অল্প সময় বেশি লাভের আশায় মধুপুরে আনারসে করা হচ্ছে বিষ প্রয়োগ

২৭ বার পঠিত

মোঃ নাজমুল হাসান, টাংগাইল #  অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় টাঙ্গাইলের মধুপুরের আনারস বাগানগুলোতে দেদারে প্রয়োগ করা হচ্ছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ওষুধ। এতে দ্রুত আনারসের ফলন বৃদ্ধি পেলেও আতঙ্কে দিন দিন এর চাহিদা কমে যাচ্ছে সারাদেশে। ফলে মধুপুর হারাচ্ছে আনারসের অতীত ঐতিহ্য। লোভনীয় ও রসালো এই আনারস খেয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন ক্রেতারা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে টাঙ্গাইলে মোট আনারসের চাষ হয়েছে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে আর এর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৩ লাখ মেট্রিক টন। গত বছর এর চাষ হয়েছিল ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন।

  সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মধুপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে জলডুবিসহ নানা প্রজাতির রসালো আনারস। উপজেলার জলছত্র ও পঁচিশমাইল এলাকায় এ চাষের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা গেছে। দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এ অঞ্চলের আনারসের সুখ্যাতি এখন আধুনিক চাষ পদ্ধতিতে বিলুপ্ত হতে বসেছে। আধুনিক চাষের দ্রুত ও অধিক ফলন পদ্ধতির কুফলে ঐতিহ্য হারাচ্ছে এ জেলার সুস্বাদু আনারস। আনারস চাষে ব্যবহার হচ্ছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক হরমোন, সার ও কিটনাশক। স্বাভাবিকভাবে যে আনারস বড় হতে সময় লাগে ৫-৬ মাস, সেটি ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে বড় ও পাকিয়ে বাজারে বিক্রি করছেন মাত্র ৩-৪ মাসে।

চাষ পদ্ধতি নিয়ে কথা হয় উপজেলার পঁচিশমাইল গ্রামের কৃষক রুস্তম মিয়ার সঙ্গে। তিনি ৩০ হেক্টর জমিতে আনারসের আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, দ্রুত সময়ে বড় ও পাকানোর জন্য আনারসের কুড়ি আসার সময় থেকে পাকা পর্যন্ত ৩ থেকে ৪ বার বাগানে প্রয়োগ করা হচ্ছে হরমোন। এই হরমোন প্রয়োগের ফলে আনারস দ্রুত বড় হওয়াসহ দেখতে খুব সুন্দর হয়। এর পাশাপাশি জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার হচ্ছে সার। পোকা ও বালাই দূর করতে ব্যবহার করা হচ্ছে কিটনাশক। এ ওষুধ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জানা সত্ত্বেও অল্প সময়ে ফলন ও অধিক লাভের আসায় কৃষকরা এ ওষুধ ব্যবহার করছে বলেও জানান তিনি।

 এছাড়া কৃষি কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও হাতের নাগালে ক্ষতিকর ওষুধ পাওয়াকেই দায়ী করেন তিনি। এটি বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত নজরদারি ও কৃষিতে ব্যবহৃত ওষুধ কোম্পানিগুলোকে কঠোর নিয়মনীতির মধ্যে আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। উপজেলার জলছত্র গ্রামের কৃষক রহিম মিয়া জানান, চলতি বছর তিনি ১০ একর জমিতে আনারসের আবাদ করেছেন। এ অঞ্চলটি পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এখানে আনারসের আবাদ ভালো হয়। যুগের পর যুগ তারা আনারসের আবাদ ও ব্যবসা করে আসছেন।  প্রাকৃতিকভাবে আনারসের ফলন উঠতে তাদের সময় লাগে ৫-৬ মাস। এর আকার ছোট এবং দেখতে কালো হয়। আধুনিক চাষ শাস্ত্রের মাধ্যমে আনারস বড় ও পাকাতে সময় লাগে ৪-৫ মাস। তবে এ চাষ পদ্ধতিতে ব্যবহার হয় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক হরমোন, সার ও কিটনাশক।  তবে রমজান মাসে আনারসের দাম ভালো পাওয়া যায় বলে তিনি দ্রুত বড় ও পাকানোর জন্য আনারস বাগানে হরমোন, সার ও কিটনাশক ব্যবহার করেছেন। এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত আনারস দেখতে সুন্দর ও বড় হয়। তবে এর সাধ ততটা ভালো নয়।

 টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ ইবনে সাঈদ বলেন, ক্ষতিকর কেমিক্যাল প্রয়োগের ফলে শুধু আনারস নয়, যে কোনো ফল খেয়ে মানুষের অসুখ হতে পারে। আনারসে ক্ষতিকর কেমিক্যাল প্রয়োগ স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ বলেও জানান তিনি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. আবুল হাশিম কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করে

বলেন, মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগ না করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সহযোগিতায় প্রতিনিয়তই কাজ করা হচ্ছে।এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেন জানান, আনারসে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগ না করার জন্য ব্যাপক প্রচারণা এবং কৃষি সমাবেশ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও যদি আনারসের ওষুধ প্রয়োগ বন্ধ না হয়ে থাকে, তবে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com