,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

ক্যারিবীয় দ্বীপে কিংদের রাজকীয় প্রস্থান

লাইক এবং শেয়ার করুন

ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জে রাজকীয় অবসরে গেলেন পাকিস্তান ক্রিকেটের দুই ব্যাটিং স্তম্ভ। ৬৫ বছরের ক্যারিবীয় সফরের ইতিহাসে টেস্ট সিরিজে জয় না পাওয়ার রেকর্ড গড়লেন তারা। তাই তো পাকিস্তান তাদের বলতেই পারে মিসইউ (মিসবাহর ‘মিস’ ও ইউনিসের ‘ইউ’ মিলিয়ে ‘মিস-ইউ’!) শঙ্কায় ছিল পাকিস্তান ক্রিকেট তাদের কীভাবে মনে রাখবে? ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে মিসবাহ-উল-হক করেছেন ২ রান। ইউনিস খান ৩৫। কিন্তু মিসবাহ আর ইউনিসের পুরো ক্যারিয়ার দেখলে দুজনের এই দুটি ইনিংসের কথা কে আর বলবে! অসামান্য একজন অধিনায়ক আর অসাধারণ একজন ব্যাটসম্যানের ছবিই সবার চোখে ভেসে উঠবে তখন।

মিসবাহকে পাকিস্তান মনে রাখবে দারুণ এক নেতা হিসেবে। কয়েক দিন আগে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি শাহরিয়ার খান তো বলেছেন, অধিনায়ক হিসেবে ইমরান খানের চেয়েও এগিয়ে মিসবাহ। মিসবাহর পরিসংখ্যানও তাই বলছে। ২০১০ সালে পাকিস্তান দলের ভীষণ দুঃসময়ে ধরেছিলেন হাল। স্পট ফিক্সিংয়ের তোড়ে দেশটির ক্রিকেট তখন টালমাটাল। সেই সময়ে অনেকটা গোপনেই মিসবাহর কাঁধে দায়িত্ব দিয়েছিল পিসিবি। এমনকি বোর্ডের চেয়ারম্যানের কক্ষেও এ নিয়ে আলোচনায় বসেনি কর্তৃপক্ষ। পিসিবির এক কেরানির কক্ষে বসেই তাকে দেওয়া হয়েছিল প্রস্তাব। মিসবাহ প্রস্তাবটি গ্রহণ করে নিজের পরিবারের কাছেই গোপন রাখেন প্রায় এক সপ্তাহ।

তবে নেতৃত্ব পাওয়ার পর আর পেছন ফিরে তাকাননি। কিছু ফুল দেরিতে ফোটে, দেরিতেই গন্ধ বিলায়। মিসবাহ যেন সে রকম এক ফুল। ৩৫ বছর পেরোনোর পর যেন পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়েছেন মিসবাহ। ডমিনিকা টেস্টের আগে ক্যারিয়ারে ৫ হাজার ১৬১ রান করেছেন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৪৮ রানই করেছেন ৩৫ পেরোনোর পর। ক্যারিয়ারে খেলা ৭৬ টেস্টের ৫৭টিতেই অধিনায়ক। দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি টেস্টজয়ী (ডমিনিকা ম্যাচসহ ২৬টি) অধিনায়ক তিনিই। ছাড়িয়ে গেছেন ২৩ টেস্টজয়ী ক্লাইভ লয়েডকে। পাকিস্তানকে টানা ৫৭ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সময়ের হিসাবে যেটা ৬ বছর ১৭৫ দিন। তার পরেই ইমরান খান ৫ বছর ৩১৪ দিনে পাকিস্তানকে টানা ৩৪ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইমরান। পাকিস্তানের দুঃসময়ে ব্যাট হাতেও মিসবাহ দাঁড়িয়ে গেছেন হিমালয়ের মতো। ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে ১০টি সেঞ্চুরিসহ ৪৬.৬২ গড়ে করেছেন ৫ হাজার ২২২ রান।

