যত্রতত্র পার্কিং : যানজটে অতিষ্ট সিলেট নগর জীবন

২৪ বার পঠিত

সিলেট যানজটের কারণে নগরজীবন অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে যানজট আরো ভয়াবহ রূপধারণ করছে। এর কারণ হিসেবে অনেকে প্রশাসনের অবহেলা আর অপরিকল্পিত নগরায়ণ কে প্রধান কারণ বলে মনে করছেন। আর প্রশাসন বলছে এনিয়ে তারা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে তাদের অবহেলার কিছু নেই। সিলেটের রাস্তাগুলো যানবাহনের তুলনায় অনেক ছোট। রাস্তা ছোট হওয়ায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ নিতে পারছে না বলেই যানজট বাড়ছে।

এমনটা মনে করেন সিলেট মেট্রপলিটন পুলিশের উধ্বতন এক কর্তকর্তা। ঈদকে সামনে রেখে তারা অতিরিক্ত ব্যস্ত এলাকাগুলোতে বাড়তি জনবল নিয়োগ করেছেন বলেও জানান তিনি।

নগর ভবনের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা আবার দায়সারা গোছের কিছু কথা কথা বলে দায় সারেেছন। জানাতে পারছেন না কোনো সুন্দর বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা।

অনেক নগরবাসি যারা প্রতিদিন ব্যস্ততম এলাকা বিশেষকরে জিন্দাবাজার দিয়ে যাতায়াত করেন তারা বলছেন, রাস্তা ছোট বড় কিংবা গাড়ির চাপ বেড়ে যাওয়া এখনো সিলেট নগরীর জন্য তেমন কিছু নয়, মূল সমস্যা হলো প্রশাসনের আন্তরিকতা আর সুর্নিদিষ্ট পরিকল্পনা। রাস্তা গাড়ি অনুপাতে অেেনক বড়োই আছে। কিন্তু ফুটপাত ব্যবসায়ীরা ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তার কিছুটা দখল করে আছে, বাকি কিছুটা রাস্তা মার্কেটে আসা গাড়িগুেেলা পার্কিং করে দখল করে আর বাকি কিছু দিয়ে জনতা হেঁটে চলাচল করেন।

এর ফলে রাস্তার অর্ধেকের বেশি দখলে চলে যায়। বাকি সামান্য রাস্তা থাকে যানবাহন চলাচলের জন্য। এতে করে যানবাহন চলাচলের জন্য তৈরী রাস্তার অর্ধেকের বেশিই যানবাহন ব্যবহার করতে পারে না। মাঝে মাঝে রিকশা বা গাড়ি পথচারীদের গায়ে লেগে যায় এতে অনেক সময় চালক আর পথচারীদের মধ্যে বাকবিতন্ডার সৃষ্টি হয়।

নগরীর শিবগঞ্জ এলাকার এক যাত্রী জানান, সিলেটে নগর প্রশাসনের কাজ কারবার দেখে তাদের অনেকটা টালমাটাল অবস্থা মনে হচ্ছে। এই দেখা যায় এই রাস্তায় খুঁটি বসাচ্ছে তো ঐ রাস্তায় খুঁটি তুলছে। কখনো কখনো রাস্তার অর্ধেকটা আটকে দিয়ে খুঁটি বসিয়ে দিয়েছে। মনে হচ্ছে যেনো তারা পরিকল্পনাহীন ভাবে এগুচ্ছে। এতে করে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি জনগণকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

যানজট কেন হচ্ছে?
নগরীর বলতে গেলে প্রতিটি রাস্তায় এখন ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকতে হয় যানবাহন ব্যবহারকারীদের। সরেজমিন দেখা গেছে নাগরীর সবচেয়ে বেশি বিপনী বিতান বা মার্কেট এবং ফ্যাশন হাউজগুলো জিন্দাবাজার এবং এর আশপাশের আধ কিলোমিটারের মধ্যে। কিন্তু এসব বিপনী বিতানগুলোর দু’একটি ছাড়া বেশির ভাগের নেই কোনো গাড়ি পার্কিং। যাদের আছে তাও ছোটখাটো। অনেকের পার্কিং আছে কেবল মোটর সাইকেল রাখবার মতো। এসব পার্কিংয়ে কোনো গাড়ি রাখা যায়না। আর ফ্যাশন হাউজগুলোর বলতে গেলে কোনোটিরই গাড়ি রাখবার মতো সেরকম পার্কিং নেই। অথচ তাদের ক্রেতাদের বেশিরভাগই অভিজাত শ্রেণীর। যারা মূলত গাড়িতে করে কেনাকাটা করতে আসেন। গাড়ি নিয়ে আসা এসব ক্রেতারা রাস্তারধারে গাড়ি পার্কিং করে কেনাকাটা করতে চলে যান। তাদের এই পার্কিং করা গাড়ি রাস্তার অনেকটা দখল করে বসে থাকে।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই এসব এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এই চিত্র কেবল ঈদ বা উৎসবের সময়ের নয়, বলতে গোটা বছরের। ঈদের সময় তা প্রকট আকারে রূপ নেয় মাত্র। প্রশাসনের চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এ নিয়ম। কিন্তু এতে তাদের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। মার্কেট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি চালাচালি পর্যন্তই যেনো তাদের দায়িত্ব শেষ।

