,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

দ্য সোল অফ এ বাটারফ্লাই

লাইক এবং শেয়ার করুন

এক সময় বক্সিং রিংয়ে তিনি দাঁপিয়ে বেড়াতেন। যাকে কেন্দ্র করে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা নামতেন ব্যবসায়ীরা। তিনি সাবেক মার্কিন মুষ্টিযোদ্ধা। তিন বারের ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। ওলিম্পিক লাইট-হেভিওয়েট স্বর্ণপদক বিজয়ী। বিবিসি এবং স্পোর্টস ইলাট্রেটেড স্পোর্টসম্যান অব দ্য সেঞ্চুরি। তিনি কিংবদন্তী মোহাম্মদ আলী।
 
আলী জন্মগ্রহণ করেছিলেন লুইসভিলা, কেন্টাকি তে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগে তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস মারকেলাস ক্লে জুনিয়র। তার বাবা ক্যাসিয়াস মারকেলাস ক্লে সিনিয়রের নাম অনুসারেই রাখা হয়েছিল তার নাম। বারার নাম রাখা হয়েছিল একজন দাসপ্রথা বিরোধী রাজনীতিবিদ ক্যাসিয়াস ক্লে এর নামানুসারে। আলী ১৯৬৪ সালে ইসলামী সংগঠন ‘নেশন অব ইসলাম’ এ যুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তার নাম পরিবর্তন করেন।
 
শৈশব
মোহাম্মদ আলী ১৭ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ক্লে সিনিয়র সাইনবোর্ড এবং বিলবোর্ড রং করতেন। মা ওডিসা গ্রাডি ক্লে ছিলেন গৃহিণী। যদি ক্লে সিনিয়র একজন মেথডিস্ট (খ্রিস্টান বিরোধী) ছিলেন কিন্তু তার সন্তানদের ব্যাপ্টিস্টে (খ্রিস্টানদের চার্চ) নিতে তার স্ত্রীকে অনুমতি দিতেন।
 
বক্সিং জীবনের শুরু
১৯৫৪ সালের একদিন আলীর সাইকেল চুরি হয়ে যায়। তখন তিনি পুলিশ অফিসারকে(মার্টিন) জানান যে তিনি চোরকে পেটাতে চান। অফিসার (সে শহরের বক্সিং কোচ) তাকে বলেন যে এর জন্য তাকে লড়াই করতে জানতে হবে। পরদিন তিনি মার্টিন এর কাছ থেকে বক্সিং শেখা শুরু করেন। তিনি তাকে শিখিয়েছিলেন কিভাবে প্রজাপতির মতো নেচে নেচে মৌমাছির মতো হুল ফোটাতে হয়। অনেক কষ্টের পর ১৯৬০ সালে তিনি অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেন।
 
৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার আলীর বিশেষত্ব ছিল তিনি খেলার সময়ে সবার মতো হাত মুখের সামনে রাখতেন না, শরীরের পাশে রাখতেন। প্রতিপক্ষের মার ঠেকানোর জন্য নির্ভর করতেন সহজাত প্রবৃত্তির ওপর। ২৯-১০-১৯৬০ এ তিনি প্রথম পেশাদার লড়াই জেতেন। ১৯৬০-১৯৬৩ তিনি টানা ১৯টি লড়াই জেতেন যার মধ্যে ১৫টি নকআউট। ১৯৬৩ সালে তিনি ডগ জোন্সের সঙ্গে ১০ বাউটের এক বিতর্কিত লড়াইয়ে জেতেন।
 