অসাধারণ নেতৃত্বের কারণেই পাকিস্তানের ক্রিকেটে অমর হয়ে থাকবেন মিসবাহ। ইউনিসের অধিনায়কত্বের মুকুটে জ্বলজ্বল করে ২০০৯ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়। পাকিস্তানকে প্রথম বৈশ্বিক শিরোপা অবশ্য জেতান ইমরান খান। সেটি ১৯৯২ সালে ওয়ানডের বিশ্বকাপ। নেতৃত্বের জন্য নয়, ইউনিসকে ক্রিকেট-বিশ্ব মনে রাখবে একজন ‘গ্রেট’ ব্যাটসম্যান হিসেবে। বিশ্ব ক্রিকেটে ব্যাটসম্যান হিসেবে অনেকের থেকেই পিছিয়ে থাকবেন ইউনিস। কিন্তু শুধু পাকিস্তানের কথা এলে? কেউ হয়তো হানিফ মোহাম্মদের কথা বলবেন। কেউ বলবেন জাভেদ মিয়াঁদাদ বা জহির আব্বাসের কথা। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে ১০ হাজার রান করা প্রথম পাকিস্তানি ক্রিকেটার তো ইউনিসই। ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন ছয়টি। যার একটিকে আবার রূপ দিয়েছেন ট্রিপলে। পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন একটি জরিপে দেখিয়েছে, সবাইকে ছাড়িয়ে ইউনিসই এক নম্বরে।

টিপটিপ বৃষ্টি। আকাশে রংধনু। ডমিনিকা টেস্টের বাকি আর ৮টি বল! এর আগের বলেই শেষ ব্যাটসম্যান শ্যানন গ্যাব্রিয়েলকে আউট দিয়েছিলেন আম্পায়ার। রিভিউ নিয়ে বেঁচে গেলেন। ইয়াসির শাহের পরের বলটা ডট! সিরিজের শেষ বলটা করতে আসছেন। পুরো পাকিস্তান ঘিরে রেখেছে গ্যাব্রিয়েলকে, ইতিহাস আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের অনন্য এক ড্রয়ের মাঝে দাঁড়িতে তো তিনিই! ওপাশে রসটন চেজ যে দিনভর গড়ে তুলেছেন দুর্ভেদ্য এক দেয়াল! ক্যাচ মিস, নো বলে ক্যাচও টলাতে পারেনি তাঁকে!

গ্যাব্রিয়েলের ওপর কী ভর করলো, কে জানে! আধা ঘন্টার ওপরে ক্রিজে ছিলেন, সেই তিনিই ইয়াসিরকে উড়িয়ে মারতে গেলেন হয়তো! বলকে দূর সুদূরে নয়, নিতে পারলেন নিজের স্ট্যাম্পের ওপরেই! ক্রিকেট বিধাতা বলে যদি কেউ থাকেন, তিনিই হয়তো চেয়েছিলেন, মিসবাহ-ইউনুসের বিদায়টা হোক রাজসিক। এক ওভার বাকি থাকতে টেস্ট জিতে গেল পাকিস্তান। জিতে গেল সিরিজ। এর আগের আট সিরিজে যা হয়নি, হলো তাই! ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে প্রথমবারের মতো সিরিজ জিতলো পাকিস্তান, মিসবাহ ও ইউনুসের বিদায়ী টেস্টে!

অথচ আগের দিনের শেষে পাকিস্তানের জয়টাকে শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই হয়তো ভেবে এসেছিলেন অনেকেই! কিন্তু ছিলেন যে একজন রসটন চেজ!

