নির্মিত হচ্ছে ১৭০মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি কয়লাভিক্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

২৫ বার পঠিত

প্লাবন গুপ্ত শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি # খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্যতম দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা। এখানকার বড়পুকুরিয়ায় উত্পাদিত কয়লা সর্বোৎকৃষ্টমানের। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে ইট ভাটায় ইট তৈরিসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বড়পুকুরিয়ার এই কয়লা।

এই কয়লাকে কেন্দ্র করে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এলাকার এমন কোন প্রতিষ্ঠান নেই, যে প্রতিষ্ঠানে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির সহযোগিতা নেই। ফলে খনিটিকে দিনাজপুরের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সর্ব বিষয় বিবেচনায় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিটি  বাংলাদেশের গর্ব করার মত একটি প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন কর্মকান্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সহায়ক সংস্থাও বটে।

সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি হতে পারে দেশের মডেল। বর্তমানে বড়পুকুরিয়া ২৫০মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে নতুন একটি ২৭০মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ  কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলেছে। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু  হলে উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতি বহুলাংশে কমে যাবে। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি হতে উৎপাদিত কয়লা প্রধানত ব্যবহৃত হয় বড়পুকুরিয়া ২৫০মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২০০৫সাল হতে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে এককভাবে বড়পুকুরিয়ার কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহারের পর কিছু কয়লা উদ্ধৃত্ত থাকে, যা স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ইট-ভাটাসমূহে ব্যবহৃত হয়। খনি হতে উৎপাদিত কয়লা বিক্রয়ের পদ্ধতি ও মূল্য কোম্পানির পরিচালনা পরিষদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত হয়।

বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় আর্ন্তজাতিক বাজারে কয়লার মূল্যও ব্যাপকভাবে কমে যায়। এর ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি হতে থাকে। স্থানীয় বাজারে কয়লার মূল্য প্রতিটন ৫/৬হাজার টাকায় নেমে আসে। এর ফলে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি হতে উত্তোলিত কয়লার বিক্রি ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় এবং কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ বৃদ্ধি পেয়ে ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌছায়। বিষয়টি  কোম্পানির পরিচালনা পরিষদে উপস্থাপন করা হলে কয়লার দাম কয়েক দফা কমানো হয়। সর্বশেষ গত ১৮-১২-২০১৫তারিখ হতে প্রতি মেট্রিক টন কয়লা ৯,০০০টাকা মূল্যে বিক্রি শুরু হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে কয়লা বিক্রির মৌসুম শেষ হলেও বিক্রি আশানুরুপ না হওয়ায় কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ বৃদ্ধি পেতে থাকে ।

এদিকে সেচ মৌসুম শেষ হওয়ায় পিডিবিতে কয়লা সরবরাহ কমে যায়। এ প্রেক্ষাপটে কোল ইয়ার্ডে উৎপাদিত কয়লার স্থান সংকুলান না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। গত ১৭-০৫-২০১৬তারিখে অনুষ্ঠিত বিসিএমসিএল-এর ২৪৭তম পর্ষদ সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে প্রতি মেট্রিক টন কয়লা ৯,০০০টাকার পরিবর্তে ১,০০০ টাকা বর্ষাকালীন ছাড় দিয়ে ৮,০০০ টাকায় বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়। পর্ষদ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘বর্ষাকালীন মূল্য হ্রাসে কয়লা বিক্রয়’ শিরোনামে নোটিশবোর্ডসহ অন্যান্য স্থানে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করা হয় এবং ৬টি দৈনিক পত্রিকায় ১দিন প্রকাশের জন্য গত ১৮মে অনুরোধ জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ ছিল যে, ‘বিক্রয়যোগ্য কয়লা মজুদ থাকা সাপেক্ষে প্রতিটন ৮,০০০ (আট হাজার) টাকা দরে আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে বিক্রয় করা হচ্ছে।’ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী গত ২১মে ২০১৬ তারিখ হতে কয়লা বিক্রয় শুরু করা হয়। এতে মে মাসে ১৯হাজার ১১৮মেট্রিক টন, জুন মাসে ৭৮হাজার ৯৪০মেট্রিক টন এবং জুলাই মাসের ১২তারিখ পর্যন্ত ৫১হাজার ৪৯০মেট্রিক টনসহ মোট ১লক্ষ ৪৯হাজার ৫৪৮মেট্রিক টন কয়লা বিক্রয় হয়। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (পিডিবি) জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা মজুদ রাখার পর বাইরের ক্রেতাগণের নিকট বিক্রয়যোগ্য কয়লা পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকায় গত ১৩জুলাই হতে সাময়িকভাবে কয়লা বিক্রয় বন্ধ রাখা হয়। এদিক থেকে দেখা যায়, মজুতকৃত কয়লা বিক্রয় করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় একটি সময়োচিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। বর্তমানে কয়লার মজুদ প্রায় ৬২হাজার মেট্রিক টন। মজুদ বৃদ্ধি পেলে বাইরের ক্রেতাগণের নিকট পূনরায় কয়লা বিক্রয় শুরু হবে মর্মে খনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য যে, খনির পাশে স্থাপিত বড়পুকুরিয়া ২৫০মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (পিডিবি) জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে কয়লা সরবরাহ করাই বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যে খনির কোল ইয়ার্ডে পিডিবি’র জন্য সার্বক্ষণিক নিরাপদ মজুদ (ঝধভবঃু ঝঃড়পশ) সংরক্ষণ করার পর কোল ইয়ার্ডে অতিরিক্ত বিক্রয়যোগ্য কয়লা মজুদ হলে অন্যান্য ক্রেতার নিকট ‘কয়লা বিক্রয় নীতিমালা’ অনুযায়ী বিক্রয় করা হয়। কয়লা খনি হতে সফলভাবে কয়লা উত্তোলিত হওয়ায় এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এলাকার হাজার হাজার লোকের কর্ম-সংস্থান হয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিটি গত ৮বছর যাবৎ লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এ যাবৎ আয়কর, ভ্যাট, রয়্যালিটি, ডিএসএল, খনি ইজারা ফি, লভ্যাংশ ইত্যাদি বাবদ সরকারকে প্রায় ১৬০০কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ‘শ্রেষ্ঠ সরকারী করদাতা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে সম্মাননা পুরস্কার পেয়েছে।

