,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

লোককবি রমেশ শীল’র ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

লাইক এবং শেয়ার করুন

উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবিয়াল একুশে পদকে ভূষিত লোককবি রমেশ শীলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ । এ উপলক্ষে বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদন্ডী শীলপাড়ায় কবিয়ালের সমাধি প্রাঙ্গণে নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। সকালে তাঁর সমাধিতে মাল্যদান ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। বিকেলে রয়েছে রমেশ শিল্পীগোষ্ঠীর পরিচালনায় রমেশ সংগীতানুষ্ঠান, আলোচনা সভা। সন্ধ্যায় তাঁরই রচিত মরমী ও মাইজভান্ডারী গান এবং রাতভর কবিয়ালদের পরিবেশনায় কবিগান।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত লোককবি রমেশ শীল ১৮৭৭ সালের ৬ মে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদন্ডী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম চন্ডীচরণ শীল এবং মায়ের নাম রাজকুমারী শীল। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি তার পিতৃদেবকে হারান এবং পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নিতান্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম বিধায় তৃতীয় শ্রেণীর বেশি লেখাপড়া সম্ভব হয়ে উঠেনি। পড়ালেখার প্রতি শিশুকাল থেকেই প্রবল আগ্রহ ছিল। তিনি জীবিকার প্রয়োজনে ক্ষেীরকর্ম, স্বর্ণশিল্পীর কাজ, চালের গুদামে চাকুরী, বিভিন্ন দোকানে চাকুরী করলেও শেষে কবিরাজি চিকিৎসা, কবিগান ও সংস্কৃতি চর্চায় ব্রত হন। ১৮৮৮ সালে জীবিকার জন্য মিয়ানমার যান এবং বার্মা যুবতীর প্রেমে পড়েন।

স্বদেশ- সংস্কৃতি-মাটি ও আপনজনের নাড়ীর টানে তিনি ১৮৯৫ সালে বার্মা থেকে স্বদেশে ফিরে আসেন এবং কবিরাজি চিকিৎসায় আত্মনিয়োগ করে সাফল্য অর্জন করেন। তিনি লোকসংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যান। কবিরাজি চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি জারিগান, সারিগান, কীর্তন, পাল্টাকীর্তন, কবিগান, যাত্রাগান, যাত্রাভিনয়, পালাগান, বৈঠকীগান, ও পল­ীগীতি ইত্যাদি গানের আসরে তিনি নিয়মিত অংশ নিতেন। এছাড়াও তিনি নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থপাঠ, তার দৈনন্দিন জীবনের কাজ ছিল। দোহাগিরি দিয়ে তার কবিয়াল জীবন শুরু করেন।

১৮৯৭ সালের চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটে কবিগান পাগল বন্ধুদের সাথে জগদ্বার্ত্রী পূজায় গান শুনতে গিয়েছিলেন বালক রমেশ শীল। দুই প্রবীন কবিয়াল মোহনবাঁশী ও চিন্তাহরনের কবিগানের আসর। গানের আসরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন কবিয়াল চিন্তাহরন। গলা বসেগেল, গানের শব্দ শোনা যায় না। তখন মাইকের ব্যবহার ছিল না। মঞ্চের সামনে শোতাদের মধ্যে দেখা দেয় চরম উত্তেজনা এসময় আয়োজকরা ঘোষনা দিলেন গানের আসরে কোন কবি থাকলে মঞ্চে আসার জন্য, রমেশ শীলের বন্ধুরা রমেশকে উঠিয়ে দিলেন মঞ্চে। ভয়ে কাঁপা পায়ে আসরে উঠলেন তিনি। পরিচয় পর্বে প্রতিপক্ষ প্রবীন কৌশলী মোহন বাঁশি পুঁচকে ছোড়া নাপিত.. বলে অশোভন ভাষায় আক্রমণ করেন।

উত্তরে রমেশ শীলের প্রথম পদ (উৎসাহ আর ভয়/লজ্জ্বাও কম নয়/ কেবা থামাইবে কারে?/ পুঁচকে ছোড়া সত্য মানি/ শিশু ধ্রুব ছিল জ্ঞানী/ চেনা-জানা হোক না এই আসরে..। শুরু হল লড়াই। প্রবীন ও বিজ্ঞ মোহনবাঁশীর সাথে জীবনের প্রথম কবিগানেই লড়াই চললো টানা ১৮ ঘন্টা। কেউ কাউকে হারাতে পারছেন না। শেষতক আপোষ জোটকের ব্যবস্থা করলেন আয়োজকরা। জীবনে প্রথম গান শুনতে গিয়ে ২১ বছর বয়সেই রমেশ হয়ে গেলেন কবিয়াল। তার পরিচয় হল নতুন কবির সরকার। এরপর রমেশ শীলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।

