রম্য রচনা

বাংলা বাক্যে বিরাম চিহ্ন ।। খোন্দকার শাহিদুল হক

কোলন, সেমিকোলন, কোলন-ড্যাশ , ড্যাশ ও হাইফেনকে খুব আনন্দিত মনে হচ্ছিল। হঠাৎ তাদের এত খুশি হওয়ার কারণ কী, তা নিয়ে প্রশ্ন চিহ্নের মনে প্রশ্ন দেখা দিল। প্রশ্ন চিহ্ন বাংলা বাক্যে বিরাম চিহ্নের সভাপতি দাঁড়ির বাড়ীতে গিয়ে দাঁড়ির কাছে বিষয়টি উত্থাপন করল। দাঁড়ি বলল, “বিষয়টি তো আমিও ঠিক জানি না, তবে সম্ভবত কমা জানতে পারে। কমার কাছে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করে জানা যেতে পারে। সুতরাং কমাকে এক্ষুণি আসার জন্য খবর দাও।”

কমাকে টেলিফোন করতেই সে তৎক্ষণাৎ ছুটে এল। তাকে প্রশ্ন চিহ্ন তার দুশ্চিন্তার কারণ বিস্তারিত জানালো।
কমা বলল যে, সে অনেক কিছুই জানে কিন্তু বিষয়টি কাউকে বলতে সাহস পায়নি।
কমাকে খুবই ভিতু ও সন্ত্রস্ত দেখা গেল।
কমা আরও বলল, “সাবধান, আমাদের বৈঠকের কথা যদি কোনভাবে বাংলা একাডেমি জানতে পারে, তবে নিশ্চিত আমরা দাঁড়িকে হারাবো।”
দাঁড়ি আদ্যপ্রান্ত শুনে ভয়ে কাঁপতে লাগল। ঘটনা যে এতদূর গড়িয়েছে, সে এর কিছুই জানে না।
এবার দাঁড়ি কম্পিত গলায় বলল, “কমা, তোমাকে আমি ছোটবোনের মতো দেখি। অথচ তুমি বিষয়টি জানার পরেও এই বুড়োকে কিছুই জানাও নি। এটা কিন্তু তোমার উচিত হয়নি।”

প্রশ্নবোধক চিহ্ন বলল, “ ও তো আগেই বলেছে, গুম হওয়ার ভয়ে কাউকে কিছু জানায় নি। তাছাড়া জেনেও তো আমাদের কয়েকজনের পক্ষে কিছুই করার ছিল না। সুতরাং আমার মনে হয় এ বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে একটা সভা করা দরকার।”
প্রশ্নবোধকের প্রস্তাবে দাঁড়ি সাড়া দিয়ে দ্রুত সভার আয়োজন করার নির্দেশ দিলেন।
আহুত সভায় উর্ধ্বকমা(’) এক উদ্ধরণ চিহ্ন( ‘-’), দুই উদ্ধরণ চিহ্ন(“-”) বিকল্প চিহ্ন(/), লোপ চিহ্ন(’-), বিন্দু চিহ্ন(.), ত্রিবিন্দু চিহ্ন(…) ,বর্জন চিহ্ন(***), দুই দাঁড়ি(।।), প্রথম বন্ধনী(()), তৃতীয় বন্ধনীসহ([]) সবাই একে একে এসে উপস্থিত হল।
সভাপতির শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষে উপস্থাপক প্রশ্ন চিহ্ন আজকের সভার আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করলো।

