বাংলা ভাষা-সাহিত্য: আর্তনাদ : তৈমুর মল্লিক

সন্তান জন্ম দেবার অধিকার প্রতিটা মা-বাবারই আছে, কিন্তু সেই সন্তানের জীবন শেষ করার অধিকার কোনো মা বাবার নেই। এটা একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠিত সত্য, অন্যদিকে অমানবিক । যদি কোনো মা-বাবার মধ্যে সেই প্রবণতা বিদ্যমান থাকে যে, সন্তান জন্ম দিয়েছি- তার জীবন গড়ে উঠবে প্রকৃতির নিয়মের উপর ভর করে তাহলে সেই সন্তানের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হবে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ ।

সন্তান জন্মদান এটা একটা প্রাকৃতিক নিয়ম, একইসাথে সেই সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রাকৃতিক নিয়মে আসবে সেটাই স্বাভাবিক, তবে সেই স্বাভাবিকতা মানুষ মেনে নিতে পারেনি বলেই উন্নত চিন্তাভাবনার আবির্ভাব ঘটেছে,  সেই ধারাবাহিকতায় এসেছে আজকের আধুনিক সভ্যতা।
আমার আজকের লেখা প্রবন্ধে অতি গুরুত্বপুর্ণ একটা অধ্যায় “ভাষা” এর উপর কিছু কথা বলছি। সৃষ্টির শুরু  থেকে মানুষ কীভাবে তার মনের ভাব প্রকাশ করবে সেটা কোনো দলিলে লিপিবদ্ধ আইনের মাধ্যমে প্রকাশিত ছিল না। সময়ের প্রয়োজনে, প্রাকৃতিক নিয়মই বিভিন্ন অধ্যায় এই মনের ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

পৃথিবীতে অনেক ভাষার মধ্যে বাংলা একটি অন্যতম ভাষা, অত্যন্ত ঐতিহ্যগত বর্ণমালায় সমৃদ্ধ আমাদের এই প্রাণের ভাষা। আজ যে মাসে আমরা এই সভায় উপস্থিত আছি, সেই মাসে আমার মতো অত্যন্ত সাধারণ মানুষ যাদের উপর কোনো প্রকার ভাষা নিয়ে দায়িত্ব অর্পণ করা ছিল না অথচ তারাই “বাংলা চাই” বলে রাজপথে রক্ত দিয়েছিল। তাদের সেই রক্ত বৃথা যায়নি। বাংলা এসেছে, নিজের মতো করে পথ চলেছে, নদীর স্রোতের মতো নিজে নিজেই বহমান থেকে এই পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। আমরা লিখছি এই ভাষার উপর অনেক বই- লিখতে লিখতে নিজেদের পাঠাগার সমৃদ্ধ হয়েছে। পক্ষান্তরে আমাদের ভাষা কতটা সমৃদ্ধ হয়েছে সেটাই আজকে আমার প্রতিপাদ্য বিষয়।

আমি ভাষাবিশারদ না, বাংলা ভাষার কঠিন,দুর্বোধ্য সংবিধান আমাকে পারেনি আনন্দ দিতে, হতে পারে সেটা আমার ব্যর্থতা। তবে আনুমানিক ২৫ কোটি বাঙালির কতজন এই সংবিধানকে ধারন করতে পেরেছে সেটা একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে। আমাদের দেশের ঘরে ঘরে বাংলা ভাষার উপর বিজ্ঞ জনতৈরি হবার কথা ছিল, আদৌ কি তা হয়েছে? ক’জন হাতে গোনা  মানুষকে বাদ দিলে আর কেউ কি আছেন যারা আমাদের বাংলা ভাষা বিশ্লেষণ করতে পারবেন? পরিচর্যাবিহীন ভালো ফসল ঘরে আসে না এটা নতুন কথা নয়। আর এই পরিচর্যার ধরন যে আবহাওয়া, ভূমির গঠন এবং যাকে পরিচর্যা করা হবে তার গঠনতন্ত্রের উপর নির্ভর করে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আবহাওয়া এবং ভূমির গঠন পরিবর্তনশীল। তাই পরিচর্যার গতিপ্রকৃতি সব সময় একই হবে সেটা মনে করা অজ্ঞতার শামিল। বাংলা ভাষা সৃষ্টির পর থেকে যুগের চাহিদা মোতাবেক কতটা পরিচর্যা হয়েছে সেটা ভাষাবিশারদগণ বলতে পারবেন। পরিচর্যার কতটা দরকার সেটার প্রমাণ মিলেছিল ১৯৩২ ও ১৯৩৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজশেখর বসুর সময়ে। কতটা পেরেছিলেন আর কতটা পারেননি সেটাও আপনারা ভালো জানেন। পরবর্র্তী সময়ে ১৯৮১ সালে অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় চেষ্টা করেছেন, ফলাফল প্রায় শূন্যের কোটায়। হাল ছেড়ে দেয়নি সেই সময়ের ভাষাবিশারদগণ।