নগরীর আম্বরখানা এলাকার তুহিন আহমদ জানান, কর্মক্ষেত্রে যাবার জন্য তাকে প্রতিদিন এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে তীব্র যানজটে পড়তে হয়।

তিনি জানান, যত্রতত্র যানবাহন পার্কিয়ের কারণেই মূলত এই যানজট হচ্ছে। ব্যস্ততম এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখানে আসেন কেনাকাটা করতে। কিন্তু এই এলাকার ব্যস্ততম মার্কেট শুকরিয়া, মিতালী ম্যানশন , সিলেট প্লাজা বা লন্ডন ম্যানশনের নেই কোনো গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। ছোট করে রাখা হয়েছে মোটর সাইকেল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। এছাড়া এই এলাকায় রয়েছে বেশ কিছু নামিদামি জুতোর দোকানের শোরুম। তাদেরও চিত্র একই রকম। এতে করে এসব মার্কেটে যারা গাড়ি নিয়ে আসেন তারা রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করে রাখেন ঘন্টার পর ঘন্টা। এছাড়া প্রায় সময়ই প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হয় এমন জীপ আকারের বড়ো বড়ো গাড়িকে রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করতে দেখা যায়।

যানজটের বড়ো একটি কারণ খাবারের রেস্টুরেন্ট :
সিলেট নগরের যেকোনো প্রান্তে কাউকে যেতে হলে সাধারণত জিন্দাবাজার লাগুয়া আধ কিলোমিটার এলাকা ছুঁয়ে যেতে হয়। আর এর ফলে যারা কেনাকাটা ছাড়া বের হন তাদেরও রাস্তায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। কারণ জিন্দাবাজর লাগুয়া এলাকগুলোতে যানজট তৈরী হলে গোটা নগরীতে তার প্রভাব পড়ে। এক্ষেত্রে বিকল্প ছোট ছোট রাস্তা ব্যবহার করলে যানজট কিছুটা কম হয়। তবে যারা বিকল্প ছোট ছোট রাস্তা ব্যবহার করতে চান তাদের ইদানিং আর সে সুযোগ খুব একটা নেই। এর কারণ হলো এসব ছোট ছোট রাস্তা যে পাড়া বা আবাসিক এলাকাগুলো হয়ে গিয়েছে সেসব রাস্তা কাছে বা রাস্তার মুখে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি জমজমাট বড়ো আকারের খাবার হোটেল বা রেস্টুরেন্ট।

আর তাই নগরীর পূর্ব-পশ্চিমের যারা জিন্দাবাজার এলাকা না ছুঁয়ে বেরিয়ে যেতে চান তাদের যতেষ্ট ভোগান্তিতে পড়তে হয়। জিন্দাবাজার লাগুয়া দাঁড়িয়াপাড়া, জল্লারপাড় বা জামতলা রাস্তার কাছাকাছি রয়েছে পাঁচভাই , পানসী এবং ভোজনবাড়ীর মতো তিনটি বড়োধরনের খাবার রেস্টুরেন্ট। আবাাসিক এলাকার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাবার পাশাপশি এসব রেস্টুরেন্ট এর কারণে প্রায় সময়ই যানজট লেগে থাকে। অনেকে প্রয়োজনের পাশাপাশি বিলাসিতা করেও বড়ো বড়ো গাড়ি হাঁকিয়ে এসব খাবরের হোটেলগুলো আসেন।

নগরীতে ভয়াবহ যানজট তৈরীর জন্য বড়ো একটি কারণ এইসব খাবারের হোটেলগুলো। আর এসব রেস্টুরেন্টগুলোর নেই কোনো পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। রেস্টুরেন্ট এর সামনের যা একটু ছোট করে খোলা জায়গা রাখা হয়েছে। এই খোলা জায়গায় কয়েকটি মটরসাইকেল পার্কিং করে রাখা যায়। বাকি সবগাড়ি মূলত এসব রেস্টুরেন্ট লাগুয়া রাস্তার উপর রাখেন যারা এসব রেস্টুরেন্টে আসেন তারা। কেউ কেউ আশপাশের ভবনের বা খোলা জায়গাকে পার্কিং হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে গাড়ি রাখার জায়গা হচ্ছে কিন্তু যানজট কমছে না। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষকরে আবাসিক এলাকাগুলোতে দিন বেড়েই চলেছে এসব অপরিকল্পিত খাবারের রেস্টুরেন্ট।

নগরীর জিন্দাবাজার এলাকায় যত্রতত্র শপিংমল হওয়াতে ঈদের কেনাকাটা করতে আসছেন অনেকে। আর এসব শপিংমলে পর্যাপ্ত পরিমান গাড়ি পার্কিয়ের জায়গা না থাকায় রাস্তার পাশে গাড়ি পার্কিং করে শপিং করেন অনেকে। প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হয় এমন গাড়ি হরহামেসা বিকেল কিংবা সন্ধ্যার দিকে যত্রতত্র পার্কিং করতে দেখা যায় নগরীর ব্যস্ততম রাস্তাগুলোর পাশে। সরকারি গাড়ি দেখে কেউ কিছু বলতে সাহস করে না। যার ফলে তৈরী হচ্ছে যানজট। আর সেই যানজট নিরসনে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ কে হিমসিম খেতে হচ্ছে। তাই প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

