ছড়া সাহিত্যে ছড়াকার আবু সালেহ অনন্য অসাধারণ : সৈয়দ রনো

এই সংবাদ ২২৩ বার পঠিত

পদ্য ও ছড়াশিল্পের কারুকার্যে বাংলা সাহিত্যের সূচনা। পৃথিবীর অধিকাংশ সাহিত্যের আদিরূপ গীতিরসে টইটম্বুর। পদ্য, ছড়া কিংবা গীতি কবিতায় বাংলা সাহিত্যের এক অপার মুগ্ধতার আবেগি স্থান। বিশ্বাঙ্গনের বিভিন্ন সাহিত্যের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের ধারায় বাংলা সাহিত্যেও বিভিন্ন বাক বদল হয়েছে। বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত হবার রূপকার যদিও মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত কিন্তু আদ্যপান্ত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ৩০ দশকের সকল কবিদের কমবেশি অবদান লক্ষনীয় যার কারনে তারা স্বরণীয় বরনীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন কাল হতে কালান্তর। এখানে গীতি কবিতা, পদ্য এবং ছড়ার বাইরেও নতুন আঙ্গিকে মুক্ত ছন্দের অনেক কালজয়ী কবিতা বাংলা সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন।

মানুষের ভাব ভাষা ভাবনার সাথে জ্ঞানের মিশেলে অভিনব চালে কাব্যচর্চার সফল প্রয়োগ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগুতে থাকে যা পূর্ণতার আলোতে উদভাসিত। কাব্যচর্চাকে বৃত্তের বাইরে এনে নতুন মাত্রা সংযোজন করার ক্ষেত্রে অনেকেই নমস্য। বর্তমান ছড়া সাহিত্যের গতিহীন ইঞ্জিনে সমসাময়িক ভাবনার রসদে গতির সঞ্চারকদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আলোচ্য ছড়াকার আবু সালেহ। ৫০, ৬০, ৭০ এবং ৮০ দশকে ছড়া সাহিত্যের ঝান্ডা হাতে রাজপথ কাঁপানো কষ্ঠস্বর ছড়াকার আবু সালেহ। তিনি মানবিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান মানবিকতার শক্তি নিয়ে। তার ছড়া কাঁপিয়ে তুলে জোর-জুলুমবাজের মসনদ। আবু সালেহ এর ছড়া হয়ে উঠে প্রতিবাদ মুখর লক্ষ কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর। যেখানে জোর-জুলুম অনৈতিকতা সেখানেই আবু সালেহ এর ছড়া প্রতিবাদের প্রাসঙ্গিক ভাষা। বিষয় নির্বাচন, শব্দ প্রয়োগ ছন্দের ব্যবহার এবং অন্তমিলের ক্ষেত্রে অন্যান্য ছড়াকারদের চেয়ে আলাদা বলে আবু সালেহ নিজস্ব আলোর বিকিরণে অন্ধকারছন্ন ঘুট-ঘুটে রাতের বুকে উদিত লক্ষ কোটি নক্ষত্রের আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে মানুষের মনের জমিনে পাকা পোক্ত আসন পেতে জাকিয়ে বসেছেন। ছড়াশিল্প যেহেতু সাহিত্যের কোন নতুন শাখা নয় সেহেতু আদি ঐতিহ্যের চলন্ত ট্রেনে ছড়াকার আবু সালেহ নতুন বগির সংযোগ ঘটান যা সময়ের নতুন ভাবনার গতিতে চলমান। যখন ছড়াকার আবু সালেহ লেখেন-

‘ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবে না
বলা যাবে না কথা
রক্ত দিয়ে পেলাম শালার
আজব স্বাধীনতা।’

এরূপ পংতি লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ের তন্ত্রীতে ঢেউ খেলে যায়। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আবু সালেহ এর ছড়া হয়ে উঠে সার্বজনীন। নিপিড়িত নির্যাতিত জনতার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ছড়ার চালে আবু সালেহ মানুষকে শুধু মোহিতই করেন না আবেগের বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে জান অন্য এক জগতে, যেখানে সপ্নীল ছায়া ঘেরা মায়ার বাঁধনে মানুষে মানুষে গড়ে তুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। তিনি লেখেন-

‘কোনটা সবুজ কোনটা কালো 
কোনটা সাদা লাল ছিলো
না জানতাম ভালো ছিলো।’

ছড়ার নতুন চালে কিংবা একে বারেই প্রচলিত শব্দে সত্য এবং সুন্দরকে ফুঁটিয়ে তুলেছেন পাঠক উপজীব্য করে। ছড়া পাঠের যে গতিময়তা কিংবা অন্তমিলের যে, নতুনত্বের ঘ্রাণ তা আবু সালেহের ছড়াতে পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের মনের কথা ছড়ার ছন্দে তিনি অবলিলায় লেখার এক অপরূপ লাবন্যের নিপুন কারিগর। রাজনৈতিক অঙ্গনের টানা পোড়েন কিংবা সংঘাত নিয়ে তিনি যেমন ছড়া লিখেছেন তদরূপ লিখেছেন সামাজিক নানা রূপ অসংগতি নিয়েও ইতিহাস আশ্রিত সত্য উচ্চারনেও কিন্তু আবু সালেহ পিছু হটেননি। সত্য উচ্চারন করতে গিয়ে নানা রূপ বাধা বিপত্তির সম্মুখিন হয়েছেন। কখনো কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। আবু সালেহ এর অনেক ছড়ারই অর্থ খোঁজার জন্য বুঝা না বুঝার দোলাচালে পাঠক নিপতিত হলেও তিনি সেই সব ভাবগাম্ভীর্য্য পূর্ণ ছড়াকে কবিতা বলতে নারাজ। কবিতার বৈশিষ্ট্যে অনেক ছড়া লিখে থাকলেও তিনি ছড়াকার হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। ছড়াকার আবু সালেহ লিখেন-

‘ফালতু কবি হারিয়ে যাক
এবার ছড়া দাঁড়িয়ে যাক।’

ছড়াকার আবু সালেহ ভাই-কে দীর্ঘদিন কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। মনের আয়না দিয়ে তাকে বুঝবার চেষ্টাও করেছি কিন্তু প্রকৃত বিচারে তাকে বুঝে উঠা সম্ভব হয়নি কারন তাকে বুঝার মতো সক্ষমতাই বা কতটুকু আছে আমার। এক রকম ভেবে মনোস্থির করলে পরের সপ্তাহেই তাকে অন্য রকম এক সাধক মানুষ মনে হয়েছে। কবি ছড়াকাররা বোধকরি এ রকমই হয়। আলো আঁধারির লুকোচুরি খেলার ফাঁকে তিনি প্রতিবাদ করেছেন সাবলীল ভাষার মাধুর্যে। ছড়া সাহিত্যে তিনি জীবন্ত কিংবাদন্তী এটা নি:সন্দেহে বলা যায়। আবু সালেহ স্বভাবজাত ছড়াকার। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি ঝাঁপিয়ে পরে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা পাকিস্থানের হানাদার বাহিনীর হাত থেকে ছিনিয়ে আনেন। যে স্বপ্ন তিনি বুকের জমিনে লালন পালন করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর তার সেই স্বপ্ন আর শাষক গোষ্ঠি দ্বারা পূরন হলো না। তিনি শুধু ব্যথিতই হননি কাব্যিক হৃদয়ের জমিন ভেঙ্গে চুরে খান-খান হওয়ায় তিনি লিখেন-

‘নস্যারদের কান্ড দেখে
ডরান স্বয়ং আল্লা
যার মাথাতে ঘাটতি ঘিলু
সেইতো দেশের মাল্লা।’

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ধনী আরো ধনী হতে থাকলো মধ্যবৃত্ত হলো নি:স্ব আর গরীব হারালো পৈত্রিক ভিটা এ অবস্থায় ছাড়াকার আবু সালেহ শোষকদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেন ছড়া নিয়ে। আবু সালেহ এর ছড়া সাহিত্য লক্ষ কোটি মানুষের মনের ও মুখের ভাষা হিসেবে টিকে আছে এবং থাকবে তা নি:সন্দেহেই বলা যায়। ইতিমধ্যে তিনি ছড়া সাহিত্যে ২১ এ পদক পেয়েছেন। জয় করেছেন, সাহিত্য প্রেমিকদের হৃদয়। এই অমরত্বের ছড়ার মালা গলায় জড়ানো প্রিয় মানুষের আগামী ২২ জুলাই ২০১৭ তার ৭১ তম শুভ জন্মবার্ষিকী । আজন্ম প্রতিবাদী এই ছড়াকারের শত আয়ু সু-স্বাস্থ্য কামনা করে অগ্রিম জন্মবার্ষিকীর অন্যধারাময় অভিনন্দন জানাই।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com