তাই ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হয়েছেন মণীন্দ্রকুমার ঘোষ, জগন্নাথ চক্রবর্তী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, পবিত্রকুমার সরকার, পরেশচন্দ্র মজুমদার । ভাষাকে সহজ ও সরলীকরণের কাজে তারা প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন । তারপরও এটাই প্রমাণিত হয় যে বাংলা ভাষাকে সহজ ও সরলীকরণের প্রয়োজন আছে। উক্ত ব্যক্তিরা যে সকল বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে ভাষা সংস্কারের কাজে হাত দেন, আজকে আমার প্রবন্ধে আমি একই বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করেছি।

সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বেড়ে ওঠা আমাদের মায়ের ভাষা আজ কোথায় যাত্রা করেছে সেটা ভাবার সময় প্রায় অতিক্রান্ত হতে চলেছে। অসম্ভব খেয়ালি যুক্তাক্ষরের আধিক্য এবং সংস্কৃত নির্ভরশীলতা বাংলা ভাষাকে একটা গন্ডীর মধ্যে আটকে ফেলেছে। আজ শুধু পাঠাগার ভরা বই দেখা যায় কিন্তু সেই বই পাঠ করার মানুষের অভাব,চরম আকার ধারন করেছে। পক্ষান্তরে আধুনিক ব্যবস্থা মানুষের মনের ভাব প্রকাশ একইসাথে বৈধ বা অবৈধ বিনোদন যোগ হয়ে নতুন প্রজন্মের মনে স্থান করে নিয়েছে। ওরা এখন চায় না কোন দুর্বোধ্য রাস্তায় চলতে, ওরা চায় সহজ সরল, সাবলীল অথচ নির্ভরযোগ্যভাবে পথ চলতে।  সেটা কীভাবে কার হাত ধরে হবে তা তাদের কাছে গৌণ।

নতুন প্রজন্ম ভুলেই গেছে এই ভাষার জন্য একদিন কেউ জীবন দিয়েছিল, আর এই ভুলে যেতে সাহায্য করেছি আমরা। আমার জিজ্ঞাসা আজকের আধুনিক বিশ্বে কেন তারা সেই প্রাচীন বিদঘুটে শব্দভা-ারের উপর নির্ভর করবে-নাকি তাই করা উচিৎ ? যেখানে পৃথিবীর প্রতিটা ভাষা সাবলীল রুপে নিজেদের করছে প্রতিষ্ঠিত সেখানে আমরা আমাদের ভাষাকে দুর্বোধ্য রুপ দিয়ে ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে কৃপণ রাজার যক্ষের ধনের মতো কেন আবদ্ধ করে রাখছি ? এটা কোনো মহাশক্তির প্রভাব নয়তো ?

আমরা দেখেও দেখি না, বাংলাভাষার প্রতি নিজেদের দায়িত্ববোধ স্বীকার করি না। একই জটিল বিষয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন নামে কিছু পুস্তিকা প্রকাশ করা। ফলাফল হলো: সেগুলো পাঠাগারে সংরক্ষণ আর সাথে কিছু সেমিনার, এভাবে কিছু সামনে এগিয়ে যাবার জন্য দুর্বল কদম ফেলা- অবশেষে অজ্ঞাত কোনো এক কারণে আবার সব কিছু স্তব্ধ । এগুলোই হলো আমার দেখা চোখে আজ পর্যন্ত ফলাফল।