পাশপাশি নগরীর ফুটপাতগুলোতে হকারদের দৌরাত্ম থাকায় নির্বিঘ্নে চলাচলও করতে পারছেন না পথচারীররা। ফুটপাত দখলের সাথে সাথে এরা ফুটপাত লাগুয়া রাস্তার অনেকখানি দখল করে বসে থাকে। যদিও মাঝে মধ্যে লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু উচ্ছেদের পরই আবার দেখা যায় সেই আগেকার অবস্থা। গত কয়েকবছর ধরে দেখা গেছে এসব উচ্ছেদ হয় সাধারণত ঈদ বা বিভিন্ন উৎসব মৌসুম। শুরু হবার আগ মুহূর্তে।

এর ফলে সুযোগ বুঝে উৎসব শেষে ফুটপাত থেকে সরে যাবেন বলে প্রশাসন আর ফুটপাত ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা সমঝোতা স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সাথে ফুটপাত ব্যবসায়ীদের পক্ষে অনেক রাজনীতিবীদদের মধ্যস্ততা করতে দেখা যায় সব সময়। এ নিয়ে প্রশাসন আর ঐসব রাজনীতিবীদদের ফুটপাত দখলমুক্ত করাবার বেলায় আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয় অনেকের মনে। প্রশ্ন দেখা দেয় সুন্দর একটি সিলেট নগরী গড়বার বেলায় তাদের ভূমিকা নিয়ে। নয়তো উৎসবের আগে কেনো ফুটপাত দখলমুক্ত করার পায়তারা।

রোববার দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। আবার ইফতারের কিছু পর থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত যানজট প্রকট আকার ধারন করে। যানজট আর মানুষের চাপে এসময় অনেক রাস্তা দিয়ে হেঁটে পার হওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। রিকশায় চার থেকে সাত মিনিটের রাস্তা আসতে সময় লেগে যায় ৪০ থেকৈ ৪৫ মিনিট। যানজটের কারনে একদিকে যেমন মানুষের সময় নষ্ট হচ্ছে অপর দিকে মানুষের কাজেরও ক্ষতি হচ্ছে।

জিন্দাবাজারএলাকায় রাজাম্যানশন এর সামনে খালি রিকশা নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় বেশ কয়েকজন রিকশা চালককে। এসময় এক রিকশাচালক জসিম অপর পাশে মিলেনিয়াম মার্কেটের দিকে ইশারা করে জানায়, একজন আপা তাকে নিয়ে এসেছেন। জসিম বলে ‘আপা ঐ মার্কেটটায় গেছে, আমারে ছাড়ে নাই’।

প্রশাসনের বক্তব্য :
সার্বিক বিষয়ে সিলেট মেট্রপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) মোঃ রহমত উল্লঅহ জানান, যানজটের জন্য তাদের অনেক সময় বেগ পেতে হয় এটা ঠিক। বিশেষকরে ঈদের সময় সিলেট নগরী এবং নগরীর বাইরে থেকে প্রচুর ক্রেতা নগরীতে কেনকাটা করতে আসেন। এতে করে নগরীতে যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যায়। বাড়তি এ চাপ নেবার মতো পর্যাপ্ত রাস্তা সিলেটে নেই। এতে করে যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে ঈদের কথা মাথায় রেখে তারা যেসব এলাকা বেশি ব্যস্ত থাকে সেসব এলাকায় বাড়তি জনবল নিয়োগ করেছেন। প্রত্যেকটি ব্যস্ত পয়েন্টে তাদের লোকজন কাজ করছে।

অবৈধ পার্কিং বিশেষকরে বিভিন্ন সরকারি কাজে ব্যবহৃত গাড়িগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, আইন সবার জন্য সমান। সবাইকে তা মানতে হবে। এধরনের কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে তারা সেসব গাড়িকে সরিয়ে নিয়ে অন্য কোথাও পার্কিয়ের কথা বলে থাকেন।

আর সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব বলেন, যেসব মার্কেটের পার্কিং নেই তাদের ঈদের পর চিঠি দেয়া হবে। রাস্তায় খুঁটি বসানো বিষয়ে তিনি বলেন, নগরীতে যান চলাচলে একটা শৃঙ্খলা আনতে এটা করা হয়েছে। এছাড়া কোনো কোনো জায়গায় রাস্তায় খুঁটি বসাতে পুলিশের দাবির প্রেক্ষিতে তারা এটা করে দিয়েছেন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শহীদুর রহমান জুয়েল, সিলেট ব্যুরো #

শহীদুর রহমান জুয়েল (উদয় জুয়েল), সিলেট ব্যুরো ০১৭২৩৯১৭৭০৪

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com