,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

নিজামীর দাফন সম্পন্ন

লাইক এবং শেয়ার করুন

জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (১১ এপ্রিল) সকাল সোয়া সাতটার দিকে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে ছেলে ব্যারিস্টার আব্দুল মোমিন বাবা নিজামীর জানাজা পড়ান।মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নিজামীকে মঙ্গলবার (১০ মে) দিনগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির জানান, রাত ১২টা ১ মিনিটেই মতিউর রহমান নিজামীকে ফাঁসির মঞ্চে তুলে গলায় ফাঁস পরানো হয়। প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ করে ১২টা ১০ মিনিটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

ফাঁসি কার্যকরের কিছুক্ষণ পরই ৠাব-পুলিশের কড়া প্রহরায় নিজামীর মরদেহবাহী গাড়িবহর রওয়ানা হয় তার গ্রামের বাড়ি মনমথপুরের উদ্দেশ্যে। রাজধানীর শাহাবাগ, মহাখালী, উত্তরা, গাজীপুরের চন্দ্রা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ হয়ে ভোর সাড়ে ছ’টার দিকে গ্রামের বাড়িতে পৌছে নিজামীর মরদেহ।  নিজামীর ফাঁসি কার্যকরের সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুসারীরা আনন্দ মিছিল করেন। বিপরীতে বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) ভোর ৫টা থেকে পরদিন শুক্রবার ভোর ৫টা পর্যন্ত দেশব্যাপী হরতাল ডাকে জামায়াত।নিজামীর রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে এ পর্যন্ত ৫ যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসিতে ঝোলানো হলো।  মানবতাবিরোধী অপরাধে ‍আমির নিজামী ছাড়াও এর আগে পর্যায়ক্রমে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটি মেম্বার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

সর্বশেষ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং হত্যা-গণহত্যা ও ধর্ষণসহ সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব) দায়ে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হলো নিজামীকে।মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন তিনি।ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের পর রাত দেড়টায় কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নিজামীর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স তার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হয়। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের (জমিয়তে তালাবা) নিখিল পাকিস্তান সভাপতি (নাজিমে আলা) হিসেবে নিজামী একাত্তরে ছিলেন আলবদর বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধিতাকারী জামায়াতের হয়ে তার নেতৃত্বেই বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ নৃশংসতম নারকীয় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করে এই বাহিনী। ফাঁসি হওয়ার পর্যন্ত তিনি ছিলেন জামায়াতের আমির। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রীও ছিলেন তিনি।

বদর প্রধানের যতো অপরাধ
নিজামীকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং হত্যা-গণহত্যা ও ধর্ষণসহ সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) প্রমাণিত ৮টি মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে ৪টিতে ফাঁসি ও ৪টিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ৩টিতে ফাঁসি ও ২টিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। অন্য তিনটিতে চূড়ান্ত রায়ে দণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন নিজামী, যার মধ্যে একটিতে ফাঁসি ও দু’টিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ে।একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নিখিল পাকিস্তানের সভাপতি হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন নিজামী। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা ছাড়াও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) হিসেবে আলবদর বাহিনী ও ছাত্রসংঘের অপরাধের দায়ও তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে বিচারিক ও আপিল আদালতের রায়ে।

নিজামীর বিরুদ্ধে মোট ১৬টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ৮টি অর্থাৎ ১, ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৮ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ে। প্রমাণিত চারটি অর্থাৎ সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়িসহ দু’টি গ্রামে প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে গণহত্যা ও প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ (২ নম্বর অভিযোগ), করমজা গ্রামে ১০ জনকে গণহত্যা, একজনকে ধর্ষণসহ বাড়ি-ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ (৪ নম্বর অভিযোগ), ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে গণহত্যা (৬ নম্বর অভিযোগ) এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (১৬ নম্বর অভিযোগ) দায়ে নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

এর মধ্যে ৪ নম্বর অভিযোগের দায় থেকে নিজামীকে খালাস দিয়ে বাকি তিনটিতে ফাঁসি বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।অন্য চারটি অর্থাৎ পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিন হত্যা (১ নম্বর অভিযোগ), মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র (৩ নম্বর অভিযোগ), বৃশালিখা গ্রামের সোহরাব আলী হত্যা (৭ নম্বর অভিযোগ) এবং রুমী, বদি, জালালসহ সাত গেরিলা যোদ্ধা হত্যার প্ররোচনার (৮ নম্বর অভিযোগ) দায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।এর মধ্যে ১ ও ৩ নম্বর অভিযোগের দায় থেকে চূড়ান্ত রায়ে খালাস পেয়েছেন নিজামী। বাকি দু’টিতে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ বহাল রয়েছে।

এর আগে ফাঁসি হয়েছে যাদের
গত বছরের ২১ নভেম্বর রাতে একই ফাঁসির মঞ্চে একসঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয় অপর দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী চট্টগ্রাম অঞ্চলের নৃশংসতম মানবতাবিরোধী অপরাধের হোতা সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরী এবং একাত্তরের কিলিং স্কোয়ার্ড আলবদর বাহিনীর প্রধান আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মুজাহিদকে। প্রথমবারের মতো একইসঙ্গে পাশাপাশি ফাঁসির মঞ্চে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দুই সাবেক মন্ত্রী-উপদেষ্টার ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় সেবারও রচিত হয় এক নতুন ইতিহাস।

সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরী
কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সমাজসেবক-দানবীর অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যাসহ চার হত্যা-গণহত্যার দায়ে ফাঁসি দেওয়া হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাকাকে। হত্যা-গণহত্যা, ব্যাপক নিধনযজ্ঞ, দেশান্তর, নির্যাতন, ধর্মগত ও রাজনৈতিক কারণে নির্যাতন করে হত্যা, ষড়যন্ত্রের মতো আরও চারটি অপরাধে আদালত সাকাকে ৫০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিলেও সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হওয়ায় সেসব সাজা ভোগের প্রয়োজন পড়েনি।

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
চতুর্থজন হিসেবে একই সময়ে ফাঁসির দড়িতে ঝোলা অপর শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ সর্বোচ্চ সাজা পান বুদ্ধিজীবী হত্যার পাশাপাশি সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটিতে (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব) থাকা নেতা হিসেবে গণহত্যা সংঘটিত করা, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা, ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার মাধ্যমে হত্যা, নির্যাতন, বিতাড়ন ইত্যাদি ঘটনার দায়ে।

মোহাম্মদ কামারুজ্জামান
গত বছরের ১১ এপ্রিল রাত দশটা ৩১ মিনিটে ফাঁসি দেওয়া হয় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে। দ্বিতীয় যুদ্ধাপরাধী হিসেবে একাত্তরে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল জুড়ে নারকীয় সব যুদ্ধাপরাধের হোতা আলবদর বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব কমান্ড কামারুজ্জামান ফাঁসিতে ঝোলেন শেরপুর জেলার সোহাগপুর গ্রামে ১৬৪ জনকে হত্যা ও নারী নির্যাতনের দায়ে।

আব্দুল কাদের মোল্লা
২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে প্রথমবারের মতো ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল জামায়াতেরই অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার। ‘মিরপুরের কসাই’ স্থানীয় আলবদর কমান্ডার কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল রাত দশটা এক মিনিটে। সপরিবারে মিরপুরের হযরত আলী লস্কর হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলেন তিনি। অন্য যুদ্ধাপরাধীদেরও আরও কয়েকটি করে অপরাধে আদালত যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডাদেশ দিলেও সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হওয়ায় সেসব সাজা ভোগের প্রয়োজন পড়েনি।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