যার ফলে অবলীলায় নতুন প্রজন্মের ৯০ শতাংশ আজ বাংলা বর্ণমালাকে প্রকাশ করে ইংরেজি বর্ণ দিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল, অনলাইনভিত্তিক সকল স্থানে এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। দেশের মধ্যে সকলের সামনে বসে নেটওয়ার্ক কোম্পানিগুলো একই পদ্ধতিতে সরকারি বার্তা, জনস্বার্থে কোন বার্তা, নিজেদের বার্তা কোটি কোটি বাঙালির কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।বিখ্যাত ওয়েভসাইট উইকিপিডিয়াতে বাংলা ব্যাকরণ শিক্ষা দেয়া হচ্ছে একই পদ্ধতিতে। আমাদের বর্ণমালা কি দেউলিয়া যে তা প্রকাশ করতে অন্যের বর্ণের সাহায্য নিতে হবে, যার অভিনব নাম হবে বাংলিশ? এতে কি আমাদের কোনো লজ্জা লাগে না? এটা দেখেও যদি আমরা প্রতিবাদ না করি, নিজেদের ভাষার একটা ঐতিহ্য আছে বলে গর্বে বুকভরে বাতাস নিই তাহলে কি ঐ ৫২ কে অস্বীকার করা হয় না?

শহিদ ভাইদের খুব ভালোবাসি বলে একগোছা ফুল রেখে এলাম শহিদমিনারে এটাই কি তাহলে শেষ কর্তব্য? আগামী দিনে যদি এ অভিনব পদ্ধতি বাংলা প্রকাশের মাধ্যম বলে স্বীকৃতি পায় তাহলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। আর সেই সময়ে আবার যদি ৫২ ফিরে আসে তাহলে সেই রক্তের জন্য কারা দায়ী হবে ? শুধুমাত্র সময়ের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে, নিজেদের সময়োপযোগী ব্যবস্থা না নেবার কারণে আজো প্রযুক্তিখাতে বাংলাভাষার সহজ প্রবেশ ঘটেনি। যার ফলে নতুন প্রজন্ম না চাইলেও বেছে নিয়েছে সহজ পথ। এভাবে যদি ওরা বেড়ে উঠতে থাকে তাহলে কীভাবে জন্ম নেবে বাংলা ভাষার প্রতি আনুগত্য, ভালোবাসা, ভক্তিশ্রদ্ধা? কে পড়বে প্রতি বছর প্রকাশিত হাজার হাজার বই?

একটা বাংলা পান্ডুলিপি সঠিক করতে সময়, শ্রম, অর্থের ব্যয় আর ইংরেজি বর্ণের পান্ডুলিপি সঠিক করতে কী- সময়, অর্থ আর শ্রমের হিসাব একই? যদি না হয় তাহলে পার্থক্য কোথায়? আমার জানামতে পার্থক্য হলো প্রযুক্তির ব্যবহার, যেখানে বাংলা ভাষার  কোনো সহজ প্রবেশ নেই। যার প্রধান কারণ যুক্তাক্ষরের অবস্থান, সমোচ্চারিত বর্ণের আধিক্য, কারের আধিক্য। প্রাকৃত হতে বাংলার আগমন, কার্যত যার ধারক আমরা নই, তাই বাঙলাকে নিয়ে তেমন চিন্তা আমাদের নেই। তাই যুক্তাক্ষর ভাঙার নীতিগত সমর্থন সকল স্থান হতে পাওয়া যাবে না এটাই স্বাভাবিক। যারা এর বিরোধিতা করে, তাদের প্রধান ভাষা বাংলা নয়। তাদের উন্নতির জন্য যে ভাষার প্রয়োজন সেটার গঠনপ্রণালী বাংলা ভাষার বিষারদগণ দেখলেই বুঝতে পারবেন। তারা তাদের প্রয়োজনে প্রযুক্তির স্বার্থে কতটা সাবলীল করেছে বর্ণকে সেটা খুবই বেদনাদায়ক।

