আজ লোকসঙ্গীতশিল্পী আবদুল আলীমের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী

৩৮ বার পঠিত

গ্রাম-বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, সুখ-দুঃখের কথা যে গানের মাধ্যমে ফুটে উঠে তা লোকসঙ্গীত।  লোকসঙ্গীতের ধারাটি যিনি তার কণ্ঠের অসাধারণ ঐশ্বর্য দিয়ে শ্রোতাদের মাঝে আজও বেঁচে আছেন, তিনি শিল্পী আবদুল আলীম। এই অমর শিল্পী তার দরাজ কণ্ঠ দিয়ে বাংলার লোকসঙ্গীতকে অবিশ্বাস্য এক উচ্চতায় গেছেন।

পশ্চিমবঙ্গের (ভারত) মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামে ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই আবদুল আলীম জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম শেখ মো. ই্‌উসুফ আলী।  বাল্যকাল থেকেই আলীম সঙ্গীতে প্রবল অনুরাগী ছিলেন। তবে অর্থনেতিক অনটনের কারণে কোনো শিক্ষকের কাছে গান শেখার সৌভাগ্য তার হয়নি। অন্যের গাওয়া  শুনেই তিনি গান শিখতেন। আর বিভিন্ন পালা-পার্বনে গাইতেন সেই গান। এভাবে ছোটবেলা থেকেই তিনি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

১৯৪২ সাল। উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাক্কালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় গেলে সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে আবদুল আলীমের গান শুনে শিশুর মতো কেঁদে ফেলেন শেরেবাংলা। কিশোর আলীমকে জড়িয়ে নিলেন তার বুকে। উৎসাহ দিলেন আর বাজারে গিয়ে পাজামা, পাঞ্জাবি, জুতা, পুটি, মোজা সব কিনে দিলেন তাকে।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের একমাস আগে আবদুল আলীম কলকাতা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে এলেন। ওই বছরেরই ডিসেম্বরে ঢাকা এলেন। পরের বছর ঢাকা বেতারে অডিশন দিলেন। অডিশনে পাশ করলেন। ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসের ৯ তারিখে তিনি বেতারে প্রথম গাইলেন, ‘ও মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও।’ এরপর পল্লিকবি জসীমউদ্দিনের সাথে আবদুল আলীমের পরিচয় হয়। কবি জসীম উদ্দিন তাকে পাঠালেন জিন্দাবাহার দ্বিতীয় লেনের ৪১ নম্বর বাড়িতে। একসময় দেশের বরেণ্য শিল্পীরা এখানে থাকতেন।

এ বাড়িতে  তিনি প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ মমতাজ আলী খানের কাছে তালিম গ্রহণ করেন। মমতাজ আলী খান আবদুল আলীমকে পল্লিগানের জগতে নিয়ে এলেন। পরবর্তীতে তিনি কানাই শীলের কাছেও সঙ্গীতশিক্ষা লাভ করেন। এ ছাড়া গান শেখার ক্ষেত্রে আর যারা তাকে সবসময় সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছেন তাদের মধ্যে বেদার উদ্দিন আহমেদ, আবদুল লতিফ, শমশের আলী, হাসান আলী খান, মো. ওসমান খান, আবদুল হালিম চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৫১-৫৩ সালে আবদুল আলীম কলকাতায় বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলনে গান গেয়ে বিদেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। এ সময় পল্লিগানের জগতে শিল্পীর সুখ্যাতি শীর্ষচূড়ায়। সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হয়ে তিনি ১৯৬৩ সালে রাশিয়া এবং ১৯৬৬ সালে চীন সফর করেন। এই দুটি দেশে তিনি পল্লিগান পরিবেশন করে দেশের জন্য প্রচুর সুখ্যাতি অর্জন করেন।

তিনি বেতার ও টেলিভিশন ছাড়াও অসংখ্য ছায়াছবিতে গান করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এ কণ্ঠ দেন। এ ছাড়া ‘আজান’, ‘রূপবান’, ‘জোয়ার এলো’, ‘শীত বিকেল’, ‘এদেশ তোমার আমার’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘নবাব সিরাউদ্দৌলা’ (বাংলা ও উর্দু), ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘দস্যুরাণী’, ‘সুজন সখি’সহ অসংখ্য  ছবিতে কণ্ঠ দেন।

১৯৬০ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তার প্রথম গান ‘প্রেমের মরা জলে ডোবে না’ ও ‘অসময় বাঁশি বাজায়’ এবং পরবর্তীতে ‘হলুদিয়া পাখি’, ‘দুয়ারে আইসাছে পাখি’, ‘নাইয়ারে নায়ে বাদাম তুইলা’, ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া’, ‘পরের জাগা পরের জমিন’ প্রভৃতি গান খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে।

দরাজ কণ্ঠের অধিকারী শিল্পী আব্দুল আলীম যখন গান গাইতেন, তখন মনে হতো পদ্মা-মেঘনার ঢেউ যেন আছড়ে পড়ছে শ্রোতার বুকের তটভূমিতে। তার কণ্ঠে ভাটিয়ালীর সুর যেন মাঝির মনের বেদনার কথা বলত। বাউল গান শুনে বৈরাগীরা থমকে দাঁড়াত। মারফতি আর মুর্শিদির সুরে তার বিনয় নম্র ভক্তি নিবেদন ঝরে পড়ত। এভাবেই পল্লিগানের জগতে তিনি এক আদর্শ গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। পল্লিগানের যে ধারা তিনি প্রবর্তন করে গেছেন সেই ধারাই এখন পর্যন্ত বিদ্যমান।

জাদুকরী কণ্ঠের অধিকারী আব্দুল আলীম জীবদ্দশায় ও মরণোত্তর বেশ কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৭ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদক দেয়। কালজয়ী এই লোকসঙ্গীতশিল্পী মাত্র ৪৩ বৎসর বয়সে ১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পিজি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com