউটার সার্কুলার রোডের ২২৭ নম্বর ভবনের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। ঠিকানা পেয়েই সেই দিনই ছুটে গিয়ে পাওয়া গেলো আইয়ুব আলীকে।

সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কিছুক্ষণ নিরব থেকে আইয়ুব আলী বলেন, দেখুন মুসা আমাদের বাড়ির ভাড়াটিয়া। কিন্তু বাড়িটি ভাড়া নিয়ে ২০ বছর ধরে দখলে রেখেছেন। বাড়িটি আত্মসাতের জন্য একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করছেন। সেই মুসা দেশের কোটি কোটি মানুষকে বোকা বানিয়ে সেরা ধনি হিসাবে পরিচয় দিচ্ছে।

Musa-House-800x445

চুক্তির মেয়াদ শেষ এবং মিথ্যা তিন মামলা :

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর বনানীর ১ নম্বর রোডের ১ নম্বর ব্লকের ৫৭ নম্বরের ১০ কাঠার প্লটটিই অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে বরাদ্দ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। দোতলা বাড়ি নির্মাণের পর প্রতিমাসে ১৮ হাজার টাকায় তিন বছরের চুক্তিতে ১৯৮৭ সালে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয় মুসার কাছে। সেই থেকে বাড়িটি ডেটকো গ্রুপের জনশক্তি রপ্তানির কার্যালয় হিসাবে ব্যবহার করেন মুসা।

পরে ১৯৯৬ সালে ৪৫ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় তিন বছরের জন্য চুক্তির নবায়ন করা হয়। কিন্তু চুক্তির পর থেকে কোন মাসেই ভাড়া ঠিকমত পরিশোধ করতেন না। বাড়ি ভাড়া চাইতে গেলেই নানা ধরনের টালবাহানা করতেন মুসা। আর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাড়ির মালিক অধ্যাপক ইউসুফ আলী বার্ধক্যজনিত কারণে ১৯৯৮ সালের ৩ ডিসেম্বর মারা যান।

পরে তাঁর বড় ছেলে মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী বাড়ির বকেয়া প্রায় আড়াই লাখ টাকা চাইতে গেলে হুমকি দেন মুসার লোকজন। ১৯৯৯ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও বাড়ি ভাড়া চুক্তির আর নবায়ন করা হয়নি। ভাড়া ঠিকমত পরিশোধ না করায় বাড়িটি ছেড়ে দেয়ার লিখিত নোটিশ দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মুসা। বাড়ি না ছেড়ে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে ২০০১ সালে জালিয়াতির মামলা দেয়া হয়। বাড়ী ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং ২য় সহকারি জজ আদালতে মামলাটি দায়ের করেন মুসা (মামলা নম্বর-১৯)।

মামলায় মুসা অভিযোগ করেন, বাড়িটির অবকাঠামো উন্নয়নে ২৫ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। সেই টাকা পরিশোধ না করেই মুসাকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে- এমন অভিযোগে আইয়ুব আলী ও তাঁর পরিবারের বিহুদ্ধে মামলাটি করেন মুসা।

মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী বলেন, ‘ভাড়াটিয়া চুক্তিতেই উল্লেখ ছিল ৫০০ টাকার নিচে ভাড়াটিয়া মেরামত কাজ করতে পারবে। ৫০০ টাকার বেশি হলে বাড়ির মালিক করবে। সেখানে মুসা ২৫ লাখ টাকার উন্নয়ন করার কথা বলে মিথ্যা মামলা আমাদের নামে করেছে। মূলত বাড়িটি দখলে নিতেই এমন মিথ্যা অভিযোগে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয় মুসা। বিষয়টি ওই সময় আমরা থানায় জিডিও করি। কিন্তু বিএনপির আমলে মুসার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং মুসার ক্ষমতার ভয়ে কেউ আমাদের পক্ষে এগিয়ে আসেনি।’

শুধু ওই মামলাই নয়, এর পরপর আরো দুটি মামলা। পাশপাশি চলে মুসা শমসের বাহিনীর নানা হুমকি ধমকি। প্রায় ১৫ বছর ধরে চলে মামলার যুদ্ধ। নিম্ন আদালতের রায় যায় মুসার বিরুদ্ধে। সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন মুসা। সেখানেও রায় হয় মুসার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টেও মামলায় হেরে যান মুসা। তবুও তিনি বাড়িটির দখল ছাড়ছেন না।