আমরা স্বাধীন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন, বাংলা একাডেমি স্বাধীন। তাই আমাদের চিন্তা আমরা করতে পারবো বলে মনে হয়। আমি একজন সাধারণ বাঙালি হিসাবে এটাই চাই যে, আমার সন্তান বাংলায় তার মনেরভাব প্রকাশ করবে, বাংলা কে আদালতের আদেশে নয় –নিজের মনের তাগিদেই আঁকড়ে ধরবে । আর সেই উৎসাহিত করার দায়িত্ব আমাদের। যারা আমরা আজও প্রাকৃতজন ও মনে প্রাণে প্রকৃত বাঙালি ।

আমি জানি না আমার এই আর্তনাদ দরজাতেই হুমড়ি খেয়ে পড়বে কিনা। যদি তাই পড়ে তাহলে দায় মাথা পেতে স্বীকার করে নেবো । বাংলার প্রতি হুমকি এখনও চলছে, আগামীতেও চলবে হয়তো বাংলা একদিন এভাবেই বিলুপ্ত ভাষা হিসাবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে এটা আমার আশঙ্কা ।
আমার এই আশঙ্কা যেন সত্যি না হয় সেটাই আমি চাই । সমকালীন প্রযুক্তিনির্ভর ভাষাচর্চায় বাংলা ভাষার ব্যবহারে বেশকিছু সীমাবদ্ধতা তার প্রেক্ষিতে আমি ভাষা সংস্কারের জন্য নিম্নোলিখিত প্রস্তাব আপনাদের বিবেচনায় নেবার জন্য পেশ করছি ।

আপনাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনে সংযোজন বা বিয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হোক সহজ, সরল, সাবলীল বাংলা ভাষা । যা খুব সহজেই প্রযুক্তিতে প্রবেশ করতে পারে । তাহলেই বাংলা ভাষা ছড়িয়ে যাবে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে । নতুন প্রজন্ম অবলিলায় ত্যাগ করবে বাংলা ভাষার অপমান । অভ্যন্তরীণ বা বাইরের কোনো শক্তি পারবে না আমাদের প্রাণের ভাষাকে অসম্মান করতে ।

১। ভাষার দুইটি বিভাজন করা
ক । কথ্য রূপ ।
খ । লেখ্য রূপ ।

২। লেখ্য রূপকে ঢেলে সাজানো ।
ক। সকল যুক্তাক্ষরকে ভেঙে দেয়া ।
খ। বর্ণমালার আধিক্য কমানো। যেমন – ণ, ষ বাদ দেওয়া।
গ । কারের সমীকরণ করা।যেমন – ঈ-কার, ঊ-কার বাদ দেওয়া ।
ঘ। চন্দ্রবিন্দু, “ব” “ম”এর সংযুক্তিবিবেচনা করা ।

৩। ব্যাবহারিক বাংলাভাষার সংস্কারে প্রযুক্তিবিদকে অবশ্যই সাথে রাখা। কারণ ভাষাকে প্রযুক্তিসহায়ক করতে গেলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা তারাই করতে পারবেন।

৪। বাংলা ব্যাকরণকে পুনর্গঠিত করে সমকালীন প্রযুক্তি নির্ভর ভাষা চর্চার সঙ্গে সঙ্গতি বিধান করা।

সেই স্বপ্ন নিয়ে আমি বাঁচতে চাই।– আমার ভাষার ব্যবহার হচ্ছে সর্বত্র, শুধু কিছু পন্ডিতের ভাষা এটা নয়। এই ভাষা যেমন তাদের,অন্য দিকে আমার,আবার ঐ জমিতে হালচাষী কৃষকেরও। তাই কালের সহযাত্রী যদি ভাষা হতে না পারে তাহলে ভাষার সর্বনাশ হয়। আসুন আমরা সর্বনাশ রোধ করি। আমার স্বল্প জ্ঞানে আমার ধারনা উপস্থাপন করেছি মাত্র। আপনারা মতামত দিয়ে আমার ধারণাকে সমৃদ্ধ করবেন অথবা ধারণাটিকে পরিত্যাগ করবেন। পরিশেষে বলি আমি বাঙালি, বাংলা আমার গর্ব, বাংলায় আমি বাঁচতে চাই, বাংলায় আমার শেষ সমাধি চাই।

লেখকঃ তৈমুর মল্লিক 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
৩৭ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com