৭’শ ৩১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে জরাজীর্ণ ৬৮, ২’শ ৩৮টিতে নেই প্রধান শিক্ষক

৭৩ বার পঠিত

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর : প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবেশ ও অবকাঠামো দিক থেকে উন্নয়নে পিছিয়ে আছে পুরো লক্ষ্মীপুর জেলা। জেলার ৫টি উপজেলায় ৭’শ ৩১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে ৬৮টি এবং ২ শ’ ৩৮টি বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক। একদিকে সহকারী শিক্ষকই দায়িত্ব পালন করে আসছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের। অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে ভবনের অভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। এতে পাঠদান ব্যাহতসহ অনেকটাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে শিক্ষা কার্যক্রম। সন্তানদের এসব বিদ্যালয়ে পাঠানোর আগ্রহ হারাচ্ছেন অভিভাবকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার রামগঞ্জ উপজেলার নাগরাজারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০১৩ সালে জাতীয় করণ করার সাথে সাথে জরাজীর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় বিদ্যালয়ের ভবনটি। এরপর ৫ বছর ধরে বিদ্যালয় ভবনের অভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। রৌদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষা নিচ্ছে কমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের। এতে করে ব্যহত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার কর্যক্রম। বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠানোর আগ্রহ হারাচ্ছেন অভিভাবকরা।

সরজমিনে রামগঞ্জ নাগরাজারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায়, খোলা আকাশের নিচে চলছে কেমলমতি শিশুদের পাঠদান। একই চিত্র পাশের করপাড়া পূর্বগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও। তাছাড়া অনেক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলে ওই সব বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। এতে বিদ্যালয় পরিচালনাসহ শিক্ষার গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে ৬৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। একই সাথে পাঠানো ওই তথ্য মতে, জেলার ৫টি উপজেলার মোট ৭ শ’ ৩১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ শ’ ৩৮টি বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুরের সদরে ৯৬টি বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক নেই। একই ভাবে রায়পুরে ৩৪টি, রামগঞ্জ ৫৬টি, রামগতি ২৭টি ও কমলনগরে ২৫টি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন থেকে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ওই বিদ্যালয় গুলোর সহকারী শিক্ষকই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছে।  

সদর উপজেলার খোদাওয়ান্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দিলশাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রায়পুরের পূর্ব গাইয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমলনগরের চর জগবন্ধু, ডিএম ফলকন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, এসব বিদ্যালয়ের ভবনগুলো বেশির ভাগই ঝুকিপূর্ণ। ভবনের ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। খসে পড়ছে দেওয়াল ও ছাদের পলেস্তার। ভেঙ্গে চৌছির হয়ে আছে ভবনগুলোর দরজা-জানালাও। ক্লাস নেওয়ার বিকল্প কোন ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে এসব পরিত্যক্ত বিদ্যালয় ভবনে চালনো হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। এতে যে কোন সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দূর্ঘটনা। এছাড়া রামগঞ্জ উপজেলার শেফালীপাড়া তরুলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর হাজীপুর, নয়নপুর, পূর্ব দরবেশপুর, ভোলাকোট, ও রতনপুর কালিতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১৪টি বিদ্যালয় ভবনের বেহালদশার কারণে খোলা আকাশের নিচে চলছে শ্রেণীর পাঠদান কার্যক্রম।

নাগরাজারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রহিমা বেগম জানান, ১৯৯৩ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টি পরিত্যক্ত করায় চরম দূর্দশায় শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হয় তাকে। ৩য় শ্রেনীর ক্লাস মাঠে ও বাকি ৩টি ক্লাস পাশের ফোরকানিয়া মাদ্রাসার একটি পরিত্যক্ত কক্ষে ঠাসাঠাসি করে নিতে হয়। এতে শিক্ষার্থীরা অমনোযোগী হয়ে পড়ে। তাই অতিদ্রুত বিদ্যালয়টির নতুন ভবন নির্মানের দাবী জানান তিনি।

করপাড়া পূর্বগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রৌশন আক্তার বলেন, বিদ্যালয়রে চিন্তায় রাতেও ঘুম আসে না। উপজেলা শিক্ষা অফিসে কয়েক বার ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন করেও কোন সুফল পাচ্ছি না। তাই বিকল্প কোন ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে মাঠে ক্লাস নিতে হয়।

এদিকে সদর উপজেলার খিদিরপুর ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ আর শ্রেণীকক্ষ সংকটের কারণে পাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বারান্দায় ক্লাস নিতে হয়। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদটিও শূণ্য রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হয় বিদ্যালয়। কমলনগর উপজেলার তালতলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ জেলার ২৩৮টি বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষকের পদটি শূণ্য পড়ে আছে। দেওয়া হচ্ছে না সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতী। এতে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে বিদ্যালয়গুলো।

কয়েকজন সহকারি শিক্ষক জানান, প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য থাকায় নিয়মতান্ত্রিক ভাবে বিদ্যালয় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া প্লেন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও সমস্যা হচ্ছে। যার প্রভাব সমাপনি পরীক্ষার ফলাফলের উপর পড়ে। তাই দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের শূণ্য পদটিতে নিয়োগের দাবী জানান।

রামগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান মোল্লা জানান, জরাজীর্ণ ও ভবনের অভাবে খোলা আকাশের নিচে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হচ্ছে। জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা ও প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগের জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার পত্র দেওয়া হচ্ছে।   

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিজ বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ২০১৩ সালে সরকারি করন করা হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়নি। এতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের শূণ্য পদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু প্রধান শিক্ষক পদটি ২য় শ্রেণীর। সেহেতু পদোন্নতি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতামত নেওয়া প্রয়োজন রয়েছে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী পদোন্নতি যোগ্য সহকারী শিক্ষকদের সকল তথ্যে তালিকাটি মন্ত্রণালয় পাঠানো হয়েছে। উর্ধতন কর্তৃপক্ষ খুব শীঘ্রই পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের শূণ্য পদে শিক্ষকদের প্রদায়ন দিবেন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি #

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি। মোবাইলঃ 01714-953963, ইমেইলঃ kkumar3700@gmail.com

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com