১৯৯১ সালে প্রবীন কবিয়াল নবীন ঠাকুরের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। গভীর মমত্ব দিয়ে শিষ্যকে তৈরি করেছেন নবীন ঠাকুর। কোন কোন সময় শিষ্যের কাছে পরাজয় বরণ করলেও তিনি গৌররবোধ করতেন। যে সব ব্যক্তিত্বের সাথে তার সম্পর্ক ছিল এবং যারা তার গুনগ্রাহী ছিলেন হযরত গাউছুল আজম সৈয়দ গোলামুর রহমান রহমান বাবা ভান্ডারী (কঃ), শাহ্ ছুফী হযরত আবুর খায়ের, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, মাওলানা ভাসানী, কথাশিল্পী আবুল ফজল, পল­ী কবি জসিম উদ্দিন, বেগম সুফিয়া কামাল, রনেশ দাশগুপ্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কমরেড পুনেন্দু দস্তিদার, যতীন্দ্র মোহন সেন গুপ্ত, দানেশ ঘোষ, কল্পনা দত্ত, কমরেড মনি সিংহ, তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রভাবতী দেবী স্বরস্বতী, গোপাল হাওলাদার, ড. আহমদ হোসেন, অধ্যাপক অজিত গুহ, ড. আনিসুজ্জামান, মোঃ শহিদুল­াহ কায়সার, খন্দকার মুহাম্মদ ইলিয়াছ, আবু জাফর শামসুদ্দিন, অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্র সিং, কমরেড আব্দুস সাত্তার, কল্পতরু সেন গুপ্ত, কমরেড সুধাংশু দত্ত, সরোজ মোহন মিত্র, শুভাশীষ চৌধুরী, অতুল বন্দোপাধ্যায়, মোরশেদ শফিউল আলম, ড. গিরিন্দ্র দাশ, এবিএম মুছা, কমরেড কালিপদ চক্রবর্ত্তী।

কবিয়ালদের মধ্যে রমেশ শীল যাদের সান্নিধ্য লাভ করেন তারা হলেন নবিন ঠাকুর, চিন্তহরণ দাশ, মোহন বাঁশি, নিরঞ্জন সরকার, অন্নদা নট্র, হক ঠাকুর, নিতাই বৈরাগী, নৃসিংহ, এ্যাটোনি ফিরিঙ্গী, লম্বোদর চক্রবর্ত্তী, দেবন্দ্র দাশ রাশু, ধরনী ধর, ভবানী বেনে, ভোলা ময়রা, বংশীধর, রাম বুস, ভোলা নাথ, বলাই বৈঞ্চব, ফনী বড়–য়া, পুলক চন্দ্র, রায় গোপাল দাশ,  মনিন্দ্র দাশ, গোবিন্দ্র দে, বরদা দে প্রমুখ।

রমেশ শীলের গান পরিবেশন করে যারা খ্যাতি অর্জন ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন তাদের মধ্যে উলে­খ যোগ্য শিল্পী ফকির আলমগীর, শেফালী ঘোষ, কল্যাণী ঘোষ, শাক্যমিত্র বড়ুয়া, শ্যামসুন্দও বৈঞ্চব, শিমুল শীল, আবদুল মন্নান কাওয়াল। রমেশ শীলের লেখা নিয়ে গবেষনা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন বোয়ালখালীর কৃতি সন্তান বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। ধর্মীয় ভাবধারায় রাজনৈতিক অবক্ষয়, দুভিক্ষ, খরা, মহামারী, আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, সর্বোপরি মাইজভান্ডারী সংগীতে তার সোচ্ছার ভূমিকা ছিল অনবদ্য। কবিয়াল রমেশ শীলের ব্যক্তিত্বের প্রভাবে কবিয়ালদের মর্যাদা বেড়ে যায় অনেক গুন।

উপমহাদেশের অন্যতম লোকায়াত দর্শন মাইজভান্ডারী দর্শনের অন্যতম প্রচার সহায়ক মাইজভান্ডারী গান। যে কয়েকজন এই গান লিখে এ দর্শনকে ধন্য করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম রমেশ শীল। ১৯২৩ সালে মাইজভান্ডার গমন করে হযরত বাবা ভান্ডারীর সান্নিধ্য লাভ করেন রমেশ শীল। তিনি হাজারের অধিক মাইজভান্ডারী তান্ত্রিক গান রচনা করেন। তার মধ্যে ছয়টি পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয় যা এখন দুর্লভ। এই মহিয়ান কবিয়ালের লেখাগুলোর সমন্বয়ে বাংলা একডেমীর রমেশ রচনাবলী নামেও একটি বই প্রকাশ করে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার গণসংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে ২১শে পদকে ভূষিত করে। কবিয়াল সম্রাট লোককবি রমেশ শীল ১৯৬৭ সালের ৬ এপ্রিল দেহ ত্যাগ করেন। তার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে দাহ না করে সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু অত্যান্ত পরিতাপের বিষয় কবির সমাধি প্রাঙ্গণে আজও গড়ে উঠেনি কোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।  ৫০ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