নদীতে নাইমা ইলিশ না পাইলে বুকডা ধপ কইরা উডে

১০৩ বার পঠিত

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর: গাংগে এবার মাছ নাই, আমরা শুধু তেল জ্বালাই আর খানা খাই। এছাড়া আর কোন কাম নাই। নদীতে নাইমা ইলিশ না পাইলে বুকডা ধপ কইরা উডে। মনে হয় আংগো গেরামে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। কথাগুলো বললেন লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার বাত্তিরঘাট এলাকার মনির মাঝি। তিনি আরো বলেন, নদীতে মাছ নেই। সারা দিন জাল ফেলে দুই-একটি করে ইলিশ জোটে। তা দিয়ে সংসার চলে না। তার উপর দাদনের দেনা শোধের দুঃচিন্তায়ও আছেন তিনি।

জানা যায়, জাটকা সংরক্ষণে মার্চ-এপ্রিল দু’মাস মেঘনার অভায়াশ্রমে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। সরকারের নির্দেশনা পালনের পর আবারো নদীতে মাছ ধরতে নেমেছেন জেলেরা। কিন্তু লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় জেলেদের জালে ধরা পড়ছেনা রূপালী ইলিশ। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন মাছ ধরার এক একটি নৌকা নিয়ে ৮-১০ জন জেলে নদীতে গিয়ে ঘাটে ফিরছেন দু-চারটি ইলিশ নিয়ে। আবার কেউবা শুন্য হাতে। ফলে দৈনন্দিন ব্যয়ের তুলনায় আয় না হওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছে এখানকার হাজার হাজার জেলে পরিবার।

সরজমিনে কয়েকটি মাছ ঘাটে ঘুরে দেখা গেছে , এ সময় জেলার ইলিশের ঘাটগুলোতে ইলিশের ছড়াছড়ি থাকার কথা। কিন্তু এবছর তা দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে ইলিশ মাছের তীব্র সংকটের কারণে ইলিশ আহরণ ও বাজার জাতকরণের সাথে জড়িত মেঘনার উপকূলের হাজার হাজার জেলে এবং ব্যবসায়ীরা চরম হতাশা মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। অনেকে আবার এ পেশা ছেড়ে দিয়ে নতুন পেশাও খুঁজছেন।

এ সময় ঘাটের জেলেরা ইলিশের অকাল সর্ম্পকে জানান, নদীতে নাই ইলিশ ডাঙ্গায় নেই দেশীয় মাছ। প্রতিবছর এমন সময়ে জেলেরা মাছ ধরায় ব্যস্ত থাকতো কিন্তু এবার তার উল্টো চিত্র। মেঘনায় জেলেদের জালে শুধূ ইলিশই নয় অন্য মাছও আশানুরুপ ধরা না পড়ায় তাদের মাঝে দেখা দিয়েছে এক ধরনের হাহাকার। পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।

মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানায়, নদীর নাব্যতা সংকট ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে ভরা মৌসুমে জেলার কমলনগর উপজেলার লুধুয়া ঘাট, মতির হাট, সাহেবের হাট, রামগতির বড় খেরী, সদর উপজেলার মজু চৌধুরীর হাট, রায়পুরের হাজিমারাসহ বিভিন্ন মাছ ঘাটগুলোতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ইলিশ কেনা-বেচা হলেও তা এখন নেমে এসেছে হাজারে। এতে করে জেলেদের পাশা পাশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন মৎস্য ব্যবসায়ী, আড়ৎদার ও দাদন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া লাখ লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে ব্যবসা করতে না পারায় তারাও রয়েছেন চরম হতাশায়। তারা আরো জানান, আড়তে ইলিশ না আসলে কতদিন এ পেশা ধরে রাখতে পারবো জানিনা। পরিবার পরিজনদের মুখে দুমুঠো ভাত যোগাতে বাধ্য হয়ে নতুন পেশা খুঁজছি।

স্থানীয়রা জানান, মৎস্য বিভাগের নজরদারীর অভাবে নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে জাটকা শিকার করায়, এখন জেলেদের জালে ধরা পড়ছেনা ইলিশ। সামান্য কিছু ইলিশ বাজারে এলেও আকাশ ছোঁয়া দামের কারনে তা চলে গেছে সাধারন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাহিরে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা সংকট দুর করা না হলে আগামীতে ইলিশ শূণ্য হয়ে পড়বে নদীগুলো, এমনটাই মনে করেন স্থানীয়রা।

এদিকে বরফ ব্যবসায়ীরা জানায়, জেলেদের জালে মা ধরা না পড়াই বরফ কিনতে আসছেনা তারা। বরফ উৎপাদনের জন্য ইঞ্জিন সবসময় চালু রাখতে হয় ফলে বরফ বিক্রি না থাকলেও বিদ্যুৎ বিল এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে লোকসান গুণতে হচ্ছে ।

মেঘনায় ইলিশের আকালের কথা স্বীকার করে জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা সুনীল ঘোষ জানান, প্রাকৃতি বিপর্যয় ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবেই ভাটি অঞ্চল থেকে উজানে ইলিশ আসছে না। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে ভাটি অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমানে ইলিশ উজানে আসবে। তখন জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়বে এবং তাদের মুখে হাঁসি ফুটবে। নদীর নাব্যতা সংকটের বিষয়ে তিনি জানান, নদীতে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে নদী ডেজিং করার বিষয়ে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com