প্রশ্ন চিহ্ন বলল, “আপনারা শুনে অবাক হবেন, যে দেশের মানুষ আমাদের রক্ষার জন্য একদা প্রাণবিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই দেশের মানুষই ইদানীং বাংলা বাক্যে কতিপয় বহুল প্রয়োগকৃত বিরামচিহ্নের বিলোপ করে বিদেশি বিরাম চিহ্ন প্রতিস্থাপন করছে। জেনে আরও অবাক হবেন যে, শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ দেওয়ার জন্য পূর্বে অনুস্বার ও বিসর্গ ব্যবহার করা হলেও হালে তাদেরকে এই পদ থেকে বাংলা একাডেমি কর্তৃক বহিষ্কার করা হয়েছে। বিসর্গ মনের দুঃখে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছে। আর অনুস্বার হাং তাং সাং থেকে পদচ্যূত হয়ে তার স্বপদে বহালের জন্য একা একা সংগ্রাম করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সে তাতে কোনো সুফল পাচ্ছে না।

আমাদের মাঝে এরই মাঝে কোলন(🙂 সেমিকোলন(😉 , কোলন-ড্যাশ(🙂, ড্যাশ(-), ও হাইফেন(-) এসে পাকাপোক্ত স্থান করে নিয়েছে। আমরা হাইফেনকে আমাদের প্রয়োজনে জায়গা করে দিলেও কোলন, সেমিকোলনের বাহুল্য প্রয়োগ এবং অনুস্বার-বিসর্গের বিসর্জনকে মেনে নিতে পারছি না। তদুপরি, হালে নাকি আমাদের আজকের সভাপতি জনাব দাঁড়িকে বাদ দিয়ে মিঃ ফুলস্টপের আমদানির পায়তারা চলছে। বাক্যের একমাত্র পূর্ণছেদ হলেন আমাদের মাননীয় দাঁড়ি মহোদয়। এই দাঁড়িকে তারা জঙ্গিবাদের আলামত গণ্য করে তারস্থানে ফুলস্টপ দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে বলে কমা আমাদেরকে গোপনে জানিয়েছে। এ বিষয়ে আমি আপনাদের সুচিন্তিত মতামত কামনা করছি।”

প্রশ্ন চিহ্নের বক্তব্য শুনে বিস্ময় চিহ্ন হতবাক হয়ে গেল। তথাপি সে কিছুটা আত্মস্থ হয়ে চিৎকার করে বলল, না, এটা আমরা মানব না, কক্ষণো না, মানি না, মানবো না। কোনোভাবেই আমরা বর্ণ কিংবা বিরামচিহ্নের বিলোপ হতে দেব না “
কমা বলল, “তুমি এবার একটু থাম। চিৎকার করলেই তো হবে না। বাংলাভাষায় প্রমিত বানানের নামে কার-চিহ্নের যে অপপ্রয়োগ শুরু হয়েছে সেখানে ঈ-কার কিংবা ঊ-কারই মুমূর্ষু হয়ে পড়েছে । তারা এখন হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের ক্ষেত্রে সকল কবি নীরব। এবার তুমিই বলো, তোমার চিৎকার কি তাদের কানে পৌঁছবে? আমার তো মনে হয় না।”

বিস্ময় চিহ্ন বলল, কমা, তুমি বুঝতে পারছো না! বাঙালিদের কৌশলে বাংলাবিমুখ করার জন্য কতিপয় ষড়যন্ত্রকারী এটা করছে। এর পিছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। আমাদের এই ষড়যন্ত্র রুখতেই হবে। এখন চুপ করে বসে থাকার সময় না।”
কমা বলল, “তুমি কোন ষড়যন্ত্রের কথা বলছ?”

বিস্ময় চিহ্ন বলল, “তুমি তো আজও কঁচি খুকিই রয়ে গেছ! কেনো বুঝতে পারছ না, যারা বাংলাভাষা রক্ষার জন্য এত কথা বলে, প্রাণবিসর্জনের ইতিহাসে গর্ববোধ করে, তারাই আজও মহান শহিদ দিবস খিষ্ট্রাব্দ মেনে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে পালন করে। ফালগুনের নামই তারা মুখে নেয় না। সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রয়োগ থেকে পিছিয়ে আছে। সন্তানদের বিদেশি ভাষা শেখানোর জন্য ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াচ্ছে। তাছাড়া বঙ্গাব্দের তো কোনো ধারই ধারে না।”
“কে বলেছে বঙ্গাব্দের ধার ধারে না? কেউ না কেউ তো ধার ধারে। সরকার বঙ্গাব্দকে চালু করার জন্য সরকারি কর্মচারিদের উৎসবভাতা দিচ্ছে।” বিস্ময় চিহ্ন তাকে বেশ জোরালো গলায় বলল।