চেজকে বাদ দিলে আগের দিনের ধাক্কাটা সামাল দিতে না দিতেই আবার ধাক্কা খেয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ! ক্রেইগ ব্রাথওয়েট, ইয়াসির শাহকে কাট করতে গিয়ে পয়েন্টে দিলেন ক্যাচ। ২৫ রানের জুটি এরপর, মোহাম্মদ আমিরের ভেতরের দিকে ঢোকা বলে শিমরন হেটমেয়ার হতভম্ব। লাঞ্চের আগে আগে শাই হোপকে ক্যারিয়ারের প্রথম উইকেট হিসেবে নিলেন হাসান আলি। ৭৩ রানে ৪ উইকেট খুইয়ে লাঞ্চে গিয়েছিল ক্যারিবীয়রা।

ভিশল সিং এরপর ইয়াসির শাহর ক্ল্যাসিক লেগস্পিনে কাবু, বাবর আজমের ক্লোজ-ইনে আরেকটি দুর্দান্ত ক্যাচ। অর্ধেক উইকেট হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান মাত্র ৭৬। শেন ডাওরিচের নিজেকে ‘দুর্ভাগা’ ভাবার একটু সুযোগ পাবেন। ব্যাট-প্যাডের ক্যাচে আউট দিয়েছিলেন আম্পায়ার ব্রুস অক্সেনফোর্ড। তবে হটস্পট-আল্ট্রাএজ ছাড়া রিভিউ পদ্ধতিতে সে সিদ্ধান্তকে নাকচ করতে পারেননি টিভি আম্পায়ার রিচার্ড কেটেলব্রো।

রিভিউয়ের সুবিধা নেয়ার কিছুক্ষণ পরই দ্বিতীয় রিভিউটাও খরচ করে ফেলেছিল পাকিস্তান। রসটন চেজের ব্যর্থ সুইপের পর শেষ মুহুর্তে রিভিউ নিলেন মিসবাহ, রিপ্লে দেখালো বল লেগেছে শুধুই প্যাডে! সরফরাজ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, এই চেজের ক্ষেত্রেই আরেকটা ব্যর্থ রিভিউ নিয়েছিল পাকিস্তান। সেবারও মিসবাহকে রাজি করিয়েছিলেন সরফরাজ!

দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে সপ্তম উইকেটে ১৩২ রানের জুটি ছিল চেজ-হোল্ডারের। তাঁদের এবারের জুটি ৫৮ রানের, হাসানের রিভার্স সুইংয়ে এলবিডাব্লিউ হোল্ডার। চেজকে সঙ্গ দেয়ার জন্য থাকলেন শুধুই টেইল-এন্ডাররা! যোগ দিলেন বিশু। উইকেট আঁকড়ে থাকলেন প্রায় ১৫ ওভার। মোহাম্মদ আব্বাসের শর্ট বলে ইতি ঘটলো তাঁর। বিশু গেলেন, এলেন জোসেফ। তাঁর ৩২ বলের প্রতিরোধ ভাঙল হাসানের বলে, সরফরাজকে ক্যাচ দিয়ে। জোসেফের পর এলেন গ্যাব্রিয়েল।

গ্যাব্রিয়েলের টেকা দায় হয়ে গেল শুরুতেই, হাসানের বলে রিভিউ নিল পাকিস্তান। রিপ্লে দেখালো ‘এজ হলেও হতে পারে’, কিন্তু অন-ফিল্ড কল নাকচ করতে পারলেন না আবারও কেটেলব্রো।

সেই গ্যাব্রিয়েলেই গিয়ে ঠেকলো সব। ইয়াসির শাহর ওই ওভারে! আর তারপর? চেজ দাঁড়িয়ে রইলেন ওপাশে, ২৩৯ বলে ১০১ রান করে, ৩৬৬ মিনিট ধরে অপরাজিত থেকে!

শুধু চেজের এই অপরাজিত দাঁড়িয়ে থাকা কেন, দিনভর যা হলো, যেভাবে শেষ হলো, এর চিত্রনাট্য ওই ক্রিকেট বিধাতা ছাড়া আর কেইবা লিখতে পারতেন!