প্রথম শিরোপার লড়াই

এরপর তিনি শিরোপাধারী সনি লিসটনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে গণ্য হন। কিন্তু কেউ আশা করেনি যে তিনি জিতবেন। লড়াইয়ের আগে তিনি ঘোষণা দেন, “তিনি প্রজাপতির মতো নেচে নেচে মৌমাছির মতো হুল ফোঁটাবেন।”
লিসটন ছিলেন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু ক্ষিপ্রতা আলীকে লিস্টনের ঘুষি থেকে বাঁচিয়ে দেয়। তার উচ্চতার কারণে তিনি তাকে ঘুষি মারতে সক্ষম হন। ৪র্থ রাউন্ডে লিস্টন সামলে উঠেন। এ সময়ে আলীর চোখে ধুলো ঢোকায় তিনি ঠিকমত দেখতে পারছিলেন না। তিনি শুধু লিস্টনকে ঠেকিয়ে যাচ্ছিলেন। ৬ষ্ঠ রাউন্ডে আলী সামলে উঠেন এবং ৭ম রাউন্ডে লিস্টন পরাজয় মেনে নেন, যা অনেকের মনে ম্যাচটি পাতানো বলে সন্দেহের জন্ম দেয়।
 
ক্যাসিয়াস ক্লে থেকে মোহাম্মদ আলী
শিরোপা জয় করার পর তিনি দ্রুত খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যান। এ সময় তিনি ঘোষণা দেন তিনি ‘নেশন অফ মুসলিম’ গোত্রের সদস্য। তার নাম রাখা হয় ক্যাসিয়াস এক্স, কারণ তিনি মনে করতেন তার পদবী দাসত্বের পরিচায়ক। এর কিছুদিন পর গোত্র প্রধান সাংবাদিকদের কাছে তাকে মোহাম্মদ আলী বলে পরিচয় করিয়ে দেন।
 
ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার
১৯৬৪ সালে তিনি সৈনিক জীবনে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ার কারণে। ১৯৬৬ সালে তিনি উত্তীর্ণ হন। তবে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন যে কোরআন যুদ্ধ সমর্থন করে না। আল্লাহ বা নবীর নির্দেশ ছাড়া তিনি যুদ্ধে যাবেন না। কোনো ভিয়েতকংয়ের সঙ্গে তার বিরোধ নেই, তারা কেউ তাকে কালো বলে গালিও দেয়নি। তিনি ক্যাসিয়াস ক্লে বলে পরিচিত হতে চাননি। যার ফলে তাক গ্রেফতার করা হয়। সাময়িকভাবে ইতি পড়ে বক্সিং কেরিয়ারেও। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার এই অবস্থানই তাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৭০ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিনি লড়াইয়ে ফিরে আসতে সমর্থ হন।
 
১৯৬৫ সালে লিস্টনের সঙ্গে ফিরতি ম্যাচের পর ১৯৬৭ সালে জরা ফলির সঙ্গে ম্যাচের মধ্যে তিনি নয় বার শিরোপা রক্ষার লড়াইয়ে নামেন। খুব কম বক্সারই এত কম সময়ে এত বেশি বার লড়াই করেন। তার জীবনের একটি অন্যতম কঠিন লড়াইয়ে তিনি ১২ রাউন্ডে জয় লাভ করেন। আলী ১৯৬৬ সালে ক্লিভলান্ড উইলিয়ামসের সঙ্গে লড়াই করেন। এটি তার সেরা ম্যাচগুলোর একটি যেটিতে তিনি ৩ রাউন্ডে জিতেন। ১৯৬৭ সালে তিনি হিউস্টনের একটি রিংয়ে এরনি তেরেলের সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন। তেরেল তাকে ম্যাচ এর আগে ক্লে বলে অপমান করেন। আলী তাকে সঠিক শাস্তি দেয়ার মনস্থির করেন। ১৫ রাউণ্ডের এ লড়াইয়ে তিনি তাকে রক্তাক্ত করেন। অনেকে মনে করেন যে আলী ইচ্ছা করে লড়াই আগে শেষ করেননি।
 
শতাব্দীর সেরা লড়াই
মার্চ ১৯৭১ সালে আলী জো ফ্রেজিয়ারের মুখোমুখি হন যা ‘শতাব্দীর সেরা লড়াই’ হিসাবে পরিচিত। বহুল আলোচিত এ লড়াইটি ছিল দুই মহাবীরের লড়াই, যা সকলকে শিহরিত করে। জো ফ্রেজিয়ার খেলায় জয়লাভ করেন ও আলী প্রথমবারের মতো পরাজিত হন। ১৯৭৪ সালের ফিরতি লড়াইয়ে তিনি অবশ্য শিরোপা পুনরুদ্ধার করেন।
 
