কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পল্লী বিদ্যুতের নতুন গ্রাহকরা লাইন-ম্যানদের হাতে জিম্মি

মোঃ রাজন আমান, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি # কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নতুন সংযোগের আবেদনকারীরা লাইনম্যান ও ইলেক্ট্রিশিয়ানদের হাতে অনেকটাই জিম্মি হয়ে পড়েছেন। নতুন সংযোগের জন্য আবেদন ফি ১০০ টাকার পরিবর্তে ইলেক্ট্রিশিয়ানদের ৩০০ টাকা ও মিটারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে ৫০০ টাকা করে দিতে হয় নতুন গ্রাহকদের। বৈদ্যুতিক পোল স্থাপনের জন্য চা বিল আর অদৃশ্য স্যারের জন্য পোল প্রতি দিতে হয় হাজার টাকা করে। এভাবেই পদে পদে বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মোকারিমপুর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর এলাকার লোকজনকে।

ভেড়ামারা উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্যে নতুন সংযোগ দেওয়ার ঘোষণা করা হয়। ওই ঘোষণায় বলা হয়, শুধুমাত্র আবেদন ফি আর মিটার ভাড়া দিলেই পাওয়া যাবে নতুন সংযোগ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাড়তি টাকা না দিলে দুই বছরেও মিলছে না সংযোগ। এই বাড়তি টাকা লাইনম্যান ও ইলেক্ট্রিশিয়ানদের পকেটেই ঢুকছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। রামকৃষ্ণপুর এলাকার শিপন আলী বলেন, আমি একটি পল্লী বিদ্যুতের পোলের জন্য আবেদন করেছিলাম। আজ না কাল বলে বলে আমাকে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের  লোকজন ঘুরাতে থাকে। তারা বলে পোল নেই। পরে আমি  সেখানে থাকা এক লাইনম্যানকে এক হাজার টাকা দিই। তার কয়েকদিন পরে  পোল চলে আসে। তারা যখন  পোল স্থাপন করতে আসেন তখন আবারও পাঁচশ’ টাকা নেন। ঘুষ ছাড়া কিছুই যেন বোঝেন না তারা!

একই এলাকার সাগর আলীর স্ত্রীর অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুতের নতুন লাইনের জন্য আবেদন করেছিলাম। এই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য রকিবুল ইসলাম দ্রুত লাইন এনে দেবেন বলে লাইনম্যানদের  দেওয়ার জন্য এক হাজার টাকা নেন। এরপর তিনি লাইনও এনে  দেননি, আবার টাকাও ফেরত দেননি। তার কাছে  গেলে তিনি বলেন, টাকা লাইনম্যানদের দিয়ে দিয়েছি। আমি ২০১৪ সালে পল্লী বিদ্যুতের নতুন লাইনের জন্য আবেদন করেছিলাম। দুই বছর পার হলেও সংযোগ পাইনি। পরে ইলেক্ট্রিশিয়ান  হেলালের সঙ্গে কথা হয়।

তিনি আমাকে বলেন, কাগজপত্র আমাকে দিলে আমি দ্রুত লাইন এনে দেবো। পরে তাকে সাড়ে সাত হাজার টাকা দিলে তিনি দ্রুত কাজ করে দেন, এ অভিজ্ঞতা আরিফ আহম্মেদ নামে এক গ্রাহকের। তিনি আরো বলেন, লাইন দিতে এসে লাইনম্যান আরো পাঁচশ’ টাকা নিয়েছেন। অনেকেই এভাবে ঘুষ দিয়ে দ্রুত লাইন পেয়েছেন। লাইনম্যান আর ইলেক্ট্রিশিয়ানদের টাকা দিলে দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। আর তা না হলে বছরের পর বছর লাইনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় কুদ্দুস মিয়া, ইসলাম, বেলি খাতুন, জিয়া, সফু, বুদু, আজিমের মতো অনেকে ৬৫০ টাকা মিটার ভাড়া আর ১০০ টাকা আবেদন ফির স্থলে ৪৫০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিয়েছেন।

আর মিটার লাগানো এবং দ্রুত লাইন লাগিয়ে দেওয়ার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য রকিবুল ইসলাম মাধ্যম হয়ে মিটার প্রতি ৫০০-১০০০ টাকা করে নিয়েছেন। এ ব্যাপারে ইউপি সদস্য রকিবুল ইসলাম জানান, তিনি মিটার প্রতি ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা করে নিয়েছিলেন। তবে তা নিজের জন্য নয়।পল্লী বিদ্যুতের লাইন নিতে হলে লাইনম্যানদের টাকা দিতে হয়। তাই ওই টাকা তাদের দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের সেবা করাই আমার কাজ। যাতে সবাই দ্রুত বিদ্যুৎ লাইন পান, সেজন্য টাকা নিয়ে স্যারদের দিয়েছি।

এই স্যার কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, একেক সময় একেক জন আসেন। যারা লাইন দিতে বা পোল স্থাপন করতে আসেন, ওই টাকা তাদের দেওয়া হয়। তাদের নাম জানি না।ইলেক্ট্রিশিয়ান হেলাল আহম্মেদ বলেন, আমি কারো কাছ থেকে  বেশি টাকা নেইনি। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। আবেদন, মিটার ফি, ওয়্যারিং করা, রিপোর্ট ইত্যাদি দিয়ে যা লাগে আমি  সেই টাকাই শুধু নিয়েছি।মোকারিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার হারুন-অর-রশিদ জানান, ২০১৬ সালে ৩১ ডিসেম্বর ভেড়ামারা উপজেলার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)  শান্তি মনি চাকমার মাধ্যমে মাইকিং করে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এজন্য কেউ বিদ্যুৎ লাইনের জন্য অতিরিক্ত টাকা নিলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তার বিচার করা হয়ে থাকে।

তিনি আরো জানান, ইলেক্ট্রিশিয়ানরা আমাদের পল্লী বিদ্যুতের কেউ না।  কেউ যদি তাদের টাকা দেন, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। যদি বিদ্যুতের লাইন দেওয়ার নাম করে কোনো লাইনম্যান, ইলেক্ট্রিশিয়ান বা  কোনো ব্যক্তি টাকা নেন তাহলে তার বিরুদ্ধে সু-নির্দিষ্ট প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বলেন হারুন-অর-রশিদ।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২৮৩ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com