হায় ইশরাত, হায় শিল্পসখা!

৩৩ বার পঠিত

ঢাকা: ‘বর্তমানে এদেশের অনেক শিল্পী কাজ করছেন। শিল্পকলা কেন্দ্রীক লেখাপড়াও বেড়েছে। তবে শিল্পীর সংখ্যার তুলনায় শিল্পকলায় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়েনি। ফলে শিল্পী হয়তো পেশা হিসেবে তাদের চর্চিত শিল্প মাধ্যমকে বেছে নিতে পারছেন। তবে মৌলিক চাহিদার চাপে হারিয়ে যেতে বসেছে বিশুদ্ধ শিল্পবোধ। বিশেষ করে তরুণ শিল্পীরা এক অসম প্রতিযোগিতায় নিজেদের আবিষ্কার করছেন বিশাল এক ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সমাজের মাঝে। একই সঙ্গে শিল্পের বাণিজ্যিক মূল্য হয়েছে আকাশচুম্বি। যা দিনদিন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে’- কথাগুলো ইশরাত আকন্দের। গুলশানে সন্ত্রাসী হামলায় নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন তিনি। ছিলেন আমাদের শিল্পসখা। শিল্পীদের স্বপ্নের রূপকার। শিল্পী না হয়েও শিল্প আর শিল্পীর টানাপোড়েন খুব টের পেতেন যিনি। শিল্পীদের টানাপোড়েন থেকে রক্ষা করতে গড়ে তুলেছিলেন ইনস্টিটিউট অব আর্ট এন্ড কালচার। লক্ষ্য ছিলো শিল্প ও সাহিত্যের সমন্বয়ে জীবনের সমৃদ্ধি।

ছিলেন ঢাকা আর্ট সেন্টারের পরিচালক। সেখান থেকে যতদূর জানা যায় গুলশানেও দুটো আর্ট গ্যালারী দিয়েছিলেন তিনি। জীবনকে হাসিমুখে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি।

নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন লিখেছেন, যে মেয়েটার রোজ ঢাকা শহরের আকাশের ছবি তুলতো, সেই মেয়েটা নেই? কেউ আমাকে বলো এ খবর মিথ্যে!

‘ফুল অফ লাইফ, মাথা খারাপ, হাসিখুশি, আর্ট পাগল, ফুড পাগল, রান্ডম, এ্যাক্সেন্ট্রিক একটা মেয়ে ছিল ইশরাত। আজকে এইখানে জামদানী শাড়ির এক্সিবিশান, কালকে ঐখানে এক রেস্টোরেন্টে খুব ভালো লবস্টার পাওয়া যায়, আজকে অমুক আর্টিস্ট খুব সুন্দর ডিসাইনার জুতা বানাইতেছেন, তো পরশু তমুক জায়গায় জ্যাজ শো হইতেছে, সুতরাং ইশরাতের উৎসাহের অভাব নাই। উনি কাজও করতেন প্রচুর।… তো সেই মেয়েটারে গতকাল ইসলামী জঙ্গীরা ‘কালিমা’ বলতে না পারার অপরাধে জবাই কইরা মাইরা ফেলছেন।’ -রাজধানীর গুলশানে সদ্য জঙ্গিদের হাতে নিহত তিন বাংলাদেশির একজন ইশরাত আকন্দকে নিয়ে এভাবেই শোকতুর হয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখেন নাদিয়া ইসলাম।    

তার গ্যালারীতেই আগমন ঘটতো নামী-দামী শিল্পীদের। ২০০২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও চিত্রকলা নিয়ে বিশেষ অনুরাগ ছিল তার। শুধু তাই না, তার পৃষ্ঠপোষকতায় বহু চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজনও হয়েছে বলে তার বন্ধুরা নিশ্চিত করেছেন।

প্রথম দিকে গ্রামীণফোনেও কাজ করেছেন ইশরাত। আর সেসময়কার তার এক বন্ধু ফেসবুকে লিখেন, ইশরাত ছিলেন প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ব্যক্তিত্ব। ফেসবুকে তিনি সর্বশেষ পোস্ট করেছেন নেলসন ম্যান্ডেলার কারাগারের ওপরে একটা ভিডিও। জড়িত ছিলেন আর্ট গ্যালারির সঙ্গে। চুলে ফুল গোঁজা তার ছবিটা দেখলে মনে হয়, আস্ত একটা চাঁপা ফুল ফুটে আছে পর্দাজুড়ে।’ 

গ্রামীনফোনে কাজ করা ছাড়াও তিনি ছিলেন বি-জি-এম-ই-এ এবং জেড-এক্স-ওয়াই-এর হিউম্যান রিসোর্স পরিচালক। ওয়েস্টিন হোটেলের মার্কেটিং ডিরেক্টার এবং ইন্সটিটিউট অফ এশিয়ান ক্রিয়েটিভসের আর্ট প্রভোকিউরেটার। ব্র্যাকনেটেও কাজ করতেন একসময়। তবে উনার সবচাইতে পছন্দের কাজ ছিলো ‘আই এ্যাম হ্যাপি, বি’কজ-’ বলে একটা দাতব্য কাউন্সেলিং কোর্স চালানো।

কিন্তু গত শনিবার থেকে ফেসবুকে তার নামের পাশে ফেসবুক সঁপে দিয়েছে ‘রিমেম্বারিং’ শব্দটি। যে শব্দটির মানে হল ইশরাত আকন্দ এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে অন্য পৃথিবীতে জায়গা করে নিয়েছেন। 

ইশরাতের প্রিয় ঢাকার আকাশে শিল্পীদের শোকধ্বনী বাজছে শুধু- হায় ইশরাত! হায় শিল্পসখা!

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com