প্রাক হরপ্পা যুগের সভ্যতার নির্দশন সংরক্ষ‌ণে সাংসদ ডাঃ কাকলী ঘোষ দস্তিদারের উদ্যোগ

৫৪৪ বার পঠিত

তহমীনা খাতুন # এম এ জব্বার (১৯২০-১৯৮৮)- উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়ার খাসবালন্দার ভূমিপুত্র প্রখ্যাত কৃষক নেতা, বিশিষ্ট প্রত্ন গবেষক ও সমাজসেবী এম এ জব্বার। সুন্দরবন অঞ্চলে তিরিশের দশক থেকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজে নিয়োজত ছিলেন। পোর্ট ক্যানিং কোম্পানির বিরুদ্ধে উচিলদহে কৃষক বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর পিতা গান্ধীজির ডাকে লবন সত্যাগ্রহে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে সিপিআই-এর সদস্যপদ লাভ করেছিলেন। সিপিআই বামফ্রন্টে যোগ দেওয়ার পর মতাদর্শগত বিরোধে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। চল্লিশের দশক থেকে চন্দ্রকেতুগড়, খনামিহিরের ঢিবি, বালান্দা, লাল মসজিদ, পিলখানার মঠ সহ নানা এলাকা থেকে পুরাসামগ্রী সংগ্রহ করে তা প্রদর্শনী করতেন এলাকার মানুষকে ইতিহাস সচেতন করার জন্য।

১৯৪৮ সালে নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে তোলেন বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালা। প্রায় ৭০ বছর এই সংগ্রহশালায় দেশ- বিদেশের ইতিহাসপ্রেমী বিদগ্ধ জনেরা এসেছেন। জার্মান থেকে গুস্তভ রথ, রোমিলা থাপার, সুমিত সরকার, আলি নওয়াজ, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ত্রিগুনা সেন, ড. রমেন পোদ্দার, ড. গৌতম সেনগুপ্ত, প্রাক্তন অধিকর্তা পুরাতত্ত্ব বিভাগ, ব্রিটিশ মিউজিয়মের ডিপার্টমেন্ট অব কনজারভেশনের ভিজিটং প্রফেসর ড. ররেরটা টম্বার, এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষক তুষার সরকার, ঐতিহাসিক নিশীথরঞ্জন রায়, ড. অমলেন্দু দে, ড, দীপককুমার বড়ুয়া সহ বহু পণ্ডিত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। সম্প্রতি জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইতিহাস গবেষকরা বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালা পরিদর্শন করে যান।

বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালায় চন্দ্রকেতুগড় থেকে প্রাপ্ত বৈদিকযুগ হতে মৌর্য, শুঙ্গ ও কুষাণযুগের পুরাবস্তুগুলি বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে যেমন স্বীকৃতি পেয়েছে। তেমনি প্রাক হরপ্পা যুগের (আমরি সভ্যতার) সমকালীন সভ্যতার দিক নির্দেশ করেছে। এলাকায় নালান্দা সমসাময়িক বালান্দায় বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঘটেছিল ও মহাবিহার ছিল তার সমর্থনে বহু তথ্য ও পুরাসামগ্রী জব্বার সাহেবের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিলত রয়েছে। মহামহাউপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উল্লেখ করেছেন, বিখ্যাত বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ‘অষ্টসহস্রিকা শক্তি প্রজ্ঞাপারমিতা’ বালান্দায় লেখা হয়েছিল। গ্রন্থটি নেপাল রাজদরবারে সংরক্ষি্ত রয়েছে। সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাসে তার উল্লেখ রয়েছে। এবং তারও পরে উড়িষ্যার স্বাধীন নৃপতি হরিবর্মদেবের প্রধান অমত্য ভবদেব ভট্টের কথা বা তাঁর রাজধানী বালান্দার কথা ভুবনেশ্বর মন্দিরের উৎকর্ণ শিলালিপিতে উল্লেখ পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও চন্দ্রকেতুগড়ে ও খনা মিহিরের ঢিবি দেখে প্রাচীন সভ্যতা লুকিয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। জব্বার সাহেব সেই দাবিকে সমর্থন করেছেন তাঁর সংগ্রহ দিয়ে। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে ১০ হাজার বছরের মানুষের নিম্নচোয়ালের দাঁত। এছাড়া সমকালীন সময়ের প্রস্তুরীভূত হাতির দাঁত, রৌদ্রতাপে শুকানো ধাতব শব্দযুক্ত মৃৎপাত্র(যা কিনা প্রাক্ হরপ্পা সভ্যতার নির্দশন)। হরপ্পা সভ্যতার সময়কালীন ধাতব শব্দযুক্ত আগুনে পোড়ানো কৃষ্ণ বর্ণের মৃতপাত্র। তাঁর সংগ্রহে প্রায় ২হাজারের অধিক পুরাসামগ্রী সংগ্রহে রয়েছে। অতীত ইতিহাস শুধু নয় প্রাগ ঐতিহাসিক কালে চন্দ্রকেতুগড়, বালান্দা পরগণাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সভ্যতা নিয়ে ধারাবাহিক বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা ও খনন প্রয়োজন। পঞ্চাশের দশকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালার উদ্দোগে ড. কুঞ্জগোবিন্দ গোস্বামীর তত্ত্বাবধানে পরীক্ষাদমূলক খনন কার্য হলেও পরবর্তীকালে বেসরকারী ও ব্যাক্তিগত উদ্যোগে গবেষণা হলেও তা যথেষ্ট নয়। বিদ্যাধরী নদী দিয়ে সমুদ্রপথে চন্দ্রকেতুগড় দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়ার বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে বাণিজ্যক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। জব্বার সাহেবের সংগ্রহে বিশাল মুদ্রা ভাণ্ডারে গ্রীকো রোমার মুদ্রা তারই ইঙ্গিত দেয়।

নদী গবেষক সুকুমার মিত্র-র দাবি, টলেমি(৭৫ খ্রীষ্টাব্দ) বর্ণিত বঙ্গোপসাগর থেকে দেখা মোহনার যে নদীকে তিনি ‘মেগা’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন তা অবশ্যই বিদ্যাধরী নদী। মেগা কথার অর্থ বিশাল। বিদ্যাধরী তাঁর দাবি, বিশাল এই নদীকে ঘিরেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় সভ্যতার প্রসার ঘটেছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চন্দ্রকেতুগড় ও বালান্দা গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। অনুমান করা হয় খ্রীষ্টের জন্মের চারশো বছর পূর্বে গঙ্গারিডি রাজ্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রটি হল চন্দ্রকেতুগড়। এখানকার সভ্যতায় গ্রীকো, রোমান প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বহু চেষ্টা করেও এই ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষ‌ণের সরকারি কোনও উদ্যোগ গত সাত দশকে নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি বারাসত লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ কাকলী ঘোষদস্তিদারের উদ্যোগে চন্দ্রকেতুগড় সংগ্রহশালা গড়ার কাজ এগিয়ে চলেছে। ওই সংগ্রহশালায় প্রয়াত এম এ জব্বারের বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালার সংগ্রহ প্রদর্শিত হওয়া উচিত। এবং এম এ জব্বারের কাজের স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে ফলকে হাড়োয়ার বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালার সৌজন্যে প্রাপ্তি স্বীকার এলাকার মানুষ আশা করেন। এছাড়া জব্বার সাহেবের বাস্তুভিটায় অবস্থিত বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালাকে সাইট মিউজিয়াম হিসেবে সরকার স্বীকৃতি ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে চন্দ্রকেতুগড়েকে কেন্দ্র করে ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ক্ষেথত্র হয়ে উঠবে তেমনি পর্যটন মানচিত্রে স্থান করে নেবে। সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদার ইতিহাসের দায় হিসেবে যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা অত্যন্ত প্রসংশনীয়।

*লেখিকা- ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশনের ডকুমেনটেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট ও বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালার আজীবন সদস্যা ও প্রাক্তন (অবৈতনিক কিউরেটর)। সম্পর্কে এম এ জব্বারের ভাইঝি। ইমেল- tahamina66@gmail.com

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com