তিনি ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে জর্জ ফোরম্যানের সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন যা ‘রাম্বেল ইন দ্য জাংগল’ বলে পরিচিত। আলীর ঘোর সমর্থকরাও এতে আলীর সম্ভাবনা দেখেননি। ফোরম্যান ও নর্টন আলীর সঙ্গে প্রবলভাবে লড়াই করেন ও জর্জ তাদের ২ রাউণ্ডে পরাজিত করেন। ফোরম্যান ৪০টির মধ্যে ৩৭টি লড়াই নকআউটে জিতেন ৩ রাউন্ডের মধ্যে। আলী এ ব্যাপারটিকে কাজে লাগাতে চাইলেন। সবাই ভেবেছিল তিনি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে লড়াই করবেন, কিন্তু তিনি দূরে দূরে থাকতে লাগলেন। ফোরম্যানকে তিনি আক্রমণ করতে আমন্ত্রণ করলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তাকে ক্লান্ত করে দেয়া। ৮ম রাউন্ডে তিনি তার সুযোগ পেয়ে গেলেন ও ফোরম্যানকে নকআউট করলেন।
১৯৭৫ সালে আলী লড়াই করেন ফ্রেজিয়ার এর সঙ্গে। দুজন বীরের এ লড়াইয়ের জন্য সকলে খুবই উত্তেজিত ছিল। ১৪ রাউণ্ডের শেষে ফ্রেজিয়ার এর কোচ তাকে আর লড়াই করতে দেননি কারণ তার এক চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফ্রেজিয়ার এর কিছুদিন পরই অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের এক লড়াইয়ে তিনি ১৯৭৬ এর অলিম্পিক মেডালিস্ট লিয়ন স্পিংক্স এর কাছে খেতাব হারান। তিনিই প্রথম যিনি একজন অপেশাদার এর কাছে হেরেছিলেন।
 
বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ
মোহাম্মদ আলী ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সফর করেন। সরকারের আমন্ত্রণে পাঁচ দিনের এই সফরের সময় তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয় এবং সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। পাশাপাশি তিনি তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে তিনি প্রদর্শনী লড়াইয়ে অংশ নেন। তার প্রতিপক্ষ ছিল ১২-বছর বয়সী মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন।
 
অবসর গ্রহণ
তবে তিনি ১৯৮০ সালে ফিরে আসেন ল্যারি হোমস এর কাছ থেকে শিরোপা ছিনিয়ে নিতে। ল্যারি ছিলেন তার শিষ্য তাই সকলেই লড়াইটি নিয়ে আগ্রহী ছিল। ১১ রাউন্ড পর আলী পরাজিত হন। পরে জানা যায় মস্তিস্কে মারাত্মক ত্রুটি ধরা পরেছে। তার মস্তিষ্ক ফুঁটো হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি ১৯৮১ সালে অবসর গ্রহণ করেন (৫৬ জয় ৩৭টি নকআউটে ৫ পরাজয়)।
 
অসুস্থতা
১৯৮১ সালের বক্সিং থেকে অবসরের তিন বছরের মাথায় পারকিনসন্স ব্যাধিতে ‍আক্রান্ত হয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী। ২০১৪ সালে এই রোগের জন্য ডাক্তাররা তাকে নিয়ে অনেকটা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন তিনি। আলীর একসময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রেজার বলেছিলেন, “আলী জানেই না তাকে কীভাবে মারা যেতে হবে। আমি বিশ্বাস করি না বক্সিংয়ের এই লিজেন্ড মারা যেতে পারেন।”
 
মারাত্মক মূত্রনালীর সংক্রমণে ভুগে গত বছরের জানুয়ারিতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এ ক্রীড়াবিদ। চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্স শহরের একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনবারের হেভিওয়েট এই চ্যাম্পিয়ন। লড়াকু এ কিংবদন্তি বক্সার শেষ পর্যন্ত একের পর এক অসুস্থতার সঙ্গে লড়েই মৃত্যুবরণ করেন।

-সংবাদমাধ্যম


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

আরও অন্যান্য সংবাদ