লক্ষ্মীপুরে কুটির শিল্প কারিগরদের চলছে দুর্দিন

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : এক সময় গ্রামীন বাজারে বাঁশের তৈরি পন্যের বেশ চাহিদা থাকলেও বর্তমান বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির প্লাষ্টিক পন্যের কদর বাড়ায় লক্ষ্মীপুরের বাঁশ ও বেতের তৈরি কুটির শিল্পের কারিগরদের চলছে এখন দুর্দিন। কালের বিবর্তন ও বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ফলে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে অতি প্রয়োজনীয় বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় কুটির শিল্প সামগ্রীর চাহিদা কমতে থাকায় এবং বাঁশ ও বেতের দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় আদি পূরুষের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া এ হস্তশিল্পটি এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ শিল্পের কারিগরদের মাঝে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় পুঁজি, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ শিল্পের কারিগরদের মাঝে নেমে এসেছে চরম হতাশা। দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন এ শিল্পের সাথে জড়িত জেলার প্রায় ৫শতাধিক কারিগর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাঁশ ও বেত শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৫শতাধিক কারিগরের পরিবার বর্তমানে চরম দুর্দিনের মধ্যে দিন যাপন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে এসব কারিগররা বাঁশ ও বেত শিল্পের ওপর নির্ভরশীল থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্তমানে তারা নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রয়োজনীয় পুঁজি, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও মজুরি কম থাকার কারণে এ শিল্পের প্রতি আগ্রহ দিন দিন কমে যাওয়ায় উপকূলীয় এ অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রাম থেকে ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হচ্ছে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত শত শত শ্রমিক আজ প্রায় বেকারত্ব জীবনযাপন করছেন। এ শিল্পের কারিগররা বংশানুক্রমে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এক সময় এ শিল্পের কারিগরদের ছিলো সোনালী দিন। গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে শোভা পেত বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প। কিন্তু বর্তমানে গ্রাম বাংলার এসব বশতঘরে এখন আর এগুলো আগের মত চোখে পড়ে না। অথচ এক সময় বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসপত্র ছাড়া আবহামান গ্রাম বাংলা কল্পনা করাও কঠিন ছিল। যেখানে বসতি সেখানেই বাঁশ, বেতের তৈরির জিনিসপত্র। কিন্তু আজ তা আমাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য থেকে মুছে যাচ্ছে। এই গ্রাম বাংলার কুটির শিল্প নিয়ে কবি সাহিত্যিক রচনা করেছেন কবিতা গল্প। বাউলরা গেয়েছেন গান। আগে গ্রামের প্রায় বাড়িতেই বাঁশ, বেত দিয়ে তৈরি করা হতো হরেক রকমের সরঞ্জাম। জীবিকা অর্জনের মাধ্যম ও ছিল বাঁশ, বেত। এক সময় লক্ষ্মীপুর জেলার বাঁশের ব্যাপক চাষ করা হত। সামান্য যতœ আর বিনা খরচে গড়ে ওঠত বাঁশের বাগান। আর পুকুর পাড়ে জন্ম নিতো বেত। কিন্তু আজ কালের বিবর্তনে সেই বাঁশ ও বেত বাগান বিলীন হতে চলেছে। তবুও থেমে নেই এখানকার কুটির শিল্পের কারিগররা। নারী-পুরুষ নির্বেশেষে প্রতিদিন গৃহস্থলী সামগ্রী তৈরীর কাজে ব্যস্ত তারা।

লক্ষ্মীপুর বিসিক শিল্প নগরী সুত্র জানা যায়, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার লাহারকান্দি, চররুহিতা ইউনিয়নের চর লামচী, দালাল বাজার ইউনিয়েনের পশ্চিম লক্ষ্মীপুর, তেওয়ারীগঞ্জের শহর কসবা, বাঙ্গাখা ইউনিয়নের বাবুপুর, রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ ও রামগতি পৌর শহরের চর হাসান-হোসেন এলাকাসহ ১০ টি গ্রামে প্রায় ৫ শতাধিক নারী-পুরুষ বাশেঁর তৈরী গৃহস্থলী সামগ্রী তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করছে। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে বাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছেন এসব কারিগররা। বাঁশ ও বেত দিয়ে তাদের নিপুণ হাতে তৈরি কুলা, চাটাই, হাঁস-মুরগির খাঁচা, সাজি, ঢাকনা, চালনি, পাল্লা, খাঁচা, মোড়া, চেয়ার, টেবিল, দোলনা, খারাই, পাখা, বই রাখার র‌্যাক, ডালা, ঝুড়ি ইত্যাদি মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় কুটির শিল্পসামগ্রী জেলাবাসীর চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হতো দেশের বিভিন্ন জেলায়।

কারিগররা জানান, আগে তারা এক একটি বাঁশ কিনতো ৩০-৪০ টাকা বর্তমানে তা কিনছে ২০০-২৫০ টাকায়। আগের তুলনায় এখন আর খরচ পৌশাতে পারছে না তারা এবং পুজির অভাবে এখন চলছে তাদের দু’দিন। সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে বউ পোলা-পাইন নিয়ে কোন মতে দিন কাটাতে পারতো। তারা আরো জানান, বর্তমানে উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রি মূল্য কম। প্রয়োজনীয় পূঁজি না থাকায় চওড়া সুদে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে তাদের। এতে করেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।
সদর উপজেলার শহরকসবা গ্রামের কুটির শিল্পের কারিগর কোহিনুর বেগম জানান, এক সময় গ্রামীণ বাজারে বাঁশের তৈরি পণ্যের বেশ চাহিদা থাকলেও বর্তমানে প্লাষ্টিক পন্যের কারনে এ শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। সেই সাথে বাঁশের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় তারা সমস্যায় ভুগছেন, ছেলে-মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত সহ তাদের চরম দুর্দিন যাচ্ছে এখন। ফলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কারিগররা এক প্রকার বাধ্য হয়ে তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

কারিগরদের দাবী, সরকারি পৃষ্ঠ পোষকতা, সহজ শর্তে ঋনের সুবিধা পেলে পুনরায় উজ্জীবিত হবে এ শিল্প । বাঁশ শিল্প কেন্দ্রীক সরকারি বেসরকারি উদ্যেগ গ্রহনে ভাগ্য বদল হতে পারে এ অঞ্চলের কুটির শিল্প কারিগরদের।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২৪ বার পঠিত

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com