সতীর্থদের কাঁধে চড়ে শেষবারের মতো মাঠ ছাড়লেন ইউনুস-মিসবাহ। ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন রোস্টন চেইস। ৩ ম্যাচে ২৫ উইকেট নিয়ে সিরিজ সেরা ইয়াসির শাহ।

একজন মহান নেতা আর একজন মহান ব্যাটসম্যান। এটা নিশ্চিত দুজনকে একসঙ্গে হারানোর ধাক্কা সামলে উঠতে পাকিস্তানকে বহুদিনই অপেক্ষা করতে হবে। তাঁদের হারানোর আক্ষেপ কতটা, সেটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মাঠের বড় পর্দায় ভেসে ওঠা ওই শব্দ জোড়ায়ও মিসবাহর ‘মিস’ ও ইউনিসের ‘ইউ’ মিলিয়ে ‘মিস-ইউ’!

সংক্ষিপ্ত স্কোর
পাকিস্তান প্রথম ইনিংস: ১৪৬.৩ ওভার ৩৭৬ (আজহার আলী ১২৭, শান মাসুদ ৯, বাবর আজম ৫৫, ইউনিস খান ১৮, মিসবাহ-উল-হক ৫৯, আসাদ শফিক ১৭, সরফরাজ আহমেদ ৫১, মোহাম্মদ আমির ৭, ইয়াসির শাহ ০, মোহাম্মদ আব্বাস ৪, হাসান আলী ৮*; শ্যানন গ্যাব্রিয়েল ০/৬৭, আলজারি যোসেফ ১/৬৪, রস্টন চেজ ৪/১০৩, জ্যাসন হোল্ডার ৩/৭১, দেবেন্দ্র বিশু ২/৬১)।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস: ১০০ ওভার ২১৮/৫ (ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট ২৯, কাইরান পাওয়েল ৩১, শিমরন হেটমায়ার ১৭, শাই হোপ ২৯, রস্টন চেজ ৬০, ভিশাউল সিং ৮, শেন ডাউরিচ ২০, জ্যাসন হোল্ডার ৩০*, দেবেন্দ্র বিশু ০, আলজারি যোসেফ ০, শ্যানন গ্যাব্রিয়েল ০; মোহাম্মদ আমির ১/৩২, মোহাম্মদ আব্বাস ৫/৪৬, ইয়াসির শাহ ৩/১২৬, হাসান আলী ০/২২, আজহার আলী ১/১৫)।

পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংস: ৫৭ ওভার ১৭৪ ডিক্লে. (আজহার আলী ৩, শান মাসুদ ২১, বাবর আজম ০, ইউনিস খান ৩৫, মিসবাহ-উল-হক ২, আসাদ শফিক ১৩, সরফরাজ আহমেদ ৪, মোহাম্মদ আমির ২৭, ইয়াসির শাহ ৩৮*, হাসান আলী ১৫*; শ্যানন গ্যাব্রিয়েল ২/২৪, আলজারি যোসেফ ৩/৫৩, রস্টন চেজ ১/৩১, জ্যাসন হোল্ডার ০/৭, দেবেন্দ্র বিশু ২/৫৪)।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংস: ৯৬ ওভার ২০২ (ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট ৬, কাইরান পাওয়েল ৪, শিমরন হেটমায়ার ২৫, শাই হোপ ১৭, রস্টন চেজ ১০১*, ভিশাউল সিং ২, শেন ডাউরিচ ২, জ্যাসন হোল্ডার ২২, দেবেন্দ্র বিশু ৩, আলজারি যোসেফ ৫, শ্যানন গ্যাব্রিয়েল ৪; মোহাম্মদ আমির ১/২২, মোহাম্মদ আব্বাস ১/৩৩, ইয়াসির শাহ ৫/৯২, হাসান আলী ৩/৩৩, আজহার আলী ০/৩, আসাদ শফিক ০/১৫)।

ফলাফল: পাকিস্তান ১০১ রানে জয়ী
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: রস্টন চেজ (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)
ম্যান অব দ্য সিরিজ: ইয়াসির শাহ (পাকিস্তান)
সিরিজ: ৩ ম্যাচ সিরিজ ২-১ এ জয়ী পাকিস্তান


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