কমা বলল, হ্যাঁ, “পহেলা বৈশাখেই শুধু নববর্ষ উৎযাপন ও সরকারি ভাতা গ্রহণের জন্য দিনটি মনে রাখা হচ্ছে। তারপর ?”
দুই দাঁড়ি(।।) বলল, তোমাদের আলোচনায় আমরা মুগ্ধ। অনেক কিছু জানতে পারলাম।
কিন্তু তোমরা কি জানো যে, কোলন অর্থ মলাশয় আর ড্যাশ অর্থ হানাহানি, বেগে ধাবন, প্রবল সংঘর্ষ, নির্গত করা , ধাক্কা লাগা, ছোড়া, হতোৎসাহ করা, ছুঁড়ে ফেলা, ধেয়ে যাওয়া ইত্যাদি?
দুই উদ্ধরণ চিহ্ন বলল, “ এ আলোচনা থাক । আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় কারও সম্মান হানী করে কোনো বক্তব্য না দেওয়াই শ্রেয়। তাদের তো কোনো দোষ নেই। দোষ, যারা আমাদের বিসর্জন দিয়ে তাদেরকে আমদানি করছে। আমি শুনেছি, কোলন নাকি কোলনক্যান্সারাক্রান্ত হয়ে নিজেই এখন বেশ চিন্তিত। সুতরাং..”

দাঁড়ি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, “ তোমরা এবার থাম। আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসি এবং আমাদের করণীয় নির্ধারণ করি। আমরা যতটা জানি, ইতোমধ্যে বিসর্গের পরিবর্তে বিন্দুচিহ্ন(.) ও কোলন চিহ্ন( 🙂 ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বিন্দুই স্থানভেদে ফুলস্টপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং ইদানীং এর ব্যবহার আমাদের বিস্মিত করেছে। আমাদের বিসর্গ শব্দের সক্ষিপ্ত রূপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিংবা অপূর্ণবাক্যের পরে অন্য একটি বাক্যের অবতারণার ক্ষেত্রে ব্যহৃত হলে কী দোষ হতো জানি না। তদ্রুপ অনুস্বার দিয়ে হাং তাং সাং লিখলে কার এমন কী ক্ষতি হচ্ছিল তাও আমরা বুঝতে পারছি না। অনুস্বারের জায়গায় ডট(.) বসিয়ে কাজ সম্পন্ন করা গেলেও তা যে দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না সেটা তো ভেবে দেখতে হবে। তদুপরি, এদের কর্মচ্যূত করার পূর্বে কার কী অপরাধ তাও তো জাতিকে জানাতে হবে।”

উপস্থিত সবাই দাঁড়িকে তার মূল্যবান বক্তব্যের জন্য সমর্থন করল।
বিস্তারিত আলোচনা শেষে বাংলা বাক্যে বিরাম চিহ্নের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ ও উদ্ভূত সমস্যার সমাধানকল্পে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হলো। কমিটিতে আহব্বায়ক হিসেবে যুক্ত হলেন জনাব প্রশ্নবোধক চিহ্ন এবং সদস্য/সদস্যা হিসেবে বেগম কমা ও জনাব বিস্ময় চিহ্ন।

তাদেরকে আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও মতামতসহ একটি প্রতিবেদন মাননীয় দাঁড়ি মহোদয়ের কাছে জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।
পরিশেষে সভায় আর কোনো আলোচ্য বিষয় না থাকায় সভাপতি মহোদয় সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
৮৩ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com