আইয়ুব আলীকে সরাসরি ভাড়া পরিশোধ না করে আদালতে ভাড়া পরিশোধ করছেন। বর্তমানে বাজার মূল্য অনুযায়ী সেই বাড়ির ভাড়া চার লাখ টাকার ওপরে। কিন্তু পরিশোধ করছেন সেই ৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ি ৪৫ হাজার টাকা।

সরেজিমনে যা দেখা গেলো :

আজ মঙ্গলবার, ঘড়িতে তখন বিকেল চারটা। বনানীর খেলার মাঠে তরুণেরা খেলায় মাতোয়ারা। খেলার মাঠের পূর্ব পাশে লাল-কমলা রঙের রহস্যময় বাড়ি। বাড়ির ভেতরে-বাইরে কর্ডন করে রেখেছে নিরাপত্তাকর্মীরা। দেখে মনে হবে যেনো কোনো মন্ত্রীর বাড়ি। আসলে এটা কোনো মন্ত্রীর নয়, মুসা বিন শমসেরের বাড়ি।

বিকেলে সরেজমিনে ওই এলাকায় যান নিউজ১৯৭১-এর প্রতিবেদক এবং চিত্রসাংবাদিক। তাঁরা দেখতে পান,  লাল-কমলা  রঙের ৫৭ নম্বর বাড়িটির ভেতরে কালো ব্লেজার পরিহিত কয়েকজন যুবক বাড়িটিকে কর্ডন করে রেখেছেন। এরা সবাই মুসার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী। বাড়িটির বাহিরে আট থেকে দশ জন রাস্তার দু’পাশে থেকে বিভিন্ন দিকে লক্ষ্য রাখছে।

অনেক আগন্তুকেই দেখা গেছে খুবই উৎসাহ নিয়ে বাড়িটি দেখছে। এক পথচারী চায়ের দোকানদারকে জিজ্ঞেসও  করেন, ভাই এটি কোন মন্ত্রীর বাড়ি?

তারও আগে সরেজিমিনে গেলে কথা হয় পাশ্ববর্তী ফ্ল্যাটের একজন মালিকের সঙ্গে। তিনি নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজ১৯৭১কে বলেন, ‘ডেটকো অফিসের কার্যক্রম বলতে এখন আর দেখা যায় না। মাঝে মাঝে মুসা শমসেরকে গাড়িতে করে আসতে আর যেতে দেখা যায়। সঙ্গে থাকে তাঁর নিরাপত্তা বাহিনী। বাইরের কোন লোকজন খুব বেশি তাঁর অফিসে আসতে দেখা যায় না ‘

অপর আরেক বাড়ির মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ে এখন মামলার ফাঁদে ফেলে পুরো বাড়িটিই এখন মুসা দখলে নিতে চাচ্ছে। জনশক্তির কোন কার্যক্রম না হলে বাড়িতে জোর করে দখলে রাখছেন।’

ডেটকো গ্রুপ যা বলছে :

অভিযোগের বিষয়ে মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বনানীর বাড়িটি জোরপূর্বক দখলে নেয়া প্রসঙ্গে ডেটকো গ্রুপের ম্যানেজার মিনহাজুর রহমান চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করে এর আগে একাধিক গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘বাড়িটি ডেটকো গ্রুপের চেয়ারম্যান দখল করেননি। এটা ভাড়া নিয়ে আছেন। প্রতিমাসে আদালতে বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করছেন।

বাড়ির মালিক ছেড়ে আদালতে কেন ভাড়া পরিশোধ করা হচ্ছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে মিনহাজ বলেছিলেন, ‘দেখুন একটু জামেলা আছে। তাই উনারা ভাড়া কোর্টের মাধ্যমে নিচ্ছেন।’ কত টাকা ভাড়া দিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘৪৬ হাজার ১২৫ টাকা প্রতিমাসে আদালতে পরিশোধ করা হচ্ছে।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুসার ডেটকো গ্রুপের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান লাখ কোটি টাকার মালিক হলে বনানীর অফিসটি কেন ভাড়া নিয়ে বছরের পর বছর মালিককে ভাড়া না দিয়ে আদালতে ভাড়া পরিশোধ করছেন? যিনি হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক সেই তিনি কেন নিজের বাড়ি ডেভেলপারকে দিবেন? দেশের মানুষ জানে উনি (স্যার) কোটি কোটি টাকার মালিক। কিন্তু এই কথা আমাদের অফিসের বেশিরভাগ লোকজনই বিশ্বাস করেন না। এখানে বেতন পাই, কাজ করি। তাই মুখ বুজে থাকি।’


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