তাছাড়া এলাকার স্কুল, কলেজ, দাতব্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ সংস্করণ, মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তা-ঘাট, কবরস্থান ইত্যাদি উন্নয়নের জন্য কোর্মকানির সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাত হতে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। ফলে এলাকার জনগণের জন্য কয়লা খনিটি আশির্বাদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। শুধু তাই নয় এই কয়লা খনিকে ঘিরে দূর হয়েছে এলাকায় বেকারত্ব। এই কয়লা খনিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছে এলাকার বেকার যুবকেরা। সেদিক থেকে এই কয়লা খনি স্থানীয়ভাবে বেকারত্ব দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

বড়পুকুরিয়া ২৫০মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে নতুন একটি ২৭০মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ চলছে। কয়লা খনি সম্ক্রসারণের জন্য ‘ফিজিবিলিটি স্টাডিজ ফর এক্সেনশন অব এক্সিসটিং আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং অপারেশন অব বড়পুকুরিয়া কোল মাইন টোয়ার্ডস দ্য সাউদার্ন অ্যান্ড দ্য নর্দান সাইড অব দ্য বেসিন উইদাউট ইন্টারাপশন অব দ্য প্রেজেন্ট প্রোডাকশন’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। উক্ত প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার পর খনি হতে আরও বেশি পরিমাণে কয়লা উত্তোলিত হবে এবং পিডিবি’র নবনির্মিত প্লান্টের বর্ধিত চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

এছাড়াও দিঘীপাড়া কয়লা ক্ষেত্র সমীক্ষা প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। উক্ত খনি হতে বছরে প্রায় ৩০লাখ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার কয়লা ক্ষেত্র উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে কয়লা দ্বারা অধিক পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি জাতীয় পর্যায়ে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখতে পারবে। এদিকে গত ১৭জুলাই রবিবার দৈনিক ইত্তেফাকের ৫ম পৃষ্ঠায় ৭ম কলামে ‘বড়পুকুরিয়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়লা বিক্রি। কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এ সংবাদটি সম্পর্কে কয়লা খনির জেনারেল ম্যানেজার আবদুল মান্নান পাটোয়ারী (অর্থ ও হিসাব) বলেন, সংবাদে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী কোন অবস্থাতেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়লা বিক্রির সুযোগ নেই। কয়লা বিক্রির পূর্বে বাংলাদেশের ৫টি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বহুল প্রচার করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, স্থানীয়ভাবেও ব্যাপক প্রচার করে বিক্রয় বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়লা বিক্রি করে কোন সুবিধা পাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সরকারী করদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কয়লা খনি যে সম্মাননা পুরস্কার পেয়েছে, সেই অবস্থানকে খাটো করার জন্য একটি মহল নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অপপ্রচারে লিপ্ত।

আবদুল মান্নান পাটোয়ারী বলেন, কয়লা খনিটির সাথে দিনাজপুর জেলার সম্মান জড়িত। কয়লা খনির উন্নয়নে দিনাজপুর জেলাবাসী যে আন্তরিকতার পরিচয় দিচ্ছেন, তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে দিনাজপুর জেলা অচিরেই একটি সমৃদ্ধশালী জেলা হিসেবে বাংলাদেশের বুকে আত্মপ্রকাশ করবে। 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com