দেশ ছাড়তে চাচ্ছেন গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালরা

৫১ বার পঠিত

চারদিনে সাকল্যে দু-একবেলা খেতে পেয়েছেন কেউ কেউ। আবার পেটে একেবারেই দানাপানি পড়েনি অনেকেরই। এ পর্যন্ত ৪০০ লোকের কাছে খাদ্যসহায়তা পৌঁছুলেও বাকিরা অভুক্ত। থাকার জায়গা নেই, মাথার ওপর ছাউনি নেই, খাওয়ার কিছু নেই, নেই দুই আনা সম্বল। এ অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে পাশের দেশ ভারতে চলে যাওয়ার সুযোগ চাচ্ছে রংপুর চিনিকলের বাগদাফার্ম এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতাল পরিবারগুলো। যদিও চারদিক ঘিরে রাখা পুলিশ ও স্থানীয় ক্ষমতাশালীদের কারণে গ্রাম থেকেই কারো বের হওয়ার সুযোগ নেই।

‘আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা এখন কী করে বাঁচব রে বাপু! তিনদিন ধরে খেতে পাই না। বাইরেও যেতে পারি না। না খেয়ে এখানে আমরা মরে যাব। ভারতকে বলো গেট খুলে দিতে, আমরা চলে যাব।’ কথাগুলো বলছিলেন বাগদাফার্মের পাশের গ্রাম জয়পুরের মিনতি কিসকু (৪৫)। মিনতির মতো দেশ ছাড়তে চাচ্ছেন একই গ্রামের কোমল ফুলও (৬৫)। এ নিয়ে তার আকুতি, ‘এখান থেকে বের হতে পারলে আমরা ভারতে চলে যাব। তোমরা বলো আমাদের ছেড়ে দিতে, ভারতের গেট খুলে দিতে। আমরা সেখানেই চলে যাব। ক্ষুধার জ্বালা আর সইতে পারছি না।’

সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বাগদাফার্ম-সংলগ্ন সাঁওতাল অধ্যুষিত গ্রাম জয়পুর ও মাদারপুরের চারদিকে মোতায়েন করা রয়েছে প্রায় ২০০ পুলিশ। আশপাশেই রয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের লোকজন। গ্রাম দুটি থেকে কাউকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। অন্য কাউকে গ্রামে ঢুকতেও দেয়া হচ্ছে না। কেউ খাদ্যসহায়তা দিতে গেলে তাতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। গ্রাম দুটির নারী-পুরুষের মুখে অনাহারের ছাপ। বিশেষ করে শিশুদের মুখে এ মলিনতা আরো প্রকট।

অনাহার সহ্য করতে না পেরে গ্রাম থেকে বের হতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে ফিরেছেন সোসানা মুরমু (৬০)। শিশুদের স্কুলে যেতে দেয়া তো দূরের কথা, খাবার বা কাজের খোঁজে সোসানা মুরমুর মতো অনেকেই গ্রাম থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ বা ক্যাডার বাহিনীর মারধরের শিকার হয়ে ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছেন।

জানা গেছে, এখানকার সাঁওতালরা বাপ-দাদার ভিটা থেকে প্রথমবার উচ্ছেদ হয়েছিলেন ১৯৬২ সালে। ওই সময় রংপুর চিনিকলের জন্য আখ চাষের কথা বলে তাদের জমি কেড়ে নেয়া হয়। যদিও জমি হস্তান্তর চুক্তিপত্রে আখ চাষ না হলে জমি ফেরত দেয়ার শর্ত ছিল। ২০০৪ সালে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে আখের পরিবর্তে অন্যান্য ফসলের চাষ শুরু হয়। এ সুযোগে এলাকার প্রভাবশালীদের কাছে জমি লিজ দেয় চিনিকল কর্তৃপক্ষ। শর্তভঙ্গের কারণে গত বছরের জুন থেকে সেখানে বসতি স্থাপন শুরু করে ১৯৬২ সালে উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতাল ও বাঙালিদের উত্তরসূরি প্রায় আড়াই হাজার পরিবার। ৬ নভেম্বর রোববার সেখান থেকে দ্বিতীয়বারের মতো উচ্ছেদ হল তারা। এদিন তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া ছাড়াও চাল-ডাল থেকে শুরু করে কাঁথা-বালিশ পর্যন্ত যা ছিল সবই লুটে নেয়া হয়। এ ঘটনার পর বাঙালি পরিবারগুলো নিজ গ্রাম থেকে বের হতে পারলেও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন সাঁওতালরা। দ্বিতীয়বার উচ্ছেদ হওয়ার পর জীবন বাঁচাতে এখন তারা দেশ ছেড়েই চলে যেতে চাচ্ছেন।

জানা গেছে, বাগদাফার্মে বাপ-দাদার জমিতে বসতি স্থাপনের সময় সাঁওতালদের ভরসা দিয়েছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় সংসদ সদস্য। বিশেষ করে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে হওয়ায় এ বিষয়ে অতি উত্সাহ দেখিয়েছিলেন সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাকিল আলম বুলবুল। ওই সময় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও সাঁওতালদের বসতভিটা রক্ষা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি। অথচ রোববার তারই উপস্থিতিতে হামলার ঘটনা ঘটল সাঁওতালদের ওপর। পুড়িয়ে দেয়া হলো তাদের বসতভিটা। উদ্বাস্তু হয়ে পড়া সাঁওতালরা বর্তমানে আবারো হামলার আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়েছেন। মাদারপুরের বাসিন্দা লুকাস মুরমু (৭০) বলেন, ‘চেয়ারম্যান বুলবুল আমাদের ভরসা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন শরীরের সব রক্ত দিয়ে হলেও আমাদের এখানে স্থায়ী বসতির ব্যবস্থা করবেন তিনি। আমাদের কেউ তাড়াতে পারবে না। আর সেই চেয়ারম্যানের সামনেই তার লোকজন আমাদের সব পুড়িয়ে দিল। চেয়ারম্যানই সব করালেন। আমাদের সব শেষ হয়ে গেল। এখন এ দেশে থাকার আর কোনো ভরসা পাই না।’

একই গ্রামের ম্যানুয়েল মাড্ডি (৪০) বলেন, ‘মাথার ওপর আঁচড় কেটে পুলিশের রাবার বুলেট গেছে। জামায় সে রক্ত এখনো লেগে আছে। এর পর আবারো হামলা হবে, আমাদের আর বাঁচতে দেবে না। আমরা এ দেশ থেকে ভারতে চলে যেতে চাই। আমাদের ওপর আর হামলা কইরেন না।’ বাগদাফার্মে সাঁওতালদের বসতি মানতে নারাজ রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল। তিনি বলেন, ওরা অবৈধ দখলদার ছিল।

আমাদের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ উচ্ছেদের নির্দেশনা ছিল। রক্তপাতের ব্যাপারটি কাকতালীয়। সেখানে ২০০-এর মতো পুলিশ রয়েছে। আখ রোপণের জন্য আমাদের হাতে সময় আছে আর এক মাস। তীর-ধনুকের কারণে এখন পুলিশ প্রহরায় আখ রোপণের কাজ চলছে। এদিকে দুদিন ধরে সেলফোনে বারবার চেষ্টা করা হলেও সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল আলম বুলবুলকে পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ৬ নভেম্বর রোববার বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৬০০ সদস্যের অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন সাঁওতাল মারা যান। বর্তমানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আরো তিনজন। একই হাসপাতালে চিকিত্সা চলছে তীরবিদ্ধ তিন পুলিশ সদস্যেরও। এছাড়া অন্তত দুজন করে বাঙালি ও সাঁওতাল নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিবারের আশঙ্কা, পুলিশ তাদের গুম করে ফেলেছে।

সূত্র: বণিক বার্তা

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com