“সাধু সাবধান, সাহিত্য- গ্রুপগুলোতে অস্থিরতা”।। এবিএম সোহেল রশিদ

৩২ বার পঠিত

বেশ ছিলাম। ফেসবুকের শুরু থেকেই এর সাথে আছি। তখন দেশের ভিতরে খুব একটা ভার্চুয়াল বন্ধু পাওয়া যেতো না। প্রতিবেশী দেশ এবং প্রবাসী বাঙালিরাই ছিল একমাত্র ভরসা। প্রথম প্রথম ইংরেজিতে লিখতাম। সে সময় তুমুল জনপ্রিয় ছিল, ইয়াহু মেসেঞ্জার ও চ্যাট- গ্রুপ। সেই সদস্যরাই ধীরে ধীরে আসতে শুরু করলো ফেসবুকিংএ । আর তখনই শুরু হলো বাংলিশে লেখা। যদিও সীমিত ছিল লেখালেখির সীমানা। তখন কয়েক লাইনের বেশি লেখা যেতো না। . তারপর নানা শ্লীল-অশ্লীল স্রোত পেরিয়ে, শুরু হয়েছিল বুদ্ধিদীপ্ত লেখালেখি। কবিতা- চর্চাও শুরু হয়েছিল জোরালোভাবে।। ছন্দ মিলিয়ে বা গদ্যরীতিতে লেখালেখি চলছিল তখন।

সেগুলো ঠিক উচ্চমার্গীয় কবিতা না হলেও একবারেই অখাদ্য ছিল না। . তখন যারা খুব ভালো বুঝতেন তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় কিছু কিছু নবীনরাও ভালো লিখতে শুরু করেছিল। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে নানাভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল সাহিত্যপ্রেমীরা। খ্যাতিমান কবিদের সাহচার্যে এসে, মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে কবি ও কবিতার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানার শুরুটাও খুব ভালোভাবে হয়েছিল। . এরপর ফেসবুকে সাহিত্যগ্রুপ তৈরি শুরু হলো। লেখার উৎসাহ সবার আরও বেড়ে গেল। মূলত কারো কারো ভাষায় আমরা যারা অকবি, তারাই শুধু এই গ্রুপগুলোতে লিখতাম। প্রথিতযশা কবিদের কবিতাও তখন কেউ কেউ পোস্ট করতো। বেশ আনন্দেই কেটে যাচ্ছিল আমাদের দিন। চলছিল আমাদের মতো করে নীরব সাহিত্যচর্চা।

মূলধারার কবিদের নিয়ে, যারা ভার্চুয়ালের বাইরে বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা প্রদানকে বাণিজ্যিকিকরণ করতো, তারা যখন থেকে ফেসবুকে অনুপ্রবেশ করলো, তখন থেকেই শুরু হলো বিপত্তি। আমাদের কিছু বন্ধুদেরকেও নানা কুপরামর্শ দিয়ে এবং ব্যবহার করে ভার্চুয়াল সাহিত্যাঙ্গনকে কলুষিত করার পাঁয়তারা শুরু করে দিলো। ইনবক্সে চাঁদাবাজি, পদক-ব্যবসা, সম্মাননা- সম্বর্ধনা, পদ-পদবি, অখাদ্য প্রকাশনা ইত্যাদির মাধ্যমে এই পাঁয়তারা চরমে পৌঁছল। আর এ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু মূলত অর্থলাভ বা বাণিজ্যভাবনা। 

যারা সাহিত্যকে ভালোবেসে সঠিক নির্বাচন বা যাচাইবাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদক প্রদান করতো বা এখনও করছে তাদের কার্যক্রমকেও ঐ বেনিয়াগোষ্ঠী প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। তাঁদের নিঃস্বার্থ সাহিত্যসেবাকে স্থবির করে দিতে চাইছে। . সাধু সাবধান। এরাই কিন্তু কবি-অকবির বিভাজন শুরু করেছে। এরাই আমাদের গায়ে ফেসবুকীয় কবির তকমা লাগিয়ে,নীচুজাতের কবি বানানোর চেষ্টা করছে। অথচ ফেসবুকে যারা লেখালেখি করেন,তারা কিন্তু সবাই নিজেকে কবি বলে দাবি করেন না। তারা ভালো করেই জানেন, কবি নিজে থেকেই হওয়া যায় না। হয়তো চেষ্টা করলে দু’চার লাইন কবিতা লেখা যায়। এর বেশি কিছু নয়। আর এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাচ্ছে কিছু কুচক্রীমহল।

তারা যেন কবি বানানোর ফ্যাক্টরি বসিয়েছেন। তাদের ভাষায় যারা বড় কবি, তাঁরাও কিন্তু আজকাল ফেসবুকে লিখছেন। তাঁদের লেখা পড়ে আমরা সমৃদ্ধও হচ্ছি। তাই কে কবি আর কে অকবি তা সময়ই বলে দেবে। কালের আবর্তে কে টিকবে আর কে হারিয়ে যাবে, তা জানতে হলেও সময়ের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে। . আবার বিচ্ছিন্ন নারীঘটিত ব্যাপারগুলো সাহিত্যচর্চার সাথে গুলিয়ে ফেলতে শুরু করছে কেউ কেউ। কাউকে অসম্মান বা ধ্বংস করতে, ফেইক আইডি খুলে আজে বাজে চ্যাটিং করে, তার স্ক্রিনশট দিয়ে নাজেহালও করা হচ্ছে। বদরুল আহসান খানের মত প্রবীণ বাচিক শিল্পীর নামেও ফেইক আইডি খোলা হয়েছে।

অনেক লেখককেই নানাভাবে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হচ্ছে। সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগও হয়তো সবার মিলছে না। তবে আশার কথা, ইদানীং ভুক্তভোগীরা মামলা করা শুরু করেছেন। নতুন আইনে মামলা করে পরিত্রাণ হয়তো পাওয়া যাবে। কিন্তু এই সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে, হয়তো নবীনরা ক্রমাগত উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে সাহিত্যচর্চায়। যে নবীনরা মাদক, ছিনতাই, সন্ত্রাসীতে না জড়িয়ে নিজেদেরকে লেখালেখিতে নিমগ্ন রাখতো; তাদেরকে আবার সে পথে ঠেলে দেয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। . আসুন নিজেদের রক্ষা করতে ঐক্যবদ্ধ হই। এইসব অনিয়ম ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। সকল কুচক্রীদের বিরুদ্ধে সবসময় সজাগ থাকি।

সত্যিকার অর্থেই যারা সাহিত্যে নিবেদিত প্রাণ, তাঁদের সাথে মিশি। ব্যবসা নয়, যারা শুধু সাহিত্যসেবা করতে চান তাদের সাথে একাত্ম হই। একটা বিষয় জানা খুবই জরুরি, টাকা দিয়ে পৃথিবীর সব কিছু কেনা গেলেও সত্যিকার সাহিত্যিক হওয়া যায় না। কবি-লেখক অর্থাৎ সাহিত্যিক হতে হলে, নিজের মেধা খাটিয়েই হতে হবে। যোগ্য হতে না পারলে, মহাকাল সাহিত্যিক হিসেবে কখনোই গ্রহণ করবে না। এর জন্য নিষ্ঠার সাথে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হবে লেখালেখিতে। দূরে থাকতে হবে সকল অনৈতিক কাজ থেকে। প্রত্যাশিত বাতিঘরের দিকেই সবাইকে হাঁটতে হবে। তাহলেই সমৃদ্ধ হবে আমাদের বাংলা সাহিত্য।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com