,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আসুন অধিকার বঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াই ।। এম নজরুল ইসলাম নয়ন

লাইক এবং শেয়ার করুন

শিশু শব্দটির সাথে জড়িত আছে মায়ের মমতা, বাবার আদর্শ ও পরিবারের ভালবাসা। শিশুদের নিয়ে একটি স্নেহের ও মায়াভরা পরিবেশ সৃষ্টি হয় নিজের অজান্তে ও মনের গহীনে। পৃথিবী এখন বিজ্ঞানের, প্রযুক্তির, স্যাটেলাইটের, নতুন বিশ্বের শ্লোগানে, গ্লোবালের অত্বল গহরে। অনেক শিশুই সুখের প্রাচুর্যের ভিতর। কিছু শিশু আছে, অভাব আর হত দরিদ্রের সাথে যুদ্ধরত আর বড় হচ্ছে প্রচন্ড অভাবে। আমাদের চারিদিকে অশান্তি, অন্যায়, অরাজকতা, ভারসাম্যহীনতা, অস্বস্তি ও অস্থিতিশীলতা।

পৃথিবীতে ঘন্টায় ১৬,০০০ জন শিশু জন্ম নিচ্ছে। শিশু অবস্থায় ঘন্টায় ৬০০ জন মারা যাচ্ছে। ইউনিসেফ হিসাব করে দেখেছে, পৃথিবীতে এভাবে প্রতি বছর ১কোটি ২০ লাখেরও বেশি শিশু মারা যায়। আমাদের বাংলাদেশের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, এখানে জন্ম নেয়ার সময় ৭জনের মধ্য একজন শিশু মারা যায়। যারা বেচে থাকে, এদের শতকরা ৭০জন অপুষ্টিতে ভোগে। মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগে শতকরা ১১জন, মারাত্মক ডায়রিয়ায় ১৯৯৬সালে মারা যায় ১লাখ ১০হাজার জন শিশু। প্রত্যেক বছর প্রায় ৩০,০০০ হাজার শিশু ভিটামিনের অভাবে অন্ধ হয়। এক বছর যেতে না যেতেই সেইসব শিশু চলে যায় না ফেরার দেশে। তাদের সংখ্যা ৫,০০,০০০ পাচ লাখে। শিশু অধিকারে মোট রয়েছে ৫৪ধারা, কিন্তু আজ দুস্থ্য, অসহায় ও গরীব শিশুদের বেলায় কোন উদ্যোগ নেই বললেই চলে।

গত ৭আগষ্ট আমি সহ বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলা জাতীয় যুবসংহতির আহবায়ক গোলাম মোস্তফা কামাল, পৌর শহর কমিটির সদস্য সচিব রাকিব হাসান রকি, শ্রমিক নেতা বেলাল হোসেন, হায়দার আলী, এবং উপজেলা টাইগার ক্লাবের নেতৃবৃন্দ মিলে ঘুরতে গিয়েছিলাম নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলা সদরের পয়েন্ট নামের একটি ক্ষুদ্র পর্যটক কেন্দ্রে। স্থানীয়রা ওই জায়গায় না দিয়েছেন মিনি কক্সবাজার। রয়েছে চলনবিল ও নৌকার সাাঁড়ি। বিভিন্ন জেলা-সদরের মানুষ পয়েন্টে ভ্রমনে আসেন। সেখানে গিয়ে স্থানীয় শহরে বেশকিছু পথশিশুর সন্ধান মেলে। যাদের শরীরে ভালো কোনো কাপড় নেই। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ড্রিংস বোতল, নোংড়া কাগজ ও হোটেলে প্লেট আবর্জনা পরিস্কার করে তাদের পেটে দু-মুঠো ভাত ওঠে।

শিশুশ্রমে কঠোর আইনী নিতিমালা থাকলেও শিশু-কিশোরদের দিয়ে কঠিন ও ভাড়ি কাজ করানো হচ্ছে। পথশিশুদের দেখে থমকে দাড়িয়ে থাকলাম। এরপর অসহায় ও অধিকার বঞ্চিত ১৭জন শিশু কিশোরদের সাথে নিয়েই রওনা হলাম মিনি কক্সবাজারে আনন্দের মাঝে। পথশিশুদের নিয়ে সারাদিন পিকনিক করে, খেলাধুলা করে, তাদের উপহার দিয়েছি। একদিনের জন্য হলেও শিশুগুলো ভুলে গিয়েছিল তারা পথশিশু। যার যতটুকু আছে, তা নিয়েই মহান হৃদয়ে মানবতার কল্যাণে আমরা সবাই যদি এই শিশুদের পাশে দাঁড়াই, তাহলে দেশের চিত্র ভিন্ন হয়ে যাবে। ধনী হউক, দরিদ্র হউক, ফর্সা হউক বা কালো হউক, সব শিশুই যে পবিত্র এই কথাটি সত্য। একটা বয়স পর্যন্ত প্রতিটি শিশু সবার কাছে পবিত্র ও আদরের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়।

এই শিশুদের একটি বিশাল অংশ যাদের পথশিশু হিসেবে অভিহিত করা হয়। তারা পারিবারিক বন্ধন থেকে বঞ্চিত হয়েই ঠিকানা বিহীন জীবন অতিবাহিত করছে। মা-বাবার যেমন সঠিক পরিচয মেলেনা, ঠিক তেমনি স্থায়ী কোন নির্দিষ্ট ঠিকানাও তাদের নেই। এইতো সেদিন বগুড়া সদর, জেলার নন্দীগ্রাম ও শেরপুর উপজেলা সদরের স্থানীয় বাসষ্ট্যান্ডের কয়েকটি হোটেল রেস্তেরায় গিয়ে দেখলাম শিশুদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। অল্প পারিশ্রমিকে ভাড়ি ও কঠিন কাজ করিয়ে নিচ্ছে কিছু ব্যবসায়ী। যেই বয়সে তাদের স্কুলে গিয়ে পড়াশুনা করার কথা সেই বয়সে শিশুদের দিয়ে কাজ করানা হচ্ছে। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার কারণেই দিনদিন পথশিশুদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

এই সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে তাদের নিয়ে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এই পথশিশুরা জীবিকার প্রয়োজনে এবং তদারকির অভাবে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সাথেও জড়িত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিজেকে দিনদিন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সুশিক্ষা ও সুনামের অভাবে এক সময় এই কচিকচি পথশিশুরা মাদকপাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ব্যক্তিগত জীবনে সেও মাদকাসক্তে পরিণত হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ঢাকা আহছানিয়া মিশন আয়োজিত এক সেমিনারে পথশিশুদের অনেক সমস্যার মধ্যে মাদক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। এক সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১১লাখ। এরমধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখই মাদকাসক্ত।

যেসকল শিশুরা ভবিষ্যতের নাগরিক, তারাই যদি মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসনে আসক্ত হয়, তাহলে আমাদের এই সবুজ শ্যামলা বাংলাদেশে ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ চিত্রই চোখের সামনে ভেসে উঠে। মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এই শিশুরা অর্থের পিছনে ছুটে। ফলে অর্থ যোগাড় করতে গিয়ে তারা অপরাধ জগতের সাথে পরিচিত হয়। একটি অপরাধ থেকে অন্য অপরাধে জড়িত হতে হতে এক সময় স্বাভাবিক জীবন থেকে অনেক দূরে সরে যায় তারা। মাদকের অর্থ যোগাড় করতে শেষ পর্যন্ত খুন-হত্যার মত জঘন্য কাজে লিপ্ত হয় যা একজন শিশুর পক্ষে অচিন্তনীয় ব্যাপার। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষার লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে দুইটি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্প দু’টি হচ্ছে, চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রটেকশন-ইন-বাংলাদেশ (সিএসপিবি) প্রকল্প এবং সার্ভিসেস ফর দ্যা চিলড্রেন এট রিস্ক।

চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রটেকশন-ইন-বাংলাদেশ (সিএসপিবি) প্রকল্প প্রটেকশন অব চিলড্রেন এ্যাট রিস্ক (পিকার) প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় ইউনিসেফ-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রটেকশন-ইন-বাংলাদেশ (সিএসপিবি) শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির মেয়াদ জানুয়ারি ২০১২সাল থেকে ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত। প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য হলো-   ২০১৬ সালের মধ্যে নির্বাচিত ২০টি জেলা’র নারী, শিশু ও যুবসম্প্রদায় কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নীতিসমূহের দাবি এবং উপযুক্ত সেবা প্রাপ্তির মাধ্যমে নির্যাতন, অবহেলা, শোষণ ও পাচার বিলোপ সাধনে সক্ষম হবে। দেশের সব শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শিশু উন্নয়ন ও কল্যাণের মাধ্যমেই সম্ভব জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।

এজন্য পথশিশুদের উন্নয়নে জাতীয় শিশুনীতির আদলে পৃথক একটি পথশিশু নীতিমালার দাবি করেছে, স্ট্যান্ডিং কমিটি অন সোস্যাল প্রোটেকশন অব স্ট্রিট চিলড্রেন (সিপ-ডিপিএসসি)। যা বাস্তবায়িত হলে দেশের ১১লাখ পথশিশুর উন্নয়ন তরান্বিত হবে বলে দাবি করছে সিপ-ডিপিএসসি। পথহারা শিশুরা পথ হারিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা বিভিন্ন ভাঙারি সংগ্রহ, বাদাম বিক্রি, কুলিগিরি, সিগারেট বিক্রি, হোটেল বয়, গাড়ির গ্যারেজ, হকারগিরি, বাসা-বাড়ি, মাদকদ্রব্য বিক্রি, চুরি, পকেটমারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। যা জাতীয় উন্নয়নের অংশীদারদের জাতীয় ব্যাধিতে পরিণত করছে বলে অভিযোগ করেন। এরকম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে এসব শিশুরা সবসময় চুলকানি, পেটপীড়া, জ্বর, জন্ডিসসহ নানা ধরনের সংক্রামক ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর স্বাভাবিক জীবনধারা লাভে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ‘শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র কক্সবাজার’ এর দুইটি ভবনে শহরের ঝুঁকিপুর্ণ ১৭৯ জন শিশুর মধ্যে ৪০জন পথশিশুর আশ্রয় মিলেছে। সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ সমাজসেবা অধিদফতরের ‘সার্ভিসেস ফর চিলড্রেন এট রিস্ক (স্কার)’ প্রকল্পের আওতায় এসব ঝুুঁঁকিপূর্ণ শিশুদের সার্বিক সেবা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মনোসামাজিক সেবা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা ও কর্মমূখী প্রশিক্ষণ সুবিধা প্রপ্তির পাশাপাশি সুন্দর পরিবেশে আশ্রয় পেয়ে খুবই খুশি পথশিশুরা। তারা যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। দীর্ঘদিন মানবেতর দিন কাটানোর পরে পথশিশুদের কাছে এই সহযোগিতা অনেক বড় কিছু উপহার পাওয়া।

তাদের প্রত্যাশা এই পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকেই পথশিশুরা নতুন জীবনের সন্ধান পাবে। আমাদের দেশে অনেকে আছেন যারা শতশত কোটি টাকার মালিক। তারা ইচ্ছা করলেই একজন ব্যক্তি দশজন শিশুর দায়িত্ব নিতে পারেন। দশ জনের না হলেও একজন করে শিশুর দায়িত্ব নিলেও আমাদের দেশের শিশুদের এই অবস্থাই থাকবেনা। আসুন আমরা সবাই মিলে অধিকার বঞ্চিত পথশিশুদের পাশে দাড়াই।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