লালনবানীর প্রকৃত পাঠঃ তিন পাগল । কালের লিখন

১৫৭ বার পঠিত
তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে,
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে।
 
একটা নারকোলের মালা,
তাতে জল তোলা ফেলা, করঙ্গ সে
আবার হরি বলে পড়ছে ঢলে,
ধূলার মাঝে।
 
একটা পাগলামি করে,
জাত দেয় অজাতেরে, দৌড়ে গিয়ে
পাগলের সঙ্গে যাবি, পাগল হবি
বুঝবি শেষে।
 
পাগলের নামটি এমন,
বলতে ফকির লালন, ভয় তরাসে
চৈতে নিতে অদ্বৈ পাগল,
নাম ধরে সে।
 
আলোচ্য বানীর রুপক শব্দের শব্দার্থ বিন্যাসঃ
তিন পাগল, নদে, করঙ্গ, হরি, ধূলা, চৈতে, নিতে, অদ্বৈ।
~
তিন পাগল– তিনটি ধারা, তিনটি সন্তান। পুরানমতে শ্রীচৈতন্যদেব, নিত্যানন্দ ও অদ্বৈত আচার্য এরা তিনজন একত্র হলে অনেক সময় কৃষ্ণপ্রেমে আত্মাহারা হয়ে যেতো। কৃষ্ণভাবে উন্মত্ত হয়ে যেত বলে লোকে তাঁদের পাগল বলতো এবং সংখ্যায় তিনজন হওয়ায় লোকে তাঁদের তিনপাগল বলতো। রূপক ব্যাখায় নিতাই হলো চৈতন্যদেবের বাল্যকালীন নাম এবং অদ্বৈত হলো চৈতন্যদেবের পরিনির্বাণলাভ করার পরের নাম। নাম তিনটি হলেও মূলত সত্তা মাত্র একজন এবং তিনি হলেন সাঁই। যেমন- বারি সলিল পয় ও অম্ব ইত্যাদি নাম ভিন্নভিন্ন হলেও মূলসত্তা কিন্তু একটি, তা হলো জল।
আত্মদর্শন বা সাধু মতে- মানবদেহে প্রাপ্ত ১.রতী, ২.সুধা ও ৩.মধু এ তিনটি ধারাকে তিন পাগল বলা হয়।
 
পাগল- বাতুল, উম্মাদ, ক্ষ্যাপা, মত্ত, মাতাল, বিমুগ্ধ, বিমোহিত, অবোধ, বিকৃতমস্তিষ্ক স্ত্রী পাগলি, পাগলিনী।
 
নদে- নদিয়া বা নবদ্বীপ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। লালন সাঁইজির গানে নানারকম ভাবে রূপকভাবে এই নদে শব্দটি এসেছে, যেমন-
১. কার ভাবে শ্যাম নদেয় এলো, তার ব্রজের ভাব কী অনুসারে ছিলো।
২. কোন্ প্রেমের দায়ে গৌরপাগল, পাগল করল নদের সকল, রাখল না কারো জাতের বোল, একাকার করল সেথা।
৩. জানলে প্রেম গোকুলে, নিত না সে কাঁথা গলে নদেয় আসত না, অধীন লালন কয় করো এ বিবেচনা।
৪. সে কালাচাঁদ নদে এসেছে, সে না বাজিয়ে বাঁশি ফিরছে সদায়, ব্রজঙ্গনার কুলনাশে।
আত্মদর্শন বা সাধু মতে- জীবের স্থূল আকারকে দেহ বা রূপকার্থে নদে বলা হয়। আত্মতাত্ত্বিক বাণীতে ব্যবহৃত এর আরও কিছু রূপক প্রতিশব্দ এরকম- গাছ, ঘোড়া, নদিয়া, নবদ্বীপ, ব্রহ্মাণ্ড, মেঘ, সংসার, ওয়ার্ল্ড, ইউনিভার্স, আলম, ক্ববর, গোর, জাহান, মুলুক, রথ বা দেহ।
~
করঙ্গ– করংক, খাপর, কৌটা, পাত্র, করোটি, কমণ্ডলু, জলপাত্র, ভিক্ষাপাত্র, মাথার খুলি, নারকেলের মালা, পানের বাটা, পানের ডিবা। সাধু সন্ন্যাসিগণ যে জলপাত সঙ্গে নিয়ে চলাফিরা করে থাকেন। লালন সাঁইজির অনেক গানে রূপকভাবে এই করঙ্গ শব্দটি এসেছে। যেমন-
১. কটিতে কোপনি পরিবো, করেতে করঙ্গ নিবো, মনের মানুষ মনে রাখবো, কর যোগাবো নত শিরে।
২. ধন্যরে ভারতী যিনি, সোনার অঙ্গে দেয় কোপনি, শিখালো হরির ধ্বনি, করেতে করঙ্গ নিলে।
৩. রাজবসন ত্যাজ্য করে, ডোর-কোপনি পরিধান করে, কাঠের মালা গলে ধরে করঙ্গ নিয়েছে করে।
আত্মদর্শন বা সাধু মতে- কবন্ধকে কানাই বা রূপকার্থে করঙ্গ বলা হয়। এর আরও কিছু রূপকপ্রতিশব্দ হচ্ছে- কানাই, অযোধ্যা, গণ্ডগ্রাম, গোকুল, গোষ্ঠ, নাগিনী, ব্রজ, গোয়াল, চিতা, চুলা, নৌকা, কালনাগিনী, রজকিনী।
 
হরি– বিষ্ণু, নারায়ণ, চন্দ্র।  রূপকে নারায়ণের অপরনাম বা দৈত্যরাজ তাড়কাক্ষের পুত্র।  আত্মদর্শন বা সাধু মতে- সাঁই, গুরু, গোঁসাই, পালনকর্তা।
 
ধূলা– ধুলা, ধুলো, ধূলি, রেণু, কণা, শুকনা বস্তুর গুঁড়া। ক্ষেত্রের বা কড়ার অংশ বিশেষ। আত্মদর্শন বা সাধু মতে- কামব্রতের সময়ে শিশ্ন হতে নিঃসৃত শুভ্রবর্ণের তরল পদার্থকে শুক্র বা রূপকার্থে ধূলা বলা হয়। এর আরও কিছু প্রতিশব্দ হচ্ছে- বীর্য, বিন্দু, রতী, সিমেন, গোবিন্দ, অহল্যা, কালী, জল, বারি, দুর্গা, পিতৃধন, বৈষ্ণবী, সীতা, যাকাত, আঙ্গুর, খেজুর, রুটি, ফল, কমলা, বেহুলা, রতী ও সীতা, ধন, শুক্র।
 
চৈতে– চৈতন্যদেবের সংক্ষিপ্ত নাম। আত্মদর্শন বা সাধু মতে- মাতৃজঠরে সর্ব জীবের ভ্রুণ লালনকারী অমৃতরসকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে চৈতে বলা হয়। তরলমানুষ, যে এখনো মূর্তাকার ধারণ করেনি। মাতৃজঠরে ভ্রুণ লালনপালনের দায়িত্ব পালনকারী সুমিষ্ট সুপেয় ও শ্বেতবর্ণের জল। এর আরও কিছু রূপক প্রতিশব্দ- পালনকর্তা, ঈশ্বর, চৈতন্যদেব, পতি, প্রভু, বিষ্ণু, বুদ্ধ, সাঁই, স্বামী, গার্ডিয়ান, উপাস্য, নারায়ণ, নিধি, নিমাই, নিরঞ্জন, স্বরূপ, নেক্টার, ইলিক্সার, উপাস্য, পালক, সাঁই, পালনকর্তা।
 
নিতে– নিতাই, নিত্যানন্দ, নিতাইচন্দ্র, নিতাই শব্দের কাব্যরূপ। আত্মদর্শন বা সাধু মতে- মাতৃজঠরে সর্ব জীবের ভ্রুণ লালনকারী অমৃতরসকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে চৈতে বলা হয়। তরলমানুষ, যে এখনো মূর্তাকার ধারণ করেনি। মাতৃজঠরে ভ্রƒণ লালনপালনের দায়িত্ব পালনকারী সুমিষ্ট সুপেয় ও শ্বেতবর্ণের জল। এর আরও কিছু রূপক প্রতিশব্দ- পালনকর্তা, ঈশ্বর, চৈতন্যদেব, পতি, প্রভু, বিষ্ণু, বুদ্ধ, সাঁই, স্বামী, গার্ডিয়ান, উপাস্য, নারায়ণ, নিধি, নিমাই, নিরঞ্জন, স্বরূপ, নেক্টার, ইলিক্সার, উপাস্য, পালক, সাঁই, পালনকর্তা।
 
অদ্বৈ– অদ্বৈত, অদ্বিতীয়, ভেদহীন, ভেদশূন্য, অদ্বৈত আচার্য, শ্রীচৈতন্য দেবের জনৈক একান্ত প্রধান পার্শ্বচর, অদ্বৈত এর সংক্ষিপ্তরূপ।  নিতে- নিতাইচন্দ্র, চৈতে- চৈতন্যদেব এবং অদ্বৈ- অদ্বৈত আচার্য। উল্লেখ্য চৈতে নিতে এবং অদ্বৈ মূলত একই সত্তা।  নিতে বা নিতাই হলো শ্রীচৈতন্য দেবের বাল্যনাম এবং অদ্বৈ হলো চৈতন্য দেবের সিদ্ধিস্তরে পদার্পণকালীন নাম। আত্মদর্শন বা সাধু মতে- মাতৃজঠরে সর্ব জীবের ভ্রুণ লালনকারী অমৃতরসকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে চৈতে বলা হয়। তরলমানুষ, যে এখনো মূর্তাকার ধারণ করেনি। মাতৃজঠরে ভ্রুণ লালনপালনের দায়িত্ব পালনকারী সুমিষ্ট সুপেয় ও শ্বেতবর্ণের জল। এর আরও কিছু রূপক প্রতিশব্দ- পালনকর্তা, ঈশ্বর, চৈতন্যদেব, পতি, প্রভু, বিষ্ণু, বুদ্ধ, সাঁই, স্বামী, গার্ডিয়ান, উপাস্য, নারায়ণ, নিধি, নিমাই, নিরঞ্জন, স্বরূপ, নেক্টার, ইলিক্সার, উপাস্য, পালক, সাঁই, পালনকর্তা।
 
আলোচ্য বানীর ভাবার্থ ও আত্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণঃ
 
আত্মতত্ত্ব দেহতত্ত্বের প্রাণপুরুষ, সাধককুল শিরোমণি বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য মহান রূপকার, বাংলাভাষার মরমিকবি, আত্মতত্ত্বের জনক মহাত্মা লালন সাঁইজি।  মহান আধ্যাত্মিক জ্ঞানতাপস ও জীবন ঘনিষ্ঠ আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক মহাত্মা লালন সাঁইজি একজন সুমহান রূপকার হিসেবে রুপকের অন্তরালে আত্মতত্ত্বের কথা বলে গেছেন তাঁর নির্মিত সকল বাণীতে, দেহতত্ত্বীয় মূলকগুলো লজ্জাস্কর, তাই আত্মতাত্ত্বিক সাধকগণ রূপক ভাষায় আত্মদর্শনের বাণী নির্মাণ করে থাকেন, যেন প্রতিটি মানুষ মূলক উদ্ধার করে সঠিক দেহতত্ত্বীয় জ্ঞান আহরণ করতে পারে।
 
সাঁইজির বাণীর মূল শিক্ষা হলো- মানব জীবনের পরিপূর্ণতার জন্য নিজেকে জানা অতি জরুরী, মানুষতত্ত্ব- শ্রেষ্ঠতত্ত্ব, ভাব নয় বস্তুনিষ্ঠতা মানুষকে মূলে ধাবিত করে। সাঁইজির প্রতিটি সহজ পদ আত্মদর্শনের অমিয় বাণী, এর তাল, লয়, ছন্দ, ভাব, ভাষা, শব্দের গাঁথুনি, উপমাশৈলী আর রুপকের অন্তরালে মূলকের আভাস, মোহিত করে অনুসন্ধিৎসু মন।
 
মহাত্মা লালন সাঁইজি রচিত প্রতিটি লালনবানী পাঠের দ্বারা আমরা সুখী ও ছোট পরিবার গঠন, পরমায়ু বৃদ্ধি, শুক্রনিয়ন্ত্রণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ, সুস্বাস্থ্য রক্ষা, সাঁইদর্শন, আত্মশুদ্ধি, সচ্চরিত্র গঠন ও আত্মসংযমসহ বিশ্বব্যাপী শান্তি ও শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যাক্তিক জীবনে অনুপম শিক্ষা পেয়ে থাকি। সকল লালনবানীর প্রতিটি ছত্রে ছত্রে মানুষের মনের পশুত্বভাব দূর করে সুস্বভাব ও মানবিক গুণাবলী অর্জনের আকুল আহ্বান জানানো হয়েছে।
 
সাঁইজির বানী সাধারণত দু’টি বা তারও অধিক অর্থ একই সাথে বহন করে, ব্যাখ্যা অর্থ বা ভাবার্থ, বিশ্লেষকভেদে যাই আসুক, আত্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সকল যুগে সর্বাবস্থায় একই রকম থাকবে, কারন সাঁইজির বানীর মূল উপজীব্য বিষয় হলো মানুষ। দেহ নামক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ব্যাতিত সাঁইজির বানীর পাঠউদ্ধার সম্ভব নয় কিছুতেই, উল্লেখ্য- যে লেখা যে বিষয়ে রচিত তাকে সে ভাবেই পাঠ করতে হবে, অন্য বিষয়ের সাথে সাদৃশ্য খুঁজলে তা মূল হারিয়ে ভিত্তিহীন হবে বৈকি।
 
আলোচ্য বাণী’তে সাঁইজি তিনটি পাগলের কথা বলছেন। কী সেই তিন পাগল? কোথায় থাকে? কীভাবে তাদের দেখা পাওয়া যায়? তাদের দেখা পেলে কেনো আমরাও পাগল হয়ে যাবো, এরকম নানারকম প্রশ্ন আমাদের মনের মধ্যে আসে এই গানটি শুনলে। তিন (৩) একটি দেহতত্ত্বীয় মূলক সংখ্যা। এরকম প্রায় শতাধিক দেহতত্ত্বীয় মূলকসংখ্যা আছে, যা রূপকভাবে গানে ব্যবহার করা হয়। তিন সংখ্যাটিকে নানারকম ভাবে আমরা পাই, যেমন- তিন তার, তিন চোর, তিন কন্যা, তিনজন বাদী, তিন বিবি, তিন বর্ণ, তিন পোড়া, তিন কাল, তিন সখী, তিন পাগল, তিন সন্তান, তিন যুগ, এরকম অসংখ্য তিনের ব্যবহার পাওয়া যায় আত্মতাত্ত্বিক বাণীগুলোতে। আমাদের উচিৎ হবে এই তিনের মূলক উদ্ধার করে গানটির সঠিক অর্থ অনুধাবন করা। সাধুশাস্ত্রে সাধারণত তিনের দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, প্রথমত- ১.ইড়া, ২.পিঙ্গলা ও ৩.সুষুম্না নাসিকার এই তিনটি শ্বাসকে তিনের মূলক ধরা হয়, দ্বিতীয়ত- আবার মানবদেহে প্রাপ্ত ১.রতী, ২.সুধা ও ৩.মধু এ তিনটি ধারাকেও তিনের মূলক ধরা হয়।
 
এছাড়াও একটি গানের মর্মার্থভেদে এই তিনের আরও একাধিক ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, যে মূলকটি ধরে আমরা সম্পূর্ণ গানটি বুঝার চেষ্টা করবো, তা যেন শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ গানের মানে বহন করে। আমরা যখনি একটি ভুল মূলক ধরে রূপক এই তিনপাগল বা তিনসন্তান ব্যাখ্যা করতে যাবো, তখনি পরবর্তী স্তবকে গুঁজামিল চলে আসবে, এবং একটি সার্বিক অর্থহীনতা ও দুর্বোধ্যতা আমাদের গ্রাস করবে, অথচ প্রতিটি আত্মতাত্ত্বিক বাণী নির্মাণ হয়েছে- যেন মানুষ বানীটি উপলব্ধিতে নিয়ে জেনে বুঝে তার নিজ জীবনে কাজে লাগাতে পারে।
 
আমরা পাগলের অভিধা হতে জেনেছি, পাগল হচ্ছে-  মত্ত, মাতাল, বিমুগ্ধ, বিমোহিত। মানবদেহে প্রাপ্ত রতী, সুধা ও মধু বা লাল সাদা ও কালো এই তিনটি ধারাকে আলোচ্য বাণীতে তিনপাগল বলা হচ্ছে। যে তিনপাগল উদয় হচ্ছে আমাদের দেহ নামক নদে এসে। তাই সাঁইজি বললেন- ‘তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে, তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে’।  সেই তিনপাগলের কাছে যেতে একটা কৌশলগত মানাও এখানে সাঁইজি করেছেন, যেন আমরা জেনে বুঝে তাদের কাছে যেতে পারি, তাদের সাধন করতে পারি। আমরা বিমুগ্ধ হতে পারি, মত্ত হতে পারি, বিমোহিত হতে পারি।
 
এরপর সাঁইজি বলছেন- ‘একটা নারকোলের মালা, তাতে জল তোলা ফেলা, করঙ্গ সে/ আবার হরি বলে পড়ছে ঢলে, ধূলার মাঝে’।  এখানে নারকোলের একটা মালার কথা বলা হচ্ছে, যে মালায় জল তোলা ও ফেলা হচ্ছে, এবং সেই নারকোলের মালাকে তুলনা করা হচ্ছে করঙ্গের সাথে। আমরা করঙ্গ শব্দের দেহতত্ত্বীয় মূলক থেকে জেনেছি যে- করঙ্গ হচ্ছে কানাই বা কামনদীর ঘাট, যে ঘাটে নেমে একজন সাধক সাধনা করেন, খুঁজে বেড়ান- মধু ও সুধা, সেই একই ঘাটেই অন্যজন সাধনের পরিবর্তে বিনোদনে মত্ত হয়ে আছে, সে শুধু জল তুলছে আর জল ফেলছে, সঠিক সাধন পদ্ধতি না জানায় হরিরূপ গুরুর নাম ধরে সে ধূলারূপ শুক্রস্খলনে লুটিয়ে পড়ছে। অসময়ে শুক্রপাতে সেই ঘাটে বারবার মরণ হচ্ছে তার। সে তিন পাগলের সন্ধান পাচ্ছে না। সাঁইজির অন্য একটি গানে আছে- ‘সারাদিন ধাপ ঠেলিয়ে হলাম শুধু বল হারা, কই হলো মোর মাছ ধরা?’ সঠিক সাধন পদ্ধতি না জানলে শুধুমাত্র বিনোদনের ঘোরে জলতোলা আর জলফেলাতেই জীবন অঙ্গার হয়ে যাবে, তাই সাঁইজি বারবার তার অসংখ্য বাণীতে পিতৃধন সাধনের কথা বলেছেন।
 
তারপর সাঁইজি বলছেন- ‘একটা পাগলামি করে, জাত দেয় অজাতেরে, দৌড়ে গিয়ে/ পাগলের সঙ্গে যাবি, পাগল হবি বুঝবি শেষে’।  এখানে বলা হচ্ছে যদি তুমি রতি সাধন করে প্রস্তুত হয়ে সেই নদীতে যাও, তোমার মত্ততা, পাগলামি বা সাধনের জোরে অজাত তোমাকে জাতে তুলে দিতে পারে সেই তিন পাগলের এক পাগল সাঁই। যে পাগল মানবের উপাস্য, যে পাগল প্রতিটি মানুষকে তার মাতৃজঠরে লালনপালন করেছেন, সেই পাগল প্রতিটি মানুষের স্বরূপ, মনের মানুষ, ভাবের মানুষ, পরম মানুষ, তরল মানুষ। সেই পাগলের সঙ্গ পেলেই আপনার আপনিতে ফানা হওয়া যায়।
 
শেষ অন্তরায় সাঁইজি ভনিতায় বলছেন- ‘পাগলের নামটি এমন, বলতে ফকির লালন, ভয় তরাসে/ চৈতে নিতে অদ্বৈ পাগল, নাম ধরে সে। এখানে ভয় তরাসে হচ্ছে পরিপূর্ণ ভক্তির প্রকাশ। সাঁইজি বলছেন- আমি কী করে সেই পাগলের নাম ধরি? যে পাগল প্রতিটি মানবে বিরাজ করে, যে পাগল একবার চৈতে হয়, সেই আবার অদ্বৈ বা নিতাই হয়। এই তিন পাগলের সাধনে একজন মানুষ তার উপাস্যকে খুঁজে পেতে পারে।
 
আত্মতত্ত্ব প্রেমী সকল সাধুদের কাছে সবিনয় নিবেদন, তিন পাগলের আবাস নিবাস, সাধন ভজন, তাদের স্বরূপ জানার কৌশল, সময়, প্রহর, পদ্ধতি কিম্বা ভজন পূজনসহ এসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ তত্ত্বের গভীর হতে গভীরতম আলোচনা, ব্যাখ্যা, আর আত্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রত্যেকের নিজ নিজ জ্ঞানগুরুর কাছ থেকেই জেনে বুঝে নেওয়া উচিৎ। অথবা একজন আত্মতাত্ত্বিক দিব্যজ্ঞান সম্পন্ন পাকা সাধকগুরুর সান্নিধ্য নিয়েই সকল মানুষের আত্মদর্শনের জ্ঞান আহরণ করা বাঞ্ছনীয়। 
 
আমাদের মনে রাখতে হবে আত্মদর্শন নিজেকে গভীর থেকে গভীরভাবে জেনে বুঝে নেওয়ার একটা অনুপম মাধ্যম।  আত্মদর্শনের মূল আলোচ্য বিষয় চারটি- দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান। আত্মতাত্ত্বিক রূপকারগণ এই চারটি বিষয়ের উপরে তাঁদের অমূল্য বাণী নির্মাণ করে থাকেন। কখনো সেই গানে আসে- দেহতত্ব, কখনো আসে আত্মা’র বিভাজন ও জিজ্ঞাসা, কখনো আসে মন বা জ্ঞানের একাধিক আলোচনা। আত্মদর্শন প্রতিটি মানুষের জন্য এক প্রয়োজনীয় সত্য। ধর্ম জাতপাত যার যার আত্মদর্শন সবার।  লালন লালিত হোক শুদ্ধ মনে।
 
তথ্যসুত্রঃ লালিত লালন (১ম খণ্ড)
সংকলন» সম্পাদনা» গবেষণা» কালের লিখন
ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com