,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

অস্ত্রের আস্ফালনই বিজেপির ধর্ম, লক্ষ্য বাংলা দখল

লাইক এবং শেয়ার করুন

সুকুমার মিত্র, কলকাতা # হঠাৎ কেন বাঙালী রাম নবমী নিয়ে মেতে উঠল? এই প্রশ্নের উত্তর সকলেরই জানা। এর সঙ্গে রামভক্তির কোনও সম্পর্ক আছে এমনটাও নয়। যারা বুধবার অস্ত্র হাতে মিছিল করলেন তাঁদের হাতে কোনও দিন রামায়ন কাব্যগ্রন্থটি ওঠেনি। বাল্মিকীর কাব্যের রামের বাবা-মায়ের নামও জানেন না এঁদের ৯০ শতাংশ। আসলে আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনের মুখে হিন্দুত্বের জিগির তুলে সিপিএমের নীচুতলার হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটকে তাদের অনুকুলে টেনে আনা। সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত উপ নির্বাচনে সেই ইঙ্গিত পেয়েই রাম নবমীর দিনটিকে বেছে নিয়েছে উগ্র হিন্দুত্বের প্রচার কর্মসূচি হিসেবে।

অস্ত্রের আস্ফালনের মাধ্যমে রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ ও তাঁর অনুগামীরা একদিকে সংখ্যালঘুদের মনে নিরাপত্তার অভাব সৃষ্টি করা পাশাপাশি হিন্দুত্বের সুড়সুড়ি দিয়ে অধিকাংশ হিন্দু ভোট নিজেদের দিকে টেনে আনা। আর প্রয়োজন হলে অস্ত্র হাতে হিন্দুদের একটা অংশ রাস্তায় নেমে দাঙ্গা করতে সক্ষ‌ম হবে কিনা তা একবার পরখ করে দেখলেন সংঘ পরিবারের নেতৃত্ব। কোচবিহার থেকে সাগর, বর্ধমান থেকে দক্ষ‌িণ দিনাজপুর সর্বত্রই বজরং বাহিনীর অস্ত্রের আস্ফালন লক্ষ‌্য করেছেন রাজ্যবাসী। ওয়াকিবহাল মহলের ধারনা, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে সুপরিকল্পিতভাবে রাজ্য জুড়ে দাঙ্গার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। বুধবার রাম নবমীতে সেই মহড়া হয়ে গেল। শুধু প্রাপ্ত বয়স্করা নন, মা ও শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে  দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এক গণ হিস্টিরিয়ার রূপ নিয়েছিল বুধবারের পশ্চিমবঙ্গ। যা অতীতে কেউ কখনও দেখেননি। এই মিছিল কোনটাই স্বতস্ফুর্ত নয়, সংঘ পরিবারের সংগঠিত ষড়যন্ত্রের বর্হিপ্রকাশ। আর তাই খুব সঙ্গত কারণেই রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষ‌া কমিশন রাজ্যের প্রতিটি জেলাশাসকের কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে।

আসলে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছে বিজেপি। রাজ্যের ৭৭ হাজার বুথে বুথ কমিটি গঠন করে পঞ্চায়েতের সব আসনে বিজেপি প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সংগঠন সূত্রে জানানো হয়েছে তাদের একাজ ৬৬ শতাংশ ইতিমধ্যে তারা সেরে ফেলেছেন। এইটা যে নিছকই কথার কথা নয় তার প্রমাণও তাঁরা রেখে গেলেন ৬ এপ্রিল গোটা রাজ্যে। বুধবার পশ্চিমবঙ্গের যে রূপ রাজ্যবাসী প্রত্যক্ষ‌ করেছেন তা আগে কখনও দেখেননি। বিশিষ্টজনেরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সর্বধর্ম সমাবেশের ডাকও সম্প্রীতি রক্ষ‌ায় ডাকা হয়েছে। এসবই ঠিক। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ‌ শক্তিকে এখন খুব জোরের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের রাজনীতিকে আঘাত না হানলে পশ্চিমবঙ্গ গুজরাতকে ছাপিয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সংসদীয় গণতন্ত্রে একজন বিজেপি বিধায়ক দিলীপ ঘোষ সশস্ত্র মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পুলিশ অবশ্য খড়গপুর টাউন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা রুজু করেছে। বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা বলেছেন , তলোয়ার এখন ঘরে সাজিয়ে রাখার জন্যও ব্যবহৃত হয়। এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক উঠে আসছে সন্ত্রস্ত করার জন্য অস্ত্রের প্রদর্শনী রাজ্যবাসীকে ভয় দেখানোটা কেন রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা ইউএপিএ-র আওতায় আসবে না। রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুলিশের বিনা অনুমতিতে সর্বত্র পরিকল্পনা মাফিক প্রকাশ্য সশস্ত্র আস্ফালন তো রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। পুলিশের নির্দেশ অমান্য করে রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ হুঙ্কার ছেড়ে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের কাজ করব।’ অর্থাৎ জ্ঞানত একটা অপরাধ রাজ্য জুড়ে করার পর ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বিজেপি নেতা বলছেন তাঁদের কাজ তাঁরা করবেন। খুব সঙ্গতভাবেই বলা যায় তুলসীদাস, কৃত্তিবাস বা বাল্মিকীর রাম আর বিজেপির রাম এক নন। বিশ্বকবির ভাষায় বলা যায়, ‘তব মনোভূমি  রামের জন্মস্থান অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো’। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে ‘চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী।’ 

কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও বাবরি মসজিদেই রাম জন্ম গ্রহণ করেছেন, এমনটাই প্রচার করে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল।ওখানেই রয়েছে রামলালা। আর এই কুযুক্তি সেদিন ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল হিন্দুত্ববাদীদের। ঐতিহাসিক এক স্থাপত্যকে ভেঙে ফেলা হল। এর আগে ও পরের ঘটনা সকলেরই জানা। আর অস্ত্রের আস্ফালন দেশবাসী সেদিনও প্রত্যক্ষ‌ করেছে।

সংঘ পরিবার চাইছে পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রদায়গত সমীকরণ তৈরি করতে। উত্তরপ্রদেশে মোদি, অমিত, আদিত্যনাথেরা কসাইখানা, কবরস্থান থেকে শুরু করে দীপাবলী, ঈদ সর্বত্র রাজনৈতিক সমীকরণ করতে অনেকটাই সফল হওয়ার পর বিজেপির লক্ষ‌্য পশ্চিমবঙ্গ। আর এই লক্ষ‌্য পূরণের জন্যই বাঙালীর সংস্কৃতি মননকে ধ্বংস করে অস্ত্রের আস্ফালনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের আশঙ্কা বিজেপি ২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষ‌া করতে রাজি নয়। তাই পশ্চিমবঙ্গে সংঘ পরিবার খুব শীঘ্রই রাজ্য জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে এটা দেখিয়ে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সরকারকে ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন করতে চায়। আর রাষ্ট্রপতি শাসনে পঞ্চায়েত নির্বাচন করে প্রত্যন্ত গ্রাম গ্রামান্তরে হিন্দুত্বের মূলকে প্রসারিত করার লক্ষ‌্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে। বুধবার রামনবমীর মহড়া দিয়ে নাড়ি টিপে হিন্দুত্ববাদীদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেছে।

বুধবারের চেহারা দেখার সময় পাঁচ দশক আগের একটা স্মৃতি মনে পড়ে যায়। তখন আমাদের ছেলেবেলা ঠাকুরমার হাত ধরে পাড়ায় পাড়ায় রামযাত্রা দেখতে যেতাম। সেই যাত্রা দেখতে পার্শ্ববর্তী এলাকার মুসলিমদের কেউ কেউ নিয়মিত আসতেন। কেন আসতেন, এই প্রশ্ন সেই সময় জানার প্রয়োজন অনুভব করিনি। আর প্রশ্ন মনের কোণে উকিও মারেনি। যাত্রার মাঝে রাম-সীতা-লক্ষ‌ণ-এর মালা ডাক হতো। যাকে বলে নিলামে মালা বিক্রি। প্রধানত প্রতিদিন ওই দুই, তিনটি মালা ডাকা যা আয় হতো প্রধানত সেটাই ছিল যাত্রা দলের প্রধান আয়। এছাড়া মা, ঠাকুরমার আঁচলে বাঁধা পয়সা যা পেতেন সেটা ছিল বাড়তি পাওনা। সেই রামযাত্রা যাঁরা দেখতেন তাঁদের কেউই রাম নবমীতে সশস্ত্র মিছিল করা তো দূরের কথা কবে সেই দিনটি সেই খোঁজও তাঁরা রাখতেন না। কারণ বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে জনপ্রিয় কালি, শনি, মনসা ও শীতলা। পাড়ায় পাড়ায় কালির থান, শীতলার থান, মনসার থান ও শনির থান।

সম্প্রতি কয়েক বছরে সেই সব থানগুলির মধ্যে বিশেষত শীতলা ও মনসার থান অনেক জায়গায় উঠেই গেছে। তারও কারণ রয়েছে। দেশ থেকে কলেরা, ডায়রিয়া, ওলাওঠা বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে শীতলার কদর কমে যায়। এরপর করুণ অবস্থা হয়েছে মনসাদেবীর। কারণ হাসপাতালে হাসপাতালে সাপে কাটা ওষুধ থাকার ফলে যেমন সাপের ওঝার কদর কমেছে তেমনি মনসার প্রয়োজন অনেক কমেছে। সুন্দরবন এলাকায় এখন মনসার গুরুত্ব কিছুটা রয়েছে। তবে শনি ও কালির থান জমিদারি আমল থেকে যা ছিল, তা ছিলই। বামফ্রন্ট ক্ষ‌মতায় আসার পর রাজ্যের প্রতিটি রেল স্টেশনে, বাস টার্মিনাসে সিটু অনুমোদিত শনি ও কালি এক মন্দিরে পাশাপাশি সহবস্থান করছেন এই দৃশ্য সকলের নজরে পড়েছে। থানায় থানায় কালিপুজো সে তো অনেকটা সরকারি নিয়মের মত হয়ে গিয়েছে। শিল্পাঞ্চলে বহু মুসলিম শ্রমিক বিশ্বকর্মা পুজোয় অংশ গ্রহণ করে থাকেন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো সেও তো একরকম অনুমোদন পেয়ে আছে বহু বছর ধরে। এসব নিয়ে অন্য কোনও সম্প্রদায়ের মানুষরা কোনও প্রশ্ন কোনও সময় তোলেনওনি। কিন্তু নবী দিবস পালনের দাবি যদি কেউ তোলেন তবে তাঁকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেওয়া হয় খুব সহজেই। সম্প্রীতির এই বাতাবরণই বিজেপির প্রধান প্রতিবন্ধক। তাই সেই মূলে আঘাত করাটাই তাদের লক্ষ‌্য।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের পর থেকে হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ অলক্ষ‌ে এক বিরাট জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি বিভেদের রেখা কেটে দিয়ে গিয়েছে। আর সেই পরিকল্পিত বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্য দিয়েই পরস্পর অবিশ্বাস শুধু নয়, সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ক্রমাগত ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে সুকৌশলে। একবার তো রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেই বসলেন, মাদ্রাসাগুলি হল জঙ্গীদের আস্তানা। একেবারে বিজেপির সুরের সঙ্গে সুর মিলে গিয়েছিল বুদ্ধবাবুর সেই মন্তব্যে। এর আগে গুজরাতে গণহত্যা চালিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। সেই গণহত্যা বা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কোনও বিচার পায়নি ক্ষ‌তিগ্রস্ত সম্প্রদায়। হিন্দুর টিকি, কপালে টিকা থাকলে সে জঙ্গী হন না।

মুসলিমের গালে দাঁড়ি থাকলে তাঁকে সহজেই জঙ্গী বা মৌলবাদী বলে প্রচার করা হয়। আর এই সব প্রচারে সূত্র ধরে ঘরে ঘরে হিন্দুত্ববাদীদের দর্শনের অনুপ্রবেশ ঘটে গিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ‌ মানুষেরা যদি সংগঠিতভাবে মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত না হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে ঠুনকো কিছু ইস্যু নিয়ে মেতে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যেন তেন প্রকারে আক্রমণ, ব্যাক্তিগত কুৎসা ছাড়া এদের আর কোনও কাজ নেই। আর এই সুযোগ ষোলআনা নিচ্ছে বজরং দল সহ সংঘ পরিবারের ৩৬টি সংগঠন। এরা বেশ ভাল ভাবেই এই রাজ্যে শিকড় গেড়ে ডালপালা মেলে বিস্তার করেছে। রামনবমীর মিছিল দেখে যদি ধর্মনিরপেক্ষ‌ শক্তির ঘোর না কাটে তাহলে পশ্চিমবঙ্গ হবে সংঘ পরিবারের সব চেয়ে শক্ত ঘাঁটি। আর সেই ঘাঁটিতে বিজেপির ক্ষ‌মতায় চলে আসা কোনও আকাশ কুসুম কল্পনা নয়। সাধু সাবধান